kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

‘আল্লাহ তোমাকের জানমাল ভালো করুক’

বগুড়ার ৪০০০ পরিবারে শেষ হলো বসুন্ধরা গ্রুপের খাদ্য সহায়তা বিতরণ

লিমন বাসার ও নাজমুল হুদা, বগুড়া থেকে    

১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘আল্লাহ তোমাকের জানমাল ভালো করুক’

বগুড়ার শিবগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গতকাল কালের কণ্ঠ শুভসংঘের উদ্যোগে দুস্থদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আহম্মেদ রিজু। ছবি : কালের কণ্ঠ

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুলতান ইসলাম। তার জন্মের এক বছর পর পরিবার ছেড়ে চলে যান বাবা নাজমুল হক। প্রতিবন্ধী মা সুলতানা বেগমকে নিয়ে তার মানবেতর জীবন যাপন। এক মামা ছাড়া সুলতানদের দেখার আর কেউ নেই। বসুন্ধরা গ্রুপের খাদ্য সহায়তা নিতে এসেছিল সে। চাল, ডাল, আটার একটি বস্তা পেয়ে খুশি মনে মাথায় তুলে নেয় সে। ধন্যবাদ জানিয়ে সুলতান বলে, ‘এই বস্তা নিয়্যা মার হাতে দিমু। অনেক দিন খাবার পারমু। মা খুশি হইব।’

বৃদ্ধা জিলাতুন খাতুনের হাতেও তুলে দেওয়া হয় বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তার খাদ্যসামগ্রী। আপ্লুত জিলাতুন বলেন, ‘অনেক দিন হইছে স্বামী মইরা গেছে। দুই বেটার কেউ ভাত দেয় না। এক পয়সাও দেয় না। মাইনষে দুইটা ট্যাকা-পয়সা দিলে তা দিয়াই খাই। তোমাকের বসুন্ধরার মালিক আজ খাবার দিচ্চো। তোমাকের জানমাল ভালো করুক। দুধে-ভাতে থাকুক। আল্লা ভালো করুক।’

গতকাল শনিবার বগুড়া জেলার তিনটি উপজেলায় এ রকম ৯০০ অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটেছে বসুন্ধরা গ্রুপের খাদ্য সহায়তা পেয়ে। অসহায় মানুষের হাতে এই খাদ্য সহায়তা তুলে দেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিবগঞ্জ উপজেলায় শিবগঞ্জ পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ৩০০, কাহালু উপজেলায় কাহালু সরকারি কলেজ মাঠে ৩০০ এবং নন্দীগ্রাম উপজেলায় মনসুর হোসেন ডিগ্রি কলেজ মাঠে আরো ৩০০ অসহায় পরিবারের মধ্যে বসুন্ধরার সহায়তার খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বগুড়া জেলায় চার হাজার অসহায় পরিবারের মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের খাদ্য সহায়তা বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করল কালের কণ্ঠ শুভসংঘ। এ সময় সবার মধ্যে মাস্ক বিতরণের পাশাপাশি করোনা সুরক্ষায় সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়।

অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান জুয়েল মিয়া। লকডাউনে রিকশা নিয়ে বের হতে পারেন না। ফলে বন্ধ রোজগারের পথ। ছেলে-মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি। বসুন্ধরা গ্রুপের খাদ্য সহায়তা পেয়ে অশ্রুসিক্ত জুয়েল বলেন, ‘লকডাউনত গাড়ি নিয়ে বাহিরত যাবার পারিচ্চি না। টুকটাক করে যা পাচ্চি তাই দিয়্যা খরচ চলিচ্চে। খুব কষ্টত আছি হামরা। তোমাকেরা আজ সাহায্য দিচ্চো। এই খাবার দিয়্যা অনেক দিন খাবার পারমু।’

বসুন্ধরা গ্রুপের খাদ্য সহায়তা গ্রহণ করে ৯০ বছরের আসাদ আলী বলেন, ‘হামার ছোলপোল নাই। ভাতা দিয়া খরচ করি। তোমাকের সাহায্য পাইলে খাই। জীবনে প্রথম চিয়ারত বসে ত্রাণ পানু। বসুন্ধরাক ভালো হোক। তোমাকের দোয়া করি। আল্লা তোমাকের দেখি রাখব।’

শিবগঞ্জে বসুন্ধরার খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ রিজু বলেন, ‘করোনা দেড় বছর ধরে আমাদের ভোগাচ্ছে। সাধারণ মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে। মানুষ খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছে। গত বছর সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তবে এ বছর গত বছরের তুলনায় কমসংখ্যক শিল্পগোষ্ঠী পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশের এই ক্রান্তিকালেও বসুন্ধরা গ্রুপ কালের কণ্ঠ শুভসংঘের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। বগুড়া জেলার পাশাপাশি সারা দেশেই তাদের এই কার্যক্রম চলবে। তাই আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’

শিবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. তৌহিদুর রহমান মানিক বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় কালের কণ্ঠ শুভসংঘ দেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। আজকে শিবগঞ্জ উপজেলায় ৩০০ পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে। তাই তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আপনারা সবাই তাদের জন্য দোয়া করবেন।’

কাহালুতে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আল হাসিবুল হাসান সুরুজ বলেন, ‘দেশ এখন ক্রান্তিকাল পার করছে। সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। এমন সময়ে সরকারের পাশাপাশি বসুন্ধরা গ্রুপ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের ৭-১০ দিনের খাবার সহায়তা দিচ্ছে। তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। কালের কণ্ঠ শুভসংঘ এই খাদ্যসামগ্রী বিতরণে দেশব্যাপী অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। তাদেরও ধন্যবাদ জানাই। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পাশাপাশি দেশের সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উচিত এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।’

শিবগঞ্জে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজ্জাকুল ইসলাম রাজু, থানার ওসি সিরাজুল ইসলামসহ স্বেচ্ছাসেবী রায়হান, মাজিদ, নাঈম, আরমান, সাইদুর, নাজমুল ও মাইনুল।

কাহালুতে আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান, কাহালু সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন তালুকদার, কাহালু থানার ওসি আমবার হোসেন, প্রভাষক মাকসুদুর রহমান, শুভসংঘের গণবিশ্ববিদ্যালয় শাখার অর্থ সম্পাদক মিম খানসহ আল জামি, অপূর্ব মণ্ডল।

নন্দীগ্রাম উপজেলায় বসুন্ধরার খাদ্যসামগ্রী পেয়ে আবেদা বিবি নামে এক উপকারভোগী বলেন, ‘আল্লা যেন বসুন্ধরাক আরো তৌফিক দান করে। তোমাকের যেন ভালো করে। তোমরা হামাকেরে আরো বেশি বেশি দিবার পারো।’

৯০ বছরের আয়তুন আরা বলেন, ‘হামার পা ভাঙি গেছে বাবা। চলবার পারি না। হামার এটা বেটাও নাই। দেখবার কেউ নাই। মানুষের সাহায্য দিয়্যা বাঁচি আছি। তোমকেরা আজ সাহায্য দিচ্চো। এই খাবার দিয়া হামি অনেক দিন খাবার পারমু।’

খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিফা নুসরাত বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় বসুন্ধরা গ্রুপ অসহায়দের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করবে শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। সারা বাংলাদেশে তারা এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আজকে আমাদের উপজেলায় ৩০০ অসহায় পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। তাই তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। সমাজের বিত্তশালীরা যদি বসুন্ধরা গ্রুপের মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তবে আমরা খুব দ্রুত করোনা মোকাবেলা করতে পারব। আজকে যে খাদ্যসামগ্রী আপনাদের দেওয়া হলো এটি দিয়ে আপনারা ৭-১০ দিন খেতে পারবেন। এই সময় আপনারা কেউ ঘর থেকে বের হবেন না। সবাই মাস্ক পরবেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।’

এতে আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন রানা, উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শ্রাবণী আক্তার বানু, নন্দীগ্রাম পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুক্তার হোসেন বকুল, কালের কণ্ঠ নন্দীগ্রাম প্রতিনিধি ফিরোজ কামাল ফারুক, শুভসংঘের নন্দীগ্রাম শাখার সভাপতি আব্দুল মান্নান, সাধারণ সম্পাদক আবু তৌহিদ রাজিবসহ আরিফ, সজিব, আসিক, রিপন, রিফাত, মিশকাত,  সৌরভ, রাব্বি হাসান ও কাউসার।

এ ছাড়া খাদ্যসামগ্রী বিতরণের তিনটি কার্যক্রমেই উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, বগুড়া জেলার উপদেষ্টা মোস্তফা মাহমুদ শাওন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, বগুড়া জেলার সাধারণ সম্পাদক শিশির মোস্তাফিজ, সদস্য মশিউর রহমান জুয়েল, উত্তরা ইউনিভার্সিটির সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেন রনি।’



সাতদিনের সেরা