kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

করোনাকালে নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন

► সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচন স্থগিত চেয়ে সিইসিকে আইনি নোটিশ
► নির্বাচন আরো কিছুদিন পিছিয়ে দিতে আইনগত বাধা নেই : কবিতা খানম

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ও সিলেট অফিস    

২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনাকালে নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন

আর মাত্র এক দিন। করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই পরশু বুধবার সিলেট-৩ আসনে উপনির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনী এলাকায় নেই ভোটের আমেজ কিংবা উচ্ছ্বাস। অলিগলিতে পথসভা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের প্রচারকাজের চিরচেনা দৃশ্য নেই বললেই চলে। আর যেটুকু প্রচার চলছে, তার প্রায় সবটুকু সরকারদলীয় প্রার্থীর। চলমান বিধি-নিষেধের কারণে অন্য প্রার্থীরা অনেকটা চুপচাপ। ভোটারদের মধ্যেও তেমন সাড়া দেখা যায়নি। বুধবার সারা দেশে কঠোর লকডাউন থাকলেও এদিন এ নির্বাচনী এলাকায় তা থাকছে না। সার্বিক এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে এই দুঃসময়ে কেন এই নির্বাচন। আরো কিছুটা সময় পার করে এ নির্বাচন দিলে কী এমন ক্ষতি হতো?

এদিকে এ উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ স্থগিত চেয়ে গতকাল রবিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। ‘ভোট পেছানোর আর সুযোগ নেই’—সিইসি কে এম নুরুল হুদার এ বক্তব্য চ্যলেঞ্জ করে আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, কমিশনের হাতে এখনো এক মাসের বেশি সময় আছে।

নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমও সময় থাকার বিষয়টি অস্বীকার করছেন না। গতকাল তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ উপনির্বাচনের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধান প্রদত্ত নিজ ক্ষমতাবলে অতিরিক্ত যে ৯০ দিন সময় নিয়েছেন, তাতে আগামী সেপ্টেম্বরের ৭ তারিখের আগে ভোট গ্রহণ করা যায়। আগস্ট মাসটি শোকের মাস হওয়ার কারণে এ মাসে নির্বাচন কমিশন কোনো নির্বাচনপ্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে চায় না। তবে সিলেট-৩ আসনের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ছাড়া অন্য সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সেপ্টেম্বরের ৭ তারিখের আগে যেকোনো দিন এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণে আইনি কোনো বাধা নেই।’ কবিতা খানম বলেন, ‘এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সিইসির। তিনি কমিশন সভা ডেকে এ বিষয়ে অন্য নির্বাচন কমিশনারদের মতামত চাইতে পারেন।’

সিইসিকে আইনি নোটিশ : ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়ে সিইসিকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। সুপ্রিম কোর্টের অন্য পাঁচ আইনজীবী মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম, আল-রেজা মো. আমির, মো. জোবায়দুর রহমান, মো. জহিরুল ইসলাম ও মুস্তাফিজুর রহমানের পক্ষে তিনি এই নোটিশ দিয়েছেন। গতকাল রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এই নোটিশ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়েছে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা না হলে উচ্চ আদালতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

গত ১১ মার্চ সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হয়। ৯০ দিন অর্থাৎ ৮ জুনের মধ্যে উপনির্বাচনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংবিধানের ক্ষমতাবলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে দৈবদূর্বিপাক উল্লেখ করে আরো ৯০ দিন সময় বাড়িয়ে নেন সিইসি। এরপর গত ২ জুন তফসিল ঘোষণা করা হয়। তফসিলে ১৪ জুলাই ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়। পরে ইসি ১৫ জুন পৃথক এক নোটিশে ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে ২৮ জুলাই।

এসব তথ্য তুলে ধরে নোটিশে বলা হয়েছে, দৈবদূর্বিপাকের কারণে সংবিধান অনুযায়ী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করার সুযোগ রয়েছে। অথচ সিইসি বলছেন, নির্বাচন পেছানোর কোনো সুযোগ নেই। সিইসির এই বক্তব্য সঠিক নয়।

নোটিশে বলা হয়, যে কারণে ৮ জুনের মধ্যে নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি, সেই কারণ এখনো দেশে বিদ্যমান। দেশে করোনাভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণ চলছে। তাই ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হোক। অন্যথায় উচ্চ আদালতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব ছাড়াও আরো তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন আতিকুর রহমান আতিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক বিএনপি নেতা শফি আহমদ চৌধুরী দাঁড়িয়েছেন মোটরগাড়ি প্রতীকে এবং ডাব প্রতীকে রয়েছেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী জুনায়েদ মুহাম্মদ মিয়া। প্রচারকাজে ও শোডাউনে সরকারদলীয় প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে যে কেউ জিততে পারেন বলে অনেকের ধারণা।

ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা এলাকার বাসিন্দা ছমছু মিয়া বলেন, ‘করোনার কারণে প্রচার স্বাভাবিক সময়ের মতো জমজমাট ছিল না। এর মধ্যেও প্রচারে নৌকার প্রার্থী এগিয়ে ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘ভোটার উপস্থিতি কম হবে মনে হচ্ছে।’ একই উপজেলার নিজামপুরের বাসিন্দা কুটু মালাকার বলেন, ‘ভোট যথাযথ হবে কি না সন্দেহ আছে। মানুষ যদি সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারে তবে লাঙলের প্রার্থী জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ একই মতামত ইসলামপুর গ্রামের ফয়েজ মিয়ার।

ফেঞ্চুগঞ্জের তুলনায় বালাগঞ্জ উপজেলায় নির্বাচনী প্রচার বেশি ছিল। বালাগঞ্জ ইউনিয়নের রহমতপুর গ্রামের আরশ আলী বলেন, ‘করোনার প্রাদুর্ভাব উপেক্ষা করে প্রার্থীরা হাট-বাজারে সরগরম প্রচারণা চালাচ্ছেন। কর্মী-সমর্থকরাও পোস্টার-লিফলেট নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইছেন।’ প্রথমবার ইভিএমে ভোট দেওয়ার আগ্রহ থাকলেও করোনার ভয়ে অনেকে ভোটকেন্দ্রে যাবেন না বলে ধারণা তাঁর। একই উপজেলার পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের সারসপুর গ্রামের তৌরিছ আলী বলেন, ‘প্রচার-প্রচারণায় মনে হচ্ছে, এখানে করোনার কোনো সংক্রমণ নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণসংযোগ ও প্রচারণার ছবি দেখলেই বোঝা যায় স্বাস্থ্যবিধি কী পরিমাণ লঙ্ঘিত হচ্ছে।’

দক্ষিণ সুরমায় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী শফি আহমদ চৌধুরীও লড়াইয়ে আছেন। সাবেক এই বিএনপি নেতা এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্যও।

নৌকার প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের শেষ নির্বাচনী জনসভা গতকাল বালাগঞ্জ উপজেলার ডিএন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক নৌকার পক্ষে ভোট চেয়ে বলেন, ‘এলাকার উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে নৌকা মার্কায় ভোটের বিকল্প নেই।’

জাতীয় পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিক গতকাল দুপুরে দক্ষিণ সুরমায় নিজের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও পুলিশ আমার নেতাকর্মীদের ভয় দেখাচ্ছে। হামলা-মামলার হুমকি দিচ্ছে।’

বিএনপির সাবেক নেতা শফি আহমদ চৌধুরী স্থানীয় মুরব্বিদের নিয়ে এবার প্রচার চালিয়েছেন। তিনি ভোটারদের কাছে ভোট চেয়ে বলছেন, ‘এটাই আমার জীবনের শেষ নির্বাচন।’ তিনি বলেন, ‘ভোট দেওয়ার প্রতি মানুষের মধ্যে যে অনীহা সৃষ্টি হয়েছে, যদি তা দূর করা যায় আর মানুষ ভোটকেন্দ্রে আসে, তাহলে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’

 



সাতদিনের সেরা