kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

নওগাঁর তিন উপজেলায় বসুন্ধরার খাদ্য সহায়তা

ফরিদুল করিম ও নাজমুল হুদা, নওগাঁ থেকে   

৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নওগাঁর তিন উপজেলায় বসুন্ধরার খাদ্য সহায়তা

নওগাঁ কেডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গতকাল কালের কণ্ঠ শুভসংঘের উদ্যোগে দুস্থদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন জেলা প্রশাসক মো. হারুন-অর-রশীদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

দোলে বেগমের এক পা নেই। চলাফেরা করেন লাঠিতে ভর দিয়ে। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বাস করেন অন্যের ভিটায়। সঙ্গে মেয়ের জামাইও থাকেন। রিকশা চালিয়ে জামাই সামান্য যে উপার্জন করেন তা দিয়ে কোনোভাবে দুই বেলার আহার জোটে তাঁদের। গতকাল বুধবার দোলে বেগম নওগাঁ সদর উপজেলার চণ্ডিপুর বোর্ড মাদরাসা মাঠে এসেছিলেন বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তার খাদ্যসামগ্রী নিতে। কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যদের বিতরণ করা এই খাদ্যসামগ্রী পেয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি। বলেন, ‘কী কমু বা দুঃখের কথা। মেয়েত জামাই দিন আনে দিন খায়। তা দিয়াই মোক কষ্টত চলে যায়। তোমাঘর খাবার পানু, দোয়া করি। আল্লা আরো দিবার তৌফিক থুক।’

বসুন্ধরার সহায়তার খাদ্যসামগ্রী নিতে এসেছিলেন আব্দুল লতিফ নামে আরেক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘মুই আগে ডেকোরেটর দোকানত কাম করতাম। এলা করোনায় দোকান বন্ধ। কাম করবা পারি না। খাওয়া কষ্ট হয়। এলা চাল-ডাল দিয়া ১০ দিন খায়ে থাকপা পারুম।  তোমাঘরক আল্লা সুস্থ থুক।’

শুভসংঘের বিতরণ করা খাদ্যসামগ্রী পেয়ে আমেনা বেগম নামের আরেক নারী বলেন, ‘মোর স্বামী মারা গেছে। বেটা আর বেটার বউ ভিনো খায়। মোর এটা ১৪ বছরের বেটি আচে। ওর বিয়া দিচু নতুন। মানুষের বাইত কাম করে দিন চলে। নতুন বেটির বাইত অনেক কিচু দিবা হয়। কিন্তু মুই নিজেই একন খাওয়া পাচো না, বেটিক কী দিমু? করোনা না হলে তা-ও মানসের বাইত কাম কিরে দিন চলত। একন তো খাওয়ার কষ্ট। তোমরা আজকা এলা না দিলে আজকাও না খায়া থাকপা হলোহিনি। তোমরা যারা ত্রাণ দেচিন হামাঘরক আল্লা বেকের ভালো থুক।’

স্বাস্থ্যবিধি মেনে গতকাল নওগাঁ জেলার তিনটি উপজেলার সদর উপজেলার কেডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ৩০০, চণ্ডিপুর বোর্ড মাদরাসা মাঠে ২০০, রানীনগর উপজেলার কুজাইল বাজার মাঠে ২৫০ এবং আত্রাই উপজেলার কাশিয়াবাড়ী বাজার মাঠে আরো ২৫০ দুস্থ পরিবারের মাঝে (প্রতিজনকে ১০ কেজি চাল, তিন কেজি ডাল ও তিন কেজি আটা) বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তার খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন শুভসংঘের সদস্যরা। এ সময় সবার মাঝে মাস্ক বিতরণ করে করোনা থেকে সুরক্ষায় সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়।

বসুন্ধরার খাদ্যসামগ্রী পেয়ে রহিম মিয়া নামের এক উপকারভোগী বলেন, ‘আমি পঙ্গু। কোনো কাম করা পাই না। কষ্টে কোনোমতে দিন যায়। সরকার নাকি সাহায্য করে, সেই সাহায্যও পাই না। ভাতার ট্যাকা দিয়া খরচ চালাই। তোমরা হামাঘরের জন্য যা করলিন তা ভুলবার পারমু না। সবার ভালো হোক।’

জিন্না খাতুন নামের আরেক উপকারভোগী বলেন, ‘তোমাঘের বসুন্ধরা গ্রুপ মোকে সাহায্য দিল। এলা দিয়া মোর মেয়েক নিয়া অনেক দিন খাবার পারমু। আমার খুব উপকার হইলো বা। দোয়া থুই, মোক আরো দিবার পারবি তোরা।

নওগাঁ কেডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে জেলা প্রশাসক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘দেশে চলমান করোনার এই ক্রান্তিলগ্নে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় কালের কণ্ঠ শুভসংঘের এমন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপ আপনাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জেলার অসংখ্য অতিদরিদ্র মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিবে বসুন্ধরা গ্রুপ। এ জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। করোনা মোকাবেলায় আগামী ৭ আগস্ট থেকে আপনাদের মাঝে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। আপনারা সবাই টিকা নিবেন। আর সবাই সঠিকভাবে মাস্ক পরবেন। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।

রাণীনগরের কুজাইল বাজার মাঠে বসুন্ধরার সহায়তার খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে যোগ দিয়ে নওগাঁ-৬ আসনের (আত্রাই-রাণীনগর) সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন হেলাল বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই দেশজুড়ে অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। আমাদের জেলায়ও তারা তিন হাজার পরিবারকে সহায়তা দিচ্ছে। এর জন্য আবারও ধন্যবাদ জানাই তাদের। আমরা চাই তাদের এই মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে আপনারা সতর্ক থাকবেন। কেউ অযথা ঘর থেকে বের হবেন না। সবাই করোনার টিকা নিবেন। আত্মীয়-স্বজনদেরও টিকা নিতে উৎসাহিত করবেন।’

চণ্ডিপুর বোর্ড মাদরাসা মাঠে উপস্থিত হয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মির্জা ইমাম উদ্দিন বলেন, ‘করোনার কারণে এখন খেটে খাওয়া মানুষের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সময় বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তার খাদ্যসামগ্রী পেয়ে কিছুদিন নিশ্চিতে খেতে পারবেন এই মানুষগুলো। আমি বসুন্ধরা গ্রুপ এবং কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সবার মঙ্গল কামনা করছি। ভবিষ্যতেও আপনাদের এই মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে সেটিই প্রত্যাশা করি।’

সদর উপজেলায় সহায়তার এই খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন নওগাঁ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. লুত্ফর রহমান, নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম খান, চণ্ডিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেদারুল ইসলাম মুকুল, কেডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহা. মামুন অর রশিদ, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাসমত আলী, নওগাঁ জেলা শুভসংঘের আতিক শাহরিয়ার, মুমিনুল ইসলাম, শাকিল হোসেন, নিয়ন, নিশান, রূপক, সেতু, জয়, রায়হান, সাব্বির, মুন্না, সজল, রবিউল ও রাজকুমার।

রাণীনগর উপজেলায় খাদ্য বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ দুলু, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শ্রী সুশান্ত কুমার মাহতো, শুভসংঘ রাণীনগর শাখার সভাপতি এস এম সাইফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, জাকারিয়া সরল, পিন্টু খন্দকার, এনামুল হক, সাজুল, এরশাদ, কুদ্দুস, শাহিনুর ও মিজানুর।

হুইলচেয়ারে করে এসেছিলেন মহি আক্তার। বয়স ১৬। জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী। বাবা কৃষক। মহি ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠেছে নানার কাছে। কাশিয়াবাড়ী বাজার মাঠে তাকে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে এসেছেন নানা। বসুন্ধরার খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয় তার হাতে। মহি কথা বলতে না পারলেও খাদ্য সহায়তা পেয়ে ভীষণ আনন্দিত তার নানা। বললেন, ‘তোমাঘরক অনেক ধন্যবাদ হামাক ত্রাণ দেওয়ার জন্য। দোয়া করি দুধে-ভাতে থাকো। আল্লা ভালো করবে।’

সহায়তার খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করে ভ্যানচালক মোসলেম মিয়া বলেন, ‘হামি ভ্যান চালাই। দিন আনি দিন খাই। কিন্তু লকডাউনের তঙ্কে ভ্যান চালাও বন্ধ। একন ঘরত বসে আচি, কিন্তু পেট তো আর কেচুই মানে না। প্রতিদিন খাবা তো হবে। হামরা দিন আনে দিন খাওয়া মানুষেরা বিপদে পড়ে গেচি। তোমরা হামাঘরের বিপদের দিনত পাশে দাঁড়াইচিন। তোমাঘরের ভালো হক।

বসুন্ধরা গ্রুপের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে যোগ দিয়ে আত্রাই উপজেলার ভোঁপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জানবাক্স বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা আমাদের উপজেলাসহ দেশজুড়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমরা সবাই দোয়া করি তাঁদের যেন আল্লাহ মঙ্গল করেন। করোনা থেকে সুরক্ষিত রাখেন। বসুন্ধরা গ্রুপের মতো দেশের সব বড় প্রতিষ্ঠান অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে লকডাউনে দেশের এই অসহায় মানুষগুলো ঘরে বসে খেতে পারত। আর আমাদেরও করোনা মোকাবেলা সহজ হতো। আমি সবার প্রতি বসুন্ধরা গ্রুপের মতো মানবিক সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।’

এ সময় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন আত্রাই উপজেলা শাখা শুভসংঘের সভাপতি মুজাহিদ খান, স্বেচ্ছাসেবী আব্দুস সাত্তার, আব্দুল খালেদ, সাদ্দাম, মনোয়ার হোসেন ও উজ্জ্বল হোসেন।

গতকাল বসুন্ধরার খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সব কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, শুভসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, কালের কণ্ঠ রাণীনগর উপজেলা প্রতিনিধি শাহরুখ হোসেন আহাদ, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও নিউজ টোয়েন্টিফোরের জেলা প্রতিনিধি বাবুল আখতার রানা ও শুভসংঘের উত্তরা ইউনিভার্সিটির সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেন রনি।



সাতদিনের সেরা