kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

সমন্বয়হীনতায় ধোঁকে প্রকল্প

► অজানা কারণে জিইয়ে রাখা হয় দূরত্ব
► জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থাকে অন্ধকারে

কৌশিক দে, খুলনা   

২৯ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সমন্বয়হীনতায় ধোঁকে প্রকল্প

সুপেয় পানির সংকট নিরসনে খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়। অজানা কারণে নিজেরাই তৈরি করে রাখে দূরত্ব। এনজিওগুলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হলেও তারা কাজের জন্য জবাবদিহি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা প্রশাসকের দপ্তরে। সেখানে কখনো কখনো মাসিক সভায় ওঠে সুপেয় পানির আলোচনা। তবে পানি ও স্যানিটেশনের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের হলেও তারা থাকে অন্ধকারে।

কালের কণ্ঠ’র গভীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে—সিডর, আইলা, আম্ফানের পর সুপেয় পানি নিয়ে এই এলাকায় অনেক কাজ হয়েছে। এর মধ্যে আছে পিএসএফ নির্মাণ, পুকুর সংস্কার, টিউবওয়েল স্থাপন, স্যানিটেশনব্যবস্থার সম্প্রসারণ। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের কাছে এসব বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই। এনজিওর কাজেরও নেই কোনো তদারকি। শেষমেশ পানি প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার দায় চাপানো হয় ‘সুফলভোগী’ নামের ভুক্তভোগীদের ঘাড়েই।

খুলনা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী, খুলনা জেলায় ১৩ হাজার ১৮৮টি গভীর নলকূপ, ১১ হাজার ১২৮টি অগভীর নলকূপ, ৫৫৮টি পিএসএফ, দুই হাজার ৫৮২টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্লান্ট করা হয়েছে।

খুলনা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জামানুর রহমানও সমন্বয়হীনতার কথা স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পানি প্রকল্পগুলো টেকসই না হওয়ার পেছনে রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা ও মালিকানা স্বত্ব সৃষ্টি না হওয়াই অন্যতম কারণ। শর্ত অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর বেসরকারি সংস্থাগুলো উপকারভোগীদের কাছে হস্তান্তর করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউনিয়ন বা পৌর কর্তৃপক্ষও দায়িত্ব পায়; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো দীর্ঘমেয়াদি হয় না। সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাব রয়েছে। সব কিছু যদি একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মধ্যে আনা যায়, তাহলে সরকারি-বেসরকারি সবার কাজের সুফল দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব।’ তিনি আরো বলেন, ‘বেসরকারি সংস্থা কোনো প্রকল্প শেষ করে আমাদের কাছে হস্তান্তর করলে সেটি সচল রাখার দায়িত্ব আমাদের; কিন্তু প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে গেলে সেটি আর আমাদের আওতায় থাকে না।’

তৃতীয় উপকূলীয় পানি সম্মেলন কমিটির সদস্যসচিব ও বেসরকারি সংস্থা অ্যাওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আরফীন বলেন, ‘উন্নয়নের নামে আমরা আসলে কয়েক দশক ধরে পানি-প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে চলছি। ভূ-উপরিস্থিত পানির আধার নষ্ট হয়েছে। পানির বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় না নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক উদ্যোগ বা প্রকল্প স্থানীয় বাসিন্দারা পছন্দও করেনি। স্থায়ীভাবে সংকট নিরসনের জন্য সামগ্রিকভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পানি-প্রতিবেশকে বিবেচনায় রাখতে হবে। খাল-বিল-জলাশয় দখলমুক্ত করে জোয়ার-ভাটা নিশ্চিত করতে হবে। লবণ পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ করে জমি ধ্বংসের কাজ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।’

রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘পানিসংকট নিরসন করতে হলে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে মূল জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ইজারা প্রথা বন্ধ করে সরকারি পুকুর-জলাশয়, নদী-খাল উন্মুক্ত ও মাছ চাষ বন্ধ করতে হবে। প্রকৃতিনির্ভর প্রকল্প ও ভূ-উপরিস্থিত পানির সঠিক ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে টাকা খরচ হবে; কিন্তু সংকট থেকেই যাবে।’

খুলনার স্থানীয় সরকার দপ্তরের উপপরিচালক মো. ইকবাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পানি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পর এর বেশির ভাগই দেখভালের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে দেওয়া হয়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেখাশোনা করে। জনস্বাস্থ্যের মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো তদারক করে প্রতিবেদন দেয় স্থানীয় সরকার। তবে মূল দায়িত্ব থাকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর।’

পানি প্রকল্পগুলোর যথাযথ তদারকি নেই কেন—প্রশ্ন করলে ইকবাল হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পের সুফলভোগীদের অসচেতনতায় অনেক সময় সমস্যা তৈরি হয়। এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবেও বিষয়টি দেখব।’

পানি প্রকল্পের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এস এম তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকল্পে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গে স্থানীয়রা খাপ খাওয়াতে পারে না। আবার কাজ শেষে বাস্তবায়নকারী সংস্থা চলে এলে উপকারভোগীরা সেগুলো দেখভালে মনোযোগী হয় না। এলাকায় কাজটি কে করবেন, কোথা থেকে টাকা আসবে—এসব নিয়ে সংকট দেখা দেয়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সুফল মেলে না।’

জানা যায়, ‘বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ’ নামে ৫৫৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় ভূ-উপরিস্থিত পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ বিষয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণের কাজও চলমান।

সফল রিভার্স অসমোসিস, তবু প্রশ্ন : পাইকগাছার হরিঢালী ইউনিয়নের মাহমুদকাঠিতে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে রিভার্স অসমোসিস (আরও) নামে একটি প্লান্ট স্থাপন করে অ্যাওসেড। এটি চলছে স্থানীয় সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির তত্ত্বাবধানে। কমিটি প্রতি লিটার পানি ৩০ পয়সা করে সরবরাহ করছে। সৌরবিদ্যুতে পরিচালিত এই প্লান্টের পানি পরিশোধন ক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ লিটার। এলাকাবাসী মোট খরচের ১৫ শতাংশ সহযোগিতা করেছে। একইভাবে হেতামপুরে ‘অ্যাওসেড’ আর ঋষিপাড়ায় ‘দলিত’ নামে আরেকটি এনজিও আরো দুটি প্লান্ট নির্মাণ করেছে। চায়না প্রযুক্তির এ ধরনের প্লান্টের দাম কম। তবে ইতালি বা আমেরিকান প্রযুক্তির একেকটি প্লান্টের দাম এক থেকে দেড় কোটি টাকা।

প্লান্টটির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি মেশিন দিয়ে তুলে মেমব্রেন ফিল্টারসহ অন্যান্য প্রযুক্তি দিয়ে পরিশোধনের মাধ্যমে পানিতে মিশে থাকা ক্ষতিকারক পদার্থ অপসারণ করা হয়। তবে এ প্রযুক্তিতে ভালো মানের সুপেয় পানি পেতে ভূগর্ভ থেকে তোলা পানির শতকরা ৬০-৭০ ভাগ অপচয় হয়।

এনজিও অ্যাওসেডের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শংকর বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা নিজেরাই প্লান্টটি রক্ষণাবেক্ষণ করছি। পানি বিক্রির টাকা থেকে প্লান্ট মেরামত খরচ ও একজন কর্মীর বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এর পরও আমাদের আড়াই লাখ টাকার মতো সঞ্চয় রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে কারো সহযোগিতা ছাড়াই এটি পরিচালনা করা যাবে। এমন ব্যবস্থাপনা সব প্রকল্পেই থাকা উচিত।’

মাহমুদকাঠি গ্রামের ষষ্ঠী শীল (৫৫) বলেন, ‘একসময় জলের জন্য আমাদের কষ্টের শেষ ছিল না। এখন সমস্যা কেটে গেছে। প্রয়োজনমতো জল পাচ্ছি।’

প্রকল্পটি আপাতভাবে সফল মনে হলেও অপরিশোধিত পানি সংরক্ষণ নিয়ে সংকট রয়েছে। আবার ভূগর্ভ থেকে কত দিন সুপেয় পানি মিলবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে শংকর বিশ্বাস বলেন, যত দিন ভূগর্ভে পানি থাকবে, তত দিন মিলবে। তবে বিকল্প ব্যবস্থার কথা আগেই ভাবতে হবে।

 



সাতদিনের সেরা