kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

ডিএনসিসি হাসপাতাল

সিট খালির অপেক্ষায় নতুন কভিড রোগী

ফারজানা লাবনী   

৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সিট খালির অপেক্ষায় নতুন কভিড রোগী

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা। রোগীর মৃত্যুতে খালি হলো একটি আইসিইউ শয্যা। মিনিট ১৭ বাদে কিছুটা সেরে ওঠা আরেক রোগীকে নেওয়া হলো সাধারণ শয্যায়। তার পরপরই সাধারণ শয্যায় থাকা গুরুতর দুই রোগী পেল আইসিইউ শয্যা। গত এক মাস ধরে রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালে এমন কর্মযজ্ঞে ব্যতিব্যস্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা। একটি সিট খালি হতে না হতেই উঠছে নতুন রোগী। গতকাল এই হাসপাতাল সরেজমিনে ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

সকাল ১০টায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায়, অ্যাম্বুল্যান্সের মধ্যে প্রায় অচেতন ব্যাংক কর্মকর্তা শাব্বির আহমেদকে (৫৪) অক্সিজেন লাগিয়ে রাখা হয়েছে। তিন দিন থেকে তিনি করোনায় আক্রান্ত। গতকাল সকাল থেকে তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। রোগীর পাশে স্ত্রী বসা। শাব্বির আহমেদকে ভর্তির জন্য জরুরি বিভাগে কর্মরতদের কাছে একটি সিট দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করছে স্বজনরা। হাসপাতালের কর্মকর্তা মো. আবীর তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে একটি সিটও নেই। অপেক্ষা করে সিট খালি হলে পাবেন। না হলে দয়া করে অন্য কোথাও যান।

ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড ১৯ হাসপাতালের পরিচালক এ কে এম নাসির উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে ২১২টি আইসিইউ বেড, ২৮৮টি এইচডিইউ বেড ও সাধারণ বেড আছে ৫০০টি। আজকে সকালে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয় ৫৪৫ রোগীর। ৫০০ জনকে আইসিইউ ও এইচডিইউতে রাখা হলেও বাকি ৪৫ জনকে সিট স্বল্পতায় রাখতে পারছি না।’ তিনি বলেন, এখানকার সাধারণ বেডগুলোতেও যাতে জটিল রোগীদের সেবা দেওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব বেডেও কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহে কাজ শুরু হয়েছে। আশা করি, ৭ আগস্টের মধ্যে সব কাজ শেষ হবে। তাহলে এই হাসপাতালের এক হাজার বেডই হবে জটিল কভিড রোগীর জন্য উপযুক্ত।

পরিচালক বলেন, ‘এ বছরের ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক উৎসাহে ও নির্দেশনায় আমরা এই হাসপাতালের যাত্রা করে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছি। প্রতি দিনই রোগীর চাপ বাড়ছে। এই চাপ সামলাতে হাসপাতালে আরো ১০০ চিকিৎসক, ২০০ নার্স ও ১৫০ জন অন্যান্য কর্মচারী এই মুহূর্তে প্রয়োজন। করোনা থেকে রক্ষা পেতে টিকা নিতে হবে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের গেট থেকে প্রবেশ করে প্রথমেই জরুরি বিভাগ। এখানকার বারান্দায় বসার ব্যবস্থা আছে। প্রথমে ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে জরুরি বিভাগের চিকিৎসককে দেখাতে হয়। রোগী ভর্তি করতে হলে আরো ৩০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয়। এখানে আইসিইউ বা এইচডিইউয়ের সেবা পেতে হলেও এই ৪০ টাকার বাইরে আর কোনো টাকা জমা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে থাকার জন্য আরো ২০০ টাকা জমা দিয়ে একটি পাস নিতে হয়। এখানে রোগীকে সব ধরনের ওষুধ বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকায় সব রোগীকে তা সব সময় সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।

এখানে চিকিৎসা নিয়ে অনেকে সন্তোষ্ট প্রকাশ করেছে। আবার অনেকে সিট সংকট ও চাহিদা অনুযায়ী সেবা না পেয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কভিড রোগী রাজিয়া রশিদের ছেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রিফাত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর পাঁচ দিন পর্যন্ত আম্মাকে বাসায় রেখে চিকিৎসা দিতে থাকি। হঠাৎ অক্সিজেনের লেবেল কমতে থাকে। ইউনাইটেডসহ বিভিন্ন বেসরকারি সরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে সাধারণ সিটও খালি পাই না। শেষ পর্যন্ত এই হাসপাতালে একটি সিট জোগাড় হয়। এই হাসপাতালের চিকিৎসা সম্পর্কে আগে তেমন কিছু জানতাম না। আম্মাকে ভর্তির পর এখানকার সেবায় আমি সন্তুষ্ট। এখানে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ আছে। তাত্ক্ষণিক আমার আম্মাকে চিকিৎসা শুরু করা হয়। তবে এখানে সেবার মান উন্নত করতে আরো জনবল এবং যন্ত্রপাতি প্রয়োজন।’

করোনা আক্রান্ত অসুস্থ বাবাকে নিয়ে ফরিদপুর থেকে এসেছেন স্কুল শিক্ষক আজহার কাজি। রোগীকে ভর্তি করতে না পেরে ক্ষোভ নিয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে আরো সিট বাড়ানোর মতো জায়গা আছে। অথচ এসব ঘরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অক্সিজেনের অভাবে রোগী উঠানো যাচ্ছে না। এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে আমাদের মতো সাধারণ আয়ের মানুষ কোথায় যাবে? বেসরকারি হাসপাতালে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা নেওয়া আমাদের মতো অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়।’

হাসপাতালে ১৬ দিন থেকে ভর্তি আছেন কভিড রোগী রহিমা খাতুন। তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘এখানে হুইলচেয়ার, সিলিন্ডার অক্সিজেন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আয়া, ওয়ার্ড বয়, নার্স ও চিকিৎসকও অনেক কম। এতে চিকিৎসা বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব বাড়ানো প্রয়োজন।’