kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

আফগানিস্তানমুখী জঙ্গিরা নিয়ন্ত্রণে মরিয়া গোয়েন্দারা

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আফগানিস্তানমুখী জঙ্গিরা নিয়ন্ত্রণে মরিয়া গোয়েন্দারা

ফের আফগানিস্তানমুখী হচ্ছেন নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের সদস্যরা। তাঁদের আফগানিস্তান যাওয়ার ব্যাপারে গোপনে উৎসাহিতও করছেন আনসার আল ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) শীর্ষস্থানীয় নেতারা। এরই মধ্যে সংগঠনের দুই জঙ্গি নেতা আফগানিস্তানে যেতে দেশ ছেড়েছেন বলে তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)।

সিটিটিসির প্রধান আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশ থেকে আনসার আল ইসলামের দুই সদস্য আফগানিস্তানে গিয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। অবশ্য এটা এরই মধ্যে গ্রেপ্তারকৃতদের ভাষ্য। এ বিষয়ে আমরা আরো নিশ্চিত হতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছি।’

আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আনসার আল ইসলাম উপমহাদেশের আল-কায়েদার শাখা বলে নিজেদের দাবি করে। তদন্তে তাদের এই দাবির কতটুকু সত্যতা আছে, তা জানার চেষ্টা অব্যাহত আছে। তবে আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, যারা দেশকে ভালোবাসবে, তারা কখনো এমন জঘন্যতম কাজ করতে পারবে না। একই সঙ্গে তাদের বোঝা উচিত, কেউই আমাদের নজরদারির বাইরে নয়।’

র‌্যাব সূত্র বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার এবিটির নেতা মাহমুদ হাসান গুনবি তাঁর অনুসারীদের বেশির ভাগ সময়ই জিহাদে অংশ নেওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা দিতেন। সম্প্রতি তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে আফগানিস্তানের বিষয়টি তুলে ধরতেন। ঘনিষ্ঠদের তিনি আফগানিস্তানে যাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে।

জানা গেছে, এবিটির জঙ্গিরা দীর্ঘদিন ধরে চুপচাপ থাকলেও বর্তমানে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি তাদের উজ্জীবিত করে তুলেছে। তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে। এমনই একটি ক্লোজ গ্রুপের নাম ‘সায়েন্স প্রজেক্ট’। এই চ্যাট গ্রুপের ১০ তরুণের মধ্যে তিনজন আফগানিস্তানে যাত্রা করেছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের আফগানিস্তানে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা। এই দুজন হলেন কুমিল্লার আব্দুর রাজ্জাক ও সিলেটের শিব্বির আহমেদ। রাজ্জাক সিলেটে একটি মাদরাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি গাড়ি চালাতেন। তাঁর সন্ধান চেয়ে ভাই সালমান খান ২৫ মার্চ সিলেটের কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। আর রবিউল নামে নোয়াখালীর এক তরুণ আফগানিস্তানের উদ্দেশে বাড়ি ছেড়েছেন। তবে গত মে মাসে ওই গ্রুপেরই চারজনকে সিটিটিসি গ্রেপ্তার  করে। তাঁরা আফগানিস্তানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আফগানিস্তানের বড় একটি অংশ সম্প্রতি তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায়  সেখানে ‘ইসলামী শাসন ব্যবস্থা’ কায়েমে শরিক হওয়ার জন্য যুবকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এসব যুবকের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে। এরই মধ্যে আফগানিস্তানে যেতে ঘর থেকে অনেকেই বের হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্রপথে পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আর তাঁদের নিয়ন্ত্রণে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন গোয়েন্দারা। সমুদ্র বা অন্য পথে যাওয়ার চেষ্টার তথ্য গোয়েন্দারা পেয়েছেন গত ৮ মে আনসার আল ইসলামের চার সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর।

সূত্র জানায়, বেশ কিছু তরুণ-যুবা, যাঁদের একটি বড় অংশ উগ্রপন্থী ধারার কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে যোগ দিতে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিলেন। ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল এই আফগানিস্তানফেরতদের উদ্যোগেই ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজিবি) কার্যত আত্মপ্রকাশ করে। আফগানিস্তানফেরত মুজাহিদদের বেশির ভাগই এর সঙ্গে যুক্ত হয়। আফগান যুদ্ধের সময় তারা গেরিলাযুদ্ধ ও ভারী অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। হুজিবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ২০০৫ সালের অক্টোবরে। এরপর বিএনপি সরকারের শেষ দিকে এক দফা ব্যর্থ হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হুজি আবার নাম পাল্টে ইসলামী গণ-আন্দোলন বা আইডিপি (ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি) নামে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার চেষ্টা করে। তারা পল্টনে দলীয় কার্যালয় খোলে এবং নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে।

জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে র‌্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের টানা অভিযানের মুখে চুপসে গিয়েছিলেন হুজিবির সদস্যরা। একে একে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন হুজির প্রধান আব্দুল সালাম, একাংশের প্রধান মুফতি হান্নান (পরে ফাঁসিতে ঝুলেছেন), শেখ ফরিদ, মাওলানা ইয়াহিয়াসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা। তবে দেশের বাইরে অবস্থান করে এখনো হুজিবির সদস্যদের উৎসাহ এবং মদদ দিয়ে যাচ্ছেন নড়াইলের সাবেক সংসদ সদস্য মুফতি শহীদুল ইসলাম, মুফতি ফয়জুল্লাহ ও মাওলানা আবুবক্কর। আট বছর ধরে আনসার আল ইসলাম নামে হুজিবির সদস্যরা সক্রিয়। গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সংগঠনের আধ্যাত্মিক নেতা মাওলানা জসিম উদ্দিন রাহমানি বিভিন্ন সময়ে শলাপরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। এর পর থেকে তাঁরই একনিষ্ঠ অনুসারী মাওলানা মাহমুদ হাসান গুনবি সংগঠনের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, কয়েক বছর ধরে এবিটির সদস্যরা বিভিন্নভাবে গোপনে কক্সবাজার এলাকায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছিলেন। গত ৪ মার্চ এবিটির ‘অপারেশন শাখার প্রধান’ মো. মাইনুল ইসলাম ওরফে মাহিন ওরফে মিঠু ওরফে হাসান, সংগঠনের ‘শেখ’ সোহান শাদ ওরফে বারা আব্দুল্লাহ ও মুরাদ হোসেন কবিরকে গ্রেপ্তারের পর অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারেন গোয়েন্দারা। গ্রেপ্তার মাইনুল ঢাকায় মাদরাসা পরিচালনার নামে শিশুদের ‘জিহাদি’ প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। এ ছাড়া হেফাজতে ইসলামের সাম্প্রতিক নাশকতায় আফগানিস্তানফেরত যোদ্ধাদের ‘মদদ’ ছিল। তাঁদের একজন সর্বশেষ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া গুনবি।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল খায়রুল ইসলাম বলেন, “জঙ্গিরা র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যেই রয়েছে। মাঠে এবং সাইবারে আমাদের ‘২৪/৭’ নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।”



সাতদিনের সেরা