kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

লঘুচাপ ও পূর্ণিমার প্রভাবে বিপর্যয়ের মুখে উপকূল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লঘুচাপ ও পূর্ণিমার প্রভাবে বিপর্যয়ের মুখে উপকূল

সমুদ্র উত্তাল। জোয়ারের পানিতে গতকাল উপকূলের অনেক অঞ্চলের মতো কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

দুই মাস আগে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে ভেঙে পড়া বেড়িবাঁধ মেরামত না হওয়ায় চলমান লঘুচাপে আবারও বিপর্যয়ের মুখে উপকূলীয় এলাকা। ভাঙা বেড়িবাঁধের একাধিক পয়েন্ট দিয়েও সাগরের নোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। লঘুচাপের সঙ্গে যোগ হয়েছে পূর্ণিমা তিথি। জোয়ারের পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে কক্সবাজারের সাগরতীরের বিস্তীর্ণ এলাকা। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে জোয়ারের পানি ঢুকেছে লোকালয়ে। চরফ্যাশনে জোয়ারের পানিতে ভাসছে হাজারো মানুষ। এদিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি ও স্রোতের তীব্রতা বাড়ছে। গতকাল শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১০ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপত্সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নদীতীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামের মানুষ। সেখানে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গ্রামের বাসিন্দারা নৌকায় যাতায়াত করছে।

বঙ্গোপসাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত চার-পাঁচ ফুট বেড়ে গেছে জোয়ারের পানি। সাগরের জোয়ারের পানির তোড়ে কক্সবাজারের হিমছড়িতে কক্সবাজার জেলা পরিষদের মাধবী নামের রেস্টহাউসটি ধসে পড়েছে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। গতকাল সকাল ১১টার দিকে প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভবনটি ধসে পড়ে।

হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মিজানুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে ধসে পড়েছে কক্সবাজার জেলা পরিষদের রেস্টহাউসটি। ভবনটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ চিহ্নিত করে ২০১৭ সালে ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করেছিল জেলা পরিষদ। এরপর ভবনের আশপাশ থেকে দোকানপাট সরিয়ে নেওয়া হয়।

এদিকে উপকূলীয় ভাঙা বেড়িবাঁধের একাধিক পয়েন্ট দিয়েও সাগরের নোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। জোয়ারের পানির তোড়ে কক্সবাজার সাগরপারের বিপুলসংখ্যক ঝাউবীথিও পানিতে তলিয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে উত্তাল বঙ্গোপসাগরের পানি ফুঁসে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে ঝাউবীথিতে। ফলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের অনেক গাছ ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে কক্সবাজার ডায়াবেটিক হাসপাতাল পয়েন্ট।

জোয়ারের পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে কুতুবদিয়া দ্বীপের একমাত্র বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকাটিও। দ্বীপের আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের তাবালের চরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বেশ কিছু পয়েন্ট দিয়ে ঢুকে পড়া জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে লবণের মাঠসহ দ্বীপের ১০টি পাড়া। তলিয়ে যাওয়া বাড়িঘরের মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে বলে জানান কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরের জামান চৌধুরী। দ্বীপের এসব বাসাবাড়ির আনুমানিক ৩০ পরিবার টেকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুতুব আউলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।

দ্বীপের আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নরুছফা জানান, দুই মাস আগে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে কাহারপাড়া, কাজিপাড়া, পণ্ডিতপাড়া, তেলিপাড়া, হায়দারপাড়া, বায়ুবিদ্যুৎ এলাকা, পশ্চিম তাবালের চরসহ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এসব এলাকার লোকজন সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই আবারও ওই ভাঙন এলাকা দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, পুকুর, খাল-বিল তলিয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় অফিসের শাখা কর্মকর্তা (এসও) এলটন চাকমা জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের সময় যেসব এলাকা প্লাবিত হয়েছে, এবারও পূর্ণিমার জোয়ারে ওই এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ মেরামতের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অর্থের চাহিদাপত্র  পাঠানো হয়েছে।

রাঙ্গাবালীর অবস্থা :  পূর্ণিমার তিথি শুরুর আগেই লঘুচাপের প্রভাবে শুক্রবার দুপুরের জোয়ারে উপজেলার চর মোন্তাজ ইউনিয়নের  চর বেষ্টিন, দক্ষিণ চর মোন্তাজ, নয়ার চর, চর আণ্ডা ও  ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কোড়ালিয়া লঞ্চঘাট এলাকার ভাঙা বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকেছে। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের ছোবলে ওই পাঁচ এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ  বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। এ ছাড়া চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের বাঁধ অনেক আগ থেকেই ভেঙে আছে। এ বাঁধগুলো সংস্কার না করায় জোয়ারের পানি বাড়লেই লোকালয় প্লাবিত হয়ে স্থানীয় লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য, উপজেলার ১৪ কিলোমিটার ভাঙা বাঁধের আপৎকালীন জরুরি তিন কিলোমিটার সংস্কার করা হয়েছে। এখনো ১১ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার করা হয়নি।

কোড়ালিয়া লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দা তালাশ হাওলাদার বলেন, ‘কোড়ালিয়ার এটিকে  কেউ বলে বাঁধ, কেউ বলে রাস্তা। এটি ভাঙা থাকায় জোয়ারের পানি বাড়লে কষ্টের কোনো শেষ থাকে না আমাদের। আজকেও জোয়ারের পানি ঢুকছে।’

দুর্গম চর মোন্তাজ থেকে আইয়ুব খান বলেন, আজ দুপুরে চর বেষ্টিন, দক্ষিণ চর মোন্তাজ ও নয়ার চরে জোয়ারের পানি ঢুকছে ভাঙা বাঁধগুলো দিয়ে। ইয়াসে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত না করায় এই পূর্ণিমায় কয়েক দিন ওই সব গ্রামে জোয়ারের পানি ঢুকবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান বলেন, ‘নদী ও সাগরঘেরা রাঙ্গাবালীর ভাঙা কয়েকটি বাঁধ এরই মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এখনো কয়েকটি এলাকার বাঁধ ভেঙে আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ওই সব বাঁধ পরিদর্শন করেছে। আশা করছি, খুব দ্রুত বাঁধগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেবে পানি উন্নয়ন  বোর্ড।’

চরফ্যাশন : এ উপজেলার দক্ষিণ আইচার বিভিন্ন এলাকায় হাজারো মানুষ সংকটে পড়েছে। চর মানিকা, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচর, চর কুকরিমুকরি, চর পাতিলা, নজরুলনগর—এসব এলাকার মানুষ  পানিবন্দি অবস্থায় আছে। তলিয়ে গেছে এসব এলাকার মাছের ঘের, সবজিক্ষেত, ফসলি জমি। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেঘনা নদীতে ভাঙনও শুরু হয়েছে।

গতকাল চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার চর মানিকা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাজেদ মুন্সী বলেন, ‘মেঘনা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে আমার পুকুর, লেবুর বাগান, পটোলক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি চলমান থাকলে দু-এক দিনের মধ্য নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে যাবে।’   

চরফ্যাশন পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপপ্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান জানান, অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি তেঁতুলিয়া নদীর ১০ সেন্টিমিটার এবং মেঘনা নদীর ৬৯ সেন্টিমিটার বিপত্সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

[প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা।]