kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা রেডিও

দুর্দিনে কথা বলা জাদুর বাক্সটি স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে

শামীম আল আমিন, নিউ ইয়র্ক   

১৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্দিনে কথা বলা জাদুর বাক্সটি স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে

রেডিওকে বলা হয় ‘কথা বলা জাদুর বাক্স’। এই মাধ্যমে ছবি দেখা যায় না, শুধু কথার জাদুকরী আকর্ষণে শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। কঠিন এই কাজের মাধ্যমে দিনের পর দিন ৬৩ বছর ধরে নানা সংবাদ ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিল ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র যে বাংলা রেডিও সার্ভিস, তা আগামীকাল শনিবার থেকেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই খবরে বাংলা রেডিও সার্ভিসের বর্তমান ও সাবেক কর্মীদের পাশাপাশি, বিশেষ করে প্রবীণ শ্রোতাদের মধ্যেও বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে।

তাঁরা বলছেন, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এই রেডিও সার্ভিস যে অবদান রেখেছে, এর আবেদন কোনো দিন ফুরাবে না। সদ্য অবসরে যাওয়া রেডিওটির বাংলা বিভাগের বরেণ্য সাংবাদিক রোকেয়া হায়দার কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘আমার কাছে ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা রেডিও একটি অনুভূতির নাম।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টেলিভিশন বাজারে এলেও তখন বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম বলতে সবাই রেডিওকেই চিনত, রেডিওই শুনত। তখনকার প্রেক্ষাপটে ১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সামরিক শাসনের অধীনে থাকা ‘পূর্ব পাকিস্তানে’র বাংলাভাষী জনগণের জন্যই মূলত বাংলায় সংবাদ ও অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে ভয়েস অব আমেরিকা বা ভিওএ বা ভোয়া। ভিওএর যাত্রা শুরু হয় ১৯৪২ সালে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ছাড়াও প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের বাংলাভাষীরাও এত বছর ধরে শুনে আসছিল ভিওএর সংবাদসহ নানা অনুষ্ঠান। সামরিক শাসনের সময়গুলোতে যখন বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশন বা বেসরকারি রেডিও ছিল না, তখন ভিওএর স্বল্প তরঙ্গ রেডিও সম্প্রচার এখানকার জনগণের জন্য স্বতন্ত্র উৎস থেকে সংবাদ ও তথ্য পাওয়ার একটি লাইফলাইন হিসেবে কাজ করেছে।

ভিওএ জানিয়েছে, বেতারে শ্রোতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দর্শক-অনুসারীর সংখ্যা বাড়ায় তারা বাংলা এফএম ও শর্ট ওয়েভে রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৭ জুলাই শনিবার শেষবারের মতো বাংলা রেডিওর সম্প্রচার হবে। তবে তারা বাংলা বিভাগের টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কনটেন্টের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ এই প্ল্যাটফর্মগুলো ভিওএ বাংলার এক কোটি ৬০ লাখ সাপ্তাহিক শ্রোতা বেশি ব্যবহার করে থাকে।

ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইশতিয়াক আহমেদ। এরপর প্রবাদতুল্য কাফি খান, ইকবাল বাহার চৌধুরী, খন্দকার রফিকুল হক, সরকার কবিরউদ্দিন, ইকবাল আহমেদ, রোকেয়া হায়দার, দিলারা হাশেম, মাসুমা খাতুন, আনিস আহমেদের মতো মানুষের কণ্ঠ শোনা যেত এই মাধ্যমে। তাঁদের চেহারায় হয়তো খুব বেশি মানুষ চিনত না, কিন্তু কণ্ঠে পরিচিত ছিলেন কোটি কোটি মানুষের কাছে।

দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর এই রেডিওর সঙ্গে জড়িত ছিলেন রোকেয়া হায়দার। নিজের প্রিয় রেডিও সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এই খবরে তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রেডিও উপযোগিতা হারিয়েছে, এটা আমি মনে করি না। যে মাঝি বা জেলে মাঝনদীতে যায় জীবিকার টানে, তার কাছে কোনো টেলিভিশন কিংবা ইন্টারনেট থাকে না। রেডিও আজও তার জীবনের সঙ্গী।’ এই রেডিওর কার্যক্রম চালিয়ে রাখা গেলেই সবচেয়ে খুশি হতেন উল্লেখ করে রোকেয়া হায়দার বলেন, ‘সাধারণ মানুষ শোনে বলেই ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের কতশত ফ্যান ক্লাব গড়ে উঠেছে।’

নিজের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে রোকেয়া হায়দার বলেন, ‘এক জীবনের প্রায় পুরোটাই তো কাটিয়ে দিলাম এই রেডিওর সঙ্গে। কতশত স্মৃতি; বলে শেষ করা যাবে না। ম্যানেজিং এডিটর কিংবা বাংলা বিভাগের প্রধানের পদের চেয়েও আমি আনন্দ পেতাম নিজেকে একজন রিপোর্টার পরিচয় দিতে।’

স্মরণীয় স্মৃতির কথা তুলে ধরতে গিয়ে রোকেয়া হায়দার বলেন, ‘মাদার তেরেসার ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। এ ছাড়া আরো দুজন নোবেল বিজয়ীসহ অসংখ্য রাষ্ট্রনায়কের সাক্ষাৎকার নেওয়ার দিনগুলো মনে পড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘খেলার খবর কাভার করাটা ছিল আমার বেশ প্রিয়। ১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের কথা মনে আছে, যেখানে বাংলাদেশের পতাকাও উড়েছিল।’

২০১৯ সালের জুলাই মাসে রোহিঙ্গা ভাষায় রোহিঙ্গা লাইফলাইন নামের একটি অনুষ্ঠান চালুর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘অসংখ্যা মানুষ সেটা শুনত। এমনিভাবে আরো কত কিছু করার ছিল। আসলে ভয়েস অব আমেরিকা আমার কাছে একটি অনুভূতির নাম। আমার কাছে যার কোনো শেষ নেই।’

এই রেডিও স্টেশনের বাংলা বিভাগের বরেণ্য সাংবাদিকের কয়েকজন এরই মধ্যে চলে গেছেন অনন্তলোকে। এর মধ্যে গত ২ জুলাই ৯৩ বছর বয়সে মারা গেছেন ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের একসময়ের সংবাদ পাঠক এবং অভিনেতা ও বাচিক শিল্পী কাফি খান। তিনি ১৯৬৬ সালে রেডিওটিতে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩-৮২ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন। এরপর ১৯৮৩ সালে আবার রেডিওটিতে যোগ দেন এবং ১৯৯৪ সালে অবসরে যান।

ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান ইকবাল আহমেদ গত ২৭ জুন ৮২ বছর বয়সে মেরিল্যান্ডে মারা গেছেন। তিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বড় ভাই ইশতিয়াক আহমেদ রেডিওটির বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা। তখন তাঁর বয়স ছিল ২০ বছর। তখন থেকেই তিনি বাংলা অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।  

রেডিওটির বাংলা বিভাগের ভাষ্যকার ও লেখক সৈয়দ জিয়াউর রহমান গত বছরের ৩১ জানুয়ারি মেরিল্যান্ডে মারা যান ৮৮ বছর বয়সে। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলা বিভাগে যোগ দেন এবং ২০১১ সালে অবসরে যান।  

রেডিওটির বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইকবাল বাহার চৌধুরী। তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে ৩৮ বছর কাজ করার পর ২০১০ সালের জুনে অবসরে যান। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমানসহ বহু নেতা-নেত্রী, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সমাজসেবীসহ বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে রেডিওটিতে প্রচার করেছেন।



সাতদিনের সেরা