kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

দৃষ্টিহীন দুখনির চোখে আশার আলো

বগুড়ার আরো তিন উপজেলায় ৯০০ অসহায় পরিবারের মুখে ফুটল হাসি

লিমন বাসার ও নাজমুল হুদা, বগুড়া থেকে   

৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



     

দৃষ্টিহীন দুখনির চোখে আশার আলো

বগুড়ার ধুনট সরকারি এনইউ পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গতকাল শুভসংঘের উদ্যোগে দুস্থদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার মহন্ত। ছবি : কালের কণ্ঠ

দুখনি খাতুন। দুঃখই যেন তাঁর জীবন। দুঃখ পেলে যে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে তাঁর সে চোখই দেখে না পৃথিবীর আলো। ছোটবেলায় ঝাপসা দেখলেও ধীরে ধীরে চোখের জ্যোতি হারিয়ে ফেলেন তিনি। এ কারণে দুই বছর আগে স্বামীও দুখনিকে ছেড়ে চলে যান। এই দুঃখ শুধু যে দুখনির তা নয়, পরিবারের সবার। সবাই যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। মা-বাবা, ভাই-বোন নিয়ে তাঁদের ছয়জনের সংসার। বসবাস বগুড়ার ধুনট উপজেলার আরকাটিয়া গ্রামে। মানুষের সাহায্য আর ভাতা দিয়েই চলে সংসার।

দুখনি খাতুনদের এমন অন্ধকার জগতে আশার আলো হয়ে হাত বাড়িয়ে দিল শুভসংঘ। তাঁদের পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের হাতে তুলে দিয়েছে খাদ্যসামগ্রী। ত্রাণ পেয়ে দুখনি বলেন, ‘আল্লায় বসুন্ধরার মালিককে শান্তিতে রাখুক। এলা কামাই রোজগার বাড়ায়া দিক। তাঁর জন্য দোয়া করিচ্চি। তোমাকের জন্যও দোয়া করিচ্চি। হামাকের সবাইরে তোমরা সাহায্য দিলা। তোমাকের আল্লা ভালো করিবে।’

দুখনির বোন আজিনা খাতুনও দোয়া করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা হামাকেরে দেকিচ্চুন। তোমাকেরে আল্লায় দেকিবে। তোমাকেরে দুধে-ভাতে রাখিবে।’ এ সময় তাঁদের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু।

গতকাল বৃহস্পতিবার বগুড়ার আরো তিনটি উপজেলায় দুখনির পরিবারের মতো ৯০০ অসহায় ও দুস্থ পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে শুভসংঘ। বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া সবার মাঝে মাস্ক বিতরণ এবং করোনা সুরক্ষায় সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হয়।

দিনের প্রথম কর্মসূচিতে ধুনট উপজেলার এনইউ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ৩০০ পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়। এতে উপস্থিত হয়ে ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সঞ্জয় কুমার মহন্ত বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ সারা দেশে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বগুড়া জেলার সব উপজেলায় শুভসংঘের মাধ্যমে অসহায় ও দুস্থ মানুষকে খাদ্যসামগ্রী দিচ্ছে। আজকে আমাদের উপজেলায়ও তারা ত্রাণ দিল। তাই আমি বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা আশা করব, শুভসংঘের মতো দেশের সব সংগঠন যেন এভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ায়।’

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন ধুনট পৌরসভার মেয়র এ জি এম বাদশাহ, থানার ওসি কৃপা সিন্ধু বালা, ধুনট এনইউ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান, কালের কণ্ঠ’র উপজেলা প্রতিনিধি রফিকুল আলম, শুভসংঘের ধুনট উপজেলার সভাপতি রেজাউল ইকবাল মিন্টু, সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন, আমিনুল ইসলাম, বাবুল ইসলাম, তরিকুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম, আবদুল হামিদ, মিজানুর রহমান।

এরপর শেরপুর উপজেলায় ৩০০ পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী দেয় শুভসংঘ। উপজেলার উলিপুর আমেরিয়া সমতুল্যা বালিকা সিনিয়র মাদরাসার মাঠে ত্রাণ বিতরণ করেন শুভসংঘের সদস্যরা। বসুন্ধরা গ্রুপের দেওয়া খাদ্যসামগ্রী পেয়ে সেফাত আলী বলেন, ‘হামি কাম করবার পারিচ্চি না। বুকত সমস্যা হয়। ছোলেরা পৃথক থাকে। ট্যাকা-পশা দিবার পারে না। তোমাকের ত্রাণ দিয়া হামরা কয়েক দিন খাবার পারিমু। তোমাকের জন্য দোয়া করিচ্চি।’

হাকিম মিয়া নামের এক উপকারভোগী বলেন, ‘করোনার মধ্যে হামি ভ্যান চলাবার পারিচ্চি না। কামকাজ বন্ধ হয়া গেছে। কেউ হামাক সাহায্যও দিচ্চে না। বউ-ছোল লিয়া ক্যাবার করে খামো। তোমরা আজ চাল-ডাল দিচ্চো। এই খাবার দিয়া হামাকের ১০ দিন চলবি বারে।’

সেখানে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও শেরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মজনু বলেন, ‘মহামারির সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকারের পাশাপাশি দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারই অংশ হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। শুভসংঘের মাধ্যমে বগুড়ার প্রতিটি উপজেলায় দুস্থ মানুষদের খাবার সহায়তা দিচ্ছে। এর জন্য আমি বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই।’ তিনি করোনা মোকাবেলায় সবাইকে মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং টিকা নেওয়ার জন্য আহ্বান জানান।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঈনুল ইসলাম, ওসি শহিদুল ইসলাম, পৌরসভার মেয়র জানে আলম খোকা, কালের কণ্ঠ’র উপজেলা প্রতিনিধি আইয়ুব আলী, শুভসংঘের শেরপুর উপজেলার উপদেষ্টা মুন্সি সাইদুল বারী ডাবলু, শেরপুর শাখার উপদেষ্টা চিকিৎসক আখতারুল আলম আজাদ, সভাপতি অধ্যক্ষ মো. আব্দুল হাই, সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল কাদের মজনু, শিক্ষক শাহনাজ পারভীন, আইনজীবী এহসানুল হক, হাবিবুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, রোকেয়া বেগম, ইমরান হোসেন, শাহিন আলম।

শাজাহানপুর উপজেলায় ৩০০ অতিদরিদ্র পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। উপজেলার মাঝিড়া মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এই ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে আসা তোফাজ্জেল মিয়া কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন তিন বছর হলো। ছেলে জাহিদুলের পরিবারেও টানাটানি। তাঁর দুই ছেলে প্রতিবন্ধী। নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম অবস্থা। তাই দেখভাল করতে পারেন না মা-বাবাকে। তোফাজ্জেল বলেন, ‘কী করমু, কও বাবা। ছোলই খাইয়া বাঁচবার পারে না।’ শুভসংঘের ত্রাণ পেয়ে তিনি বলেন, ‘হামারে যে দিছে তাক যেন আল্লায় ভালো করে। হামাকের যেন আরো দিবার পারে। এই চাল দিয়্যা হামরা দুজন মেল্যা দিন খাবার পারিমু। তোমাকেরে জন্যে দোয়া করমু।’ ত্রাণ পেয়ে আজিরুন বেগম বলেন, ‘হামি একলা মানুষ। মানসের কাছ থ্যাকা চাইয়া খাই। তোমরা হামাক যে খাবার দিচো তা হামি এক মাস খাবার পারমু। বসুন্ধরার মালিকের জন্নি দোয়া করমু। হামাকেরোক যেন আরো দিবার পারে।’

ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন সান্নু বলেন, ‘আমি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। দেশে অনেক বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু তারা এগিয়ে আসেনি। করোনার এই ক্রান্তিকালে বসুন্ধরা গ্রুপ এগিয়ে এসেছে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। শুভসংঘের মাধ্যমে সারা দেশেই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে। তাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।’

কর্মসূচিতে আরো উপস্থিত ছিলেন ইউএনও আসিফ আহমেদ, ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন, মাঝিড়া মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. নুরুজ্জামান, কালের কণ্ঠ’র উপজেলা প্রতিনিধি জিয়াউর রহমান, শুভসংঘের শাজাহানপুর শাখার উপদেষ্টা আব্দুল হালিম দুদু, সভাপতি মো. খোরশেদ আলম, সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান আতিক, মিজানুর রহমান, রব্বানি, আসলাম হোসেন, এনামুল হক, মুঞ্জুরুল হক, আলমগীর হোসেন, রফিকুল ইসলাম, সানোয়ার, শাহজাহানপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, প্রভাষক আব্দুল আজিজ।

ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, বগুড়া জেলা শাখার উপদেষ্টা মোস্তফা মাহমুদ শাওন, শুভসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শিশির মোস্তাফিজ, সদস্য মশিউর রহমান জুয়েল এবং উত্তরা ইউনিভার্সিটি শাখার সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেন রনি।