kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

যাত্রীদের প্রাণ বাঁচিয়ে নিজেই হেরে গেলেন

নওশাদের বীরত্বে দুই দফা দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা

মাসুদ রুমী    

৩১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




যাত্রীদের প্রাণ বাঁচিয়ে নিজেই হেরে গেলেন

২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর। গভীর রাতে মাস্কাটের রানওয়ে ধরে ২৬০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে বিমানের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ। হঠাৎ বিকট শব্দ। আতঙ্কিত চট্টগ্রামগামী ১৪৯ যাত্রীর চিৎকার-আহাজারিতে বিমানের ভেতর তখন অন্য রকম পরিবেশ। অনেকেই দোয়া-দরুদ পড়ছেন। এ সময় ঘোষণা এলো—‘ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম বলছি। আপনারা শান্ত হোন।’ ১০ মিনিটের মধ্যে খবর আসে, পেছনের গিয়ারের চাকা ফেটে গেছে। বিস্ফোরিত চাকা নিয়েই উড়াল দেয় উড়োজাহাজটি।

চাকা ছাড়া কিভাবে অবতরণ করাবেন, সেই চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে ক্যাপ্টেন নওশাদের। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফার্স্ট অফিসার মেহেদি হাসান। পাঁচ ঘণ্টার পথ পাড়ি দেওয়ার পর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবাই প্রস্তুত। শুরু হয় চাকা ছাড়া বিমান জরুরি অবতরণের পালা। সেই যাত্রায় নিজের বুদ্ধি ও কৌশল কাজে লাগিয়ে সফল অবতরণ করিয়ে ক্যাপ্টেন নওশাদ প্রাণে বাঁচান ১৪৯ জন যাত্রীকে।

ফ্লাইট থেকে নেমে সেদিন তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘কোন চাকাটি ফেটেছে, তা-ও বুঝতে পারছিলাম না। নামার মাঝপথে আরেকটি টায়ারও ফেটে গেল। ল্যান্ডিংয়ের সময় হচ্ছিল। গিয়ারটি ভেঙে আগুন লাগতে পারে। আমার লাক ফেভার করেছে, গিয়ারটি ভেঙে যায়নি। মেহেদিও ঠাণ্ডা মাথায় আমার পাশে ছিল। আমাদের বিমানবন্দরের সবার বিচক্ষণতায় আমরা দুর্ঘটনার হাত থেকে যাত্রীদের বাঁচাতে পেরেছি।’

ক্যাপ্টেন নওশাদের দক্ষতা-বীরত্বের কাহিনি এটিই শেষ নয়। গত শুক্রবার আবারও মাস্কাটফেরত বিমানেই বড় ধরনের দুর্ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। মাঝ আকাশে পাইলট নওশাদের হার্ট অ্যাটাক হয়। বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়েও বিমানের ফার্স্ট অফিসারের সহায়তায় নাগপুরে বিমান জরুরি অবতরণ করান। এবার ১২৪ যাত্রীর প্রাণ বাঁচে। কিন্তু নিজে হেরে গেলেন মৃত্যুর কাছে।

ভারতের নাগপুরের কিংস ওয়ে হাসপাতালে তিন দিন ‘লাইফ সাপোর্টে’ ছিলেন বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাইলট নওশাদ আতাউল কাইয়ুম। গতকাল সোমবার সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে জানান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ শাখার উপমহাব্যবস্থাপক তাহেরা খন্দকার।

মাত্র ৪৫ বছর বয়সে জীবনাবসান ঘটল এই সাহসী পাইলটের। তাঁর মৃত্যুতে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সেদিন কী ঘটেছিল : ওমানের রাজধানী মাস্কাট থেকে ১২৪ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার পথে আসছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজটি। ভারতের রায়পুরের আকাশে হার্ট অ্যাটাকে নিথর হয়ে পড়েন ক্যাপ্টেন নওশাদ। তখনই ককপিটের কন্ট্রোল নেন সঙ্গে থাকা ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম, ঘোষণা করেন মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি। ক্যাপ্টেন নওশাদ অসুস্থ হওয়ার ২৫ মিনিটের মধ্যে নাগপুরের ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করানো হয় উড়োজাহাজটিকে।

ঢাকার বিএএফ শাহীন স্কুল ও কলেজে লেখাপড়া করা নওশাদের বাবা আবদুল কাইয়ুমও একজন পাইলট ছিলেন। ১৯৭৭ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জন্ম নেওয়া নওশাদ ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে পাইলট হিসেবে যোগ দেন। পেশাগত দক্ষতায় তিনি এর আগেও আরেকটি বড় দুর্ঘটনা থেকে যাত্রীদের রক্ষা করেছিলেন।

২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ক্যাপ্টেন রন অ্যাবেল ক্যাপ্টেন নওশাদকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রশংসাপত্র পাঠান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় মারা যান আব্দুল কাইয়ুম। বাবার মৃত্যুর ছয় মাসের মাথায় নাগপুরে মারা গেলেন নওশাদ। তাঁর এক আত্মীয় ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বাবাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই আকাশে ওড়ার আগ্রহ তৈরি হয় নওশাদের মধ্যে। যে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজটি তিনি শেষ পর্যন্ত চালাতেন, সেটা ছিল তাঁর বন্ধুর মতো।’

বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) সভাপতি মাহবুবুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উনি একজন দক্ষ পাইলট ছিলেন। চাকরির প্রতি নিষ্ঠাবান ছিলেন। তাঁর অকালমৃত্যুতে শুধু বিমান নয়, এভিয়েশন খাতের বড় ক্ষতি হলো।’ তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিমানের একটি সূত্র জানায়, আজ মঙ্গলবার বাদ জোহর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সব মসজিদে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হবে।

 



সাতদিনের সেরা