kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

জয়পুরহাটের এক হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা

আলমগীর চৌধুরী ও নাজমুল হুদা, জয়পুরহাট থেকে   

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জয়পুরহাটের এক হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা

জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে গতকাল কালের কণ্ঠ শুভসংঘের উদ্যোগে দুস্থদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

দুর্ঘটনায় অল্প বয়সেই এক পা হারিয়েছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব জরিনা বেগম। আরেক পা ভেঙে বাঁকা হয়ে গেছে। চলাফেরা করতে হয় লাঠি ভর করে। কোনো কাজ করতে পারেন না। স্বামী মারা গেছেন এক বছর হলো। কোনো সন্তানও নেই। থাকেন রেল কলোনির অস্থায়ী খুপরিতে। দিন চলে অন্যের সহায়তা আর বয়স্ক ভাতার টাকায়। বসুন্ধরা গ্রুপের উদ্যোগে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ এই পঙ্গু বিধবার হাতে তুলে দিয়েছে খাদ্যসামগ্রী। ১০ কেজি চাল, তিন কেজি ডাল আর তিন কেজি আটা পেয়ে আবেগতাড়িত তিনি। জরিনা বলেন, ‘হামাকে বসুন্ধরা গ্রুপ উপকার করলু, তোকের মালিকর শরীর-গতর ভালো থাক। তোরা বাঁচি থাক। দুধে-ভাতে থাক। বাল-বাচ্চা ভালো থাক।’

জরিনার মতোই সহায়-সম্বলহীন সফি বানু। ৭৫ পেরিয়ে যাওয়া এই নারীর পৃথিবীতে স্বামী-সন্তান কেউ নেই। ভিক্ষা করে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন। শুভসংঘের খাদ্যসামগ্রী পেয়ে চোখের কোণে জল জমে তাঁর। বলেন, ‘হামি ভিক্ষা করে খাই। কাইল থেকে খাবার খাইতে পারি নাই। এই খাবার দিয়া আমি একলা এক মাস খাইতে পারমু। আল্লায় তোকের ভালো করবে।’

জয়পুরহাটের তিন উপজেলায় গতকাল রবিবার জরিনা বেগম ও সফি বানুর মতো এক হাজার অসহায়-দুস্থ পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে শুভসংঘ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আক্কেলপুর উপজেলার মুজিবুর রহমান সরকারি কলেজ মাঠে ৩০০, ক্ষেতলাল উপজেলার সরকারি ছাঈদ-আলতাফুন্নেছা কলেজ মাঠে ৪০০ ও কালাই উপজেলার সরকারি মহিলা কলেজ মাঠে ৩০০ পরিবারের মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় এই খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া সবার মাঝে মাস্ক বিতরণ ও করোনা সুরক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

আক্কেলপুরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম হাবিবুল হাসান বলেন, ‘করোনায় কর্মহীন ও অসহায় পরিবারের জন্য বসুন্ধরা গ্রুপ দেশব্যাপী যে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে, তার জন্য আমরা তাদের সাধুবাদ  জানাই। কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে আপনাদের সাত থেকে ১০ দিনের খাবার প্যাকেজ দিল। তাদের জন্য আপনারা দোয়া করবেন। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।’

এখানে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন মুজিবুর রহমান সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোকসেদ আলী, পৌর মেয়র শহিদুল আলম চৌধুরী ও থানার ওসি সাইদুর রহমান।

ক্ষেতলালে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান মুস্তাকিম মণ্ডল উপকারভোগীদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান কালের কণ্ঠ শুভসংঘের মাধ্যমে আজ আপনাদের কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। এমন মহতী উদ্যোগের জন্য উপজেলার পক্ষ থেকে আমি বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনারা তাদের জন্য দোয়া করবেন, যেন ভবিষ্যতে আবারও তারা আপনাদের পাশে দাঁড়াতে পারে।’

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক ফেরদৌসী রানা চৌধুরী বলেন, ‘কালের কণ্ঠ শুভসংঘ আজকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুশৃঙ্খলভাবে আমাদের উপজেলায় ৪০০ অসহায় মানুষকে খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে। একজন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক হিসেবে আমি তাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। প্রত্যাশা করি, ভবিষ্যতেও তাদের এমন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।’

এখানে আরো উপস্থিত ছিলেন ইউএনও এ এফ এম আবু সুফিয়ান, সরকারি ছাঈদ-আলতাফুন্নেছা কলেজের অধ্যক্ষ আইয়ুব হোসেন, পৌর মেয়র সিরাজুল ইসলাম বুলু, থানার ওসি নীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল, উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল মজিদ মোল্লা, পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি দুলাল মিয়াসহ স্বেচ্ছাসেবী আজিজুল হক, আব্দুল আলিম, আজিজার রহমান, হাসান ও সাইফুল ইসলাম মিলন।

কালাই উপজেলায় কাঠের পিঁড়িতে বসে দুই হাতে মাটিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হয় শামসুল আলমকে। গ্যাংগ্রিনের কারণে ২০ বছর বয়সেই তাঁর দুটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এরপর থেকে ৩০টি বছর ধরে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন তিনি। এক ছেলে থাকলেও কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করেন না। বয়স্ক ভাতা আর ভিক্ষা করেই স্ত্রীকে নিয়ে জীবন চলছে তাঁর। শুভসংঘের সদস্যদের থেকে খাদ্যসামগ্রী পেয়ে শামসুল বলেন, ‘আল্লাহ রহমত করুক। এই অসহায়কে খাবার দিছো। তোমাকের ভালো হবি। সুখে থাকবি তোমরা।’

শাজাহান মোল্লা নামের আরেক উপকারভোগী বলেন, ‘হামার এক হাত ভাঙা। কাম করবা পারি না। খুব কষ্টত আছি। তোমরা ত্রাণ দিছো। দুই হাত তুইল্যা দোয়া করি বাবা। আল্লায় বসুন্ধরা মালিকর মনের আশা পূরণ করবে। তাকত কবুল করবে।’

কালাইয়ে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টুকটুক তালুকদার বলেন, ‘এই করোনা দুর্যোগে অসহায় হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বসুন্ধরা চেয়ারম্যানের মতো দেশের বিত্তশালীরা এভাবে এগিয়ে এলে সরকার করোনার এই ক্রান্তিলগ্ন সহজে মোকাবেলা করতে পারবে। বর্তমানে করোনায় শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। মারাও যাচ্ছে। কারণ তারা অসচেতন। তাই আপনাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

এখানে এই কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিনফুজুর রহমান মিলন, কালাই সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ নাজিমউদ্দীন, থানার ওসি সেলিম মালিক, স্বেচ্ছাসেবী শাহারুল আলম, সেলিম সারওয়ার, কামরুল হাসান ও লিটন তালুকদার।

খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সব কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, শুভসংঘ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, উত্তরা ইউনিভার্সিটির সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেন রনিসহ জয়পুরহাট জেলার শুভসংঘের স্বেচ্ছাসেবী নূর-ই-আলম হোসেন, মোস্তাকিম বিল্লাহ, তরিকুল ইসলাম, ফিরোজ হোসেন, আবু তালহা সাঈদ, সানজিদ আহমেদ, সাইদুল ইসলাম, রাকিব হোসেন, কাউসার আহমেদ, ইশতিয়াক আহমেদ, নাছিম ও শিমুল।

 



সাতদিনের সেরা