kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

‘নোনা জলে আমরা মরতি বসিছি’

কৌশিক দে, খুলনা   

৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘নোনা জলে আমরা মরতি বসিছি’

‘চারপাশে পানি আছে, কিন্তু খাওয়ার পানি নাই, রান্নাবান্না, স্নান করা, ঘরের কাজে ব্যবহারের মতো পানি নাই। নদীর নোনা পানি মুখে তোলা যায় না। খাল-পুকুরের পানি ব্যবহার করে চর্মরোগ হচ্ছে। পড়ে যাচ্ছে মাথার চুল। দিন দিন অবস্থা খারাপই হচ্ছে। সামনে কী অবস্থা হবে জানি না।’ খুলনার পাইকগাছার কপোতাক্ষপারের গৃহবধূ শেফালী বিশ্বাস গত ২ মে কালের কণ্ঠকে বলছিলেন এভাবেই। খুলনা উপকূলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিন মাস ধরে অনুসন্ধানের সময় যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে সবারই মুখে ছিল সুপেয় পানির জন্য হাপিত্যেশ।

পাইকগাছার শেফালীর কথার প্রতিধ্বনি মিলল কয়রাও। এই উপজেলায় পানিসংকট সবচেয়ে বেশি মহেশ্বরীপুরে। এরপর রয়েছে আমাদী, বাগালী, মহারাজপুর, কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী। কয়রা সদর এলাকায় কিছু গভীর নলকূপ কাজ করলেও অন্যান্য ইউনিয়নে অবস্থা বেহাল।

বাগালী ইউনিয়নের বামিয়া গ্রামের গৃহবধূ দীপ্তি রানী মণ্ডল (৪৬) বলেন, ‘বছরের পাঁচ-ছয় মাস জলের কষ্ট বেশি থাকে। নিজেদের পুকুরের জলে কাজ হয় না। দুই কিলোমিটার দূর থেকে পুকুরের জল আনি। আবার ঠাকুরচক থেকেও জল কিনি।’

ঠাকুরচক গ্রামের গৌরহরি মণ্ডল ৩০০-৪০০ ফুট গভীরতার পুকুর নতুন করে কাটছিলেন। এখানে কাজ করছিলেন নারী শ্রমিক সন্ধ্যা রানী মণ্ডল (৩৭)। তিনি বলেন, ‘জলের জন্য আবার পুকুর খুঁড়তে হইচ্ছে। জলই নাই। লাইন দিয়ে ফিল্টারের জলও অনেক সময় পাওয়া যায় না।’

মাথাভাঙ্গা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম ভ্যান চালিয়ে দুই-তিন কিলোমিটার দূরের ৩৬টি পরিবারকে খাবার পানি সরবরাহ করেন। তিনি বলেন, ‘ঠাকুরচকের ফিল্টার থেকে পানি কিনে পরিবারগুলোকে দিই। মানুষের পানির কষ্ট সহ্য করা যায় না। প্রতিদিন তিন ট্রিপ দিই। প্রতি ট্রিপে ৩০ লিটারের ৯টি ড্রাম রাখা যায়। দুই-তিন ঘণ্টা লাইন দিয়ে পানি নিতে হয়।’ 

তালবাড়িয়া গ্রামের মো. ইব্রাহিম খলিল (৫০) বলেন, ‘বাঁশখালী স্কুলের পুকুর আমাদের ভরসা। কিন্তু দিন দিন পানির স্তর নিচে নামায় আগের মতো পানি নাই। আমাদের বাঁচতে হলে পুকুর ও বৃষ্টির পানির জন্য ট্যাংক দরকার।’

ঠাকুরচকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট বসিয়েছেন কবিদাস বাহাদুর (৫৫)। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে প্লান্টটি বসিয়েছি; কিন্তু পানি সরবরাহ করে পারি না। দুই-তিন কিলোমিটার দূর থেকে মানুষ আসছে। দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। ৫০ পয়সা লিটার দরে পানি দেওয়া হয়। কিন্তু কত দিন সম্ভব হবে, জানি না। এই প্লান্টটির ওপর তালবাড়িয়া, ঠাকুরচক, সরিষামুট, বৈরাগীচক, বাঁশখালী, চটকাতলা, মাথাভাঙ্গা ও বামিয়া গ্রামের মানুষ নির্ভরশীল।’

পুকুর নয়, রাস্তা চাই : মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের উত্তর মহেশ্বরীপুর সরকারি পুকুরটি আশপাশের তিন-চার হাজার পরিবারের ভরসা। কিন্তু পুকুরের পারে মাটি ফেলে নামমাত্র সংস্কার করা হলেও সেখানে যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা নেই। চারপাশের লবণ পানির ঘের সাঁতরে বা ঘেরের পার দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। আইলায় ভেঙে যাওয়া পুকুরের রাস্তাটি ১২ বছরেও পুনর্নির্মাণ হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা সাহিত্য রায় (৩৮) বলেন, ‘আমাদের পুকুর ঠিক করতি হবে না। রাস্তাটা চাই। তাহলিই আমরা বাঁচতি পারব।’ বিষ্ণুপদ মন্ডল (৬২) বলেন, ‘আমাদের পুকুর ছাড়া বাঁচার পথ নাই। টিউবওয়েলে হয় না; কিন্তু সরকার বা কেউই পুকুরের রাস্তাটা করছে না। অল্প কিছু মাটি দিয়ে নামে মাত্র পুকুরের পার ঠিক করে। এতে কোনো উপকার হয় না। রাস্তাটা হলে মানুষের কষ্ট কমত।’

সহিংসতায় রায়বাড়ীর পুকুর : ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হয় বাঁশখালীর রায়বাড়ীর পুকুর। হিন্দু অধ্যুষিত ওই এলাকার কমপক্ষে পাঁচ গ্রামের চার-পাঁচ হাজার মানুষের সুপেয় পানির উৎস ছিল পুকুরটি। কিন্তু ওই নির্বাচনের পরপরই গরু কেটে এই পুকুরে বর্জ্য ও রক্ত ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। সেই থেকে পরিত্যক্ত ‘রায়বাড়ীর পুকুর’। ক্ষোভে-দুঃখে তারা পুকুরটি সংস্কারের উদ্যোগও নেয়নি।

এদিকে আইলা-পরবর্তী সময়ে দাকোপের কালাবগী মডেল গ্রামে রেইন ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণ করে বেসরকারি সংস্থা সুশীলন। বর্তমানে সেগুলো আর কাজে আসছে না।

গত ৫ মে খুলনা শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে উপকূলের কালাবগী গ্রামে গেলে প্রশান্ত রায় (৫৬) বলেন, ‘জলের জন্য মরতি বসিছি। পুকুরের পানিই ভরসা। তাও দুই-তিন কিলোমিটার দূরের রামনগর, মান্নান ঢালীর পুকুর থেকে আনতি হয়। এক পট (ড্রাম, ৩০ লিটার) জল ৩৫-৪০ টাকা দিয়ে কিনতি হচ্ছে। আইলার পর সুশীলন কয়টা ট্যাংকি বানায়ে দিছে; তার কোনোটাই এখন কাজ করতিছে না। আমরা বিপদের মদ্যি আছি।’

একই গ্রামের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক মানবেন্দ্র রায় (৫২) বলেন, ‘আমার মেয়েটা খুলনার একটা কলেজে ইংরেজিতে অনার্সে পড়ে। জলের সমস্যার জন্য মেয়েটা বাড়ি আসতে চায় না। তিন কিলোমিটার দূরে ছাড়া জল মেলে না; তাও পুকুরের জল ৪০ টাকা পট। আমরা বেড়িবাঁধের বাইরের অর্ধশত পরিবার জল আর নদীভাঙন নিয়ে বিপদে আছি।’

কালাবগী-সুতারখালীর বাসিন্দা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবু দাউদ সানা (৪৮) বলেন, ‘বৃষ্টি ও পুকুরের পানিই আমাদের ভরসা। সব পানিই কিনতে হয়। ৩০ টাকা পট। তাও সব সময় পাওয়া যায় না।’

কৈলাশগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা কৃষক নেতা গৌরাঙ্গ প্রসাদ রায় (৫৮) বলেন, ‘লবণ পানি গোটা উপকূলকে শেষ করে দিয়েছে। নোনাজলে আমরা মরতি বসিছি। চারদিকে জল থাকলেও ব্যবহার উপযোগী জল নাই। কৃষি, মানুষের প্রাণ-জীবিকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য সব পুকুর, খাল, জলাশয় ইজারা বন্ধ করতে হবে। জোয়ার-ভাটা নিশ্চিত করার মাধ্যমে পানিপ্রবাহ ঠিক করতে হবে। বন্ধ করতে হবে লবণ পানি দিয়ে মাছ চাষ। তা না হলে উপকূলের মানুষ বাঁচবে না; পানির জন্যই তারা শেষ হয়ে যাবে।’

দাকোপ উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন কালাবগী, সুতারখালী, কামারখোলা, গুনারী এলাকায়ও চরমে পৌঁছেছে পানিসংকট। দাকোপ সদর, কালীনগর, লাউডোব, তিলডাঙ্গাসহ গোটা উপজেলাতে চলছে হাহাকার।

এদিকে পাইকগাছার গড়ইখালী, চাঁদখালীতেও রয়েছে অভিন্ন সংকট। এ ছাড়া লতা, দেলুটি, সোলাদানা, লস্করেও পানি সমস্যার শেষ নেই; এসব এলাকায় নলকূপও বসানো যায় না। কপিলমুনি, হরিঢালী ইউনিয়নেও একই অবস্থা।

বাকা গ্রামের নূরুন্নাহার বেগম (৪৬) বলেন, ‘পানির অভাবে চাষবাস করতে পারি না। চর্মরোগের শিকার হচ্ছি। এ থেকে মুক্তি চাই।’

হেতামপুরের কাকলী রানী বিশ্বাস (৩৫) বলেন, ‘আমাদের জল তো আছে, কিন্তু ব্যবহার করার মতো জল নাই। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাব কবে, জানি না।’

পাইকগাছা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার বেশির ভাগ এলাকায়ই নলকূপ বসানো সম্ভব নয়। ফলে এখানকার পানির মূল উৎস পুকুর, জলাশয় ও বৃষ্টি। এ কারণে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, পিএসএফ, রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট স্থাপনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এখন আর ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে থাকলে হবে না। ভূ-উপরিস্থিত পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আমরা এ জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, পুকুর ও জলাশয় তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছি। এ জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদেরও পানির ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।’