kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

‘হামাক ত্রাণ দিছু, তোরা যুগ যুগ বাঁচে থাক’

দিনাজপুরে ত্রাণ পেল ৯০০ জন

এমদাদুল হক মিলন, রাসেল ইসলাম ও নাজমুল হুদা, দিনাজপুর   

১০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘হামাক ত্রাণ দিছু, তোরা যুগ যুগ বাঁচে থাক’

দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা চত্বরে গতকাল কালের কণ্ঠ শুভসংঘের উদ্যোগে দুস্থদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল। ছবি : কালের কণ্ঠ

একরামুল ইসলাম। ভ্যানের চাকার সঙ্গে ঘোরে তাঁর সংসারের চাকা। লকডাউনে ভ্যানের চাকায় লাগাম পড়ায় বেড়েছে সংসারের টানাপড়েন। ছেলে-মেয়ে নিয়ে ডাল, আলুভর্তা দিয়ে দু’মুঠো ভাত খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন। পেটের দায়ে লকডাউনের মধ্যেও ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হন। তবে করোনায় আগের মতো আয়-রোজগার নেই। আগে যেখানে এক বেলায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা রোজগার করতেন, সেখানে এখন ১৫০ টাকাও রোজগার হয় না। তাঁকে বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ। ত্রাণ নিতে এসে তিনি জানালেন তাঁর হৃদয়বিদারক কষ্টের কথা। বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ পেয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে একরামুল বলেন, ‘মুই যেই ত্রাণ পাইছু এটা দিয়া মোর সাত-আট দিন চলি যাবি। মোক ত্রাণ দিবার তানে বসুন্ধরা গ্রুপকে অনেক অনেক ধইন্যবাদ। তোমার তানে মেলা মেলা দোয়া।’

ত্রাণ সহায়তা নিতে এসে বিধবা মুক্তমালা বলেন, ‘হামার হাত চলে না, ঠ্যাং চলে না। কোনো কাজ করিবা পারি না বা। কী করে খামু, ছেলে আছে বা, দেখে না হামাকে। আশেপাশে দিয়া বেড়াও যা পাও তাই খাই বা। হামাক ত্রাণ দিছু, তোরা যুগ যুগ বাঁচে থাক বা। দুধেভাতে বাঁচে থাক বা।’

একরামুল-মুক্তমালার মতো গতকাল শুক্রবার বিকেল ৩টায় বীরগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে, বিকেল ৫টায় কাহারোল উপজেলা পরিষদ চত্বরে এবং সকালে খানসামা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ সহায়তা ৯০০ হতদরিদ্র ও করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে পৌঁছে দিয়েছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ।

খানসামা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ সহায়তা নিতে এসেছিলেন রহিমা বেগম। বয়স ৭৫ পেরিয়েছে। এই বয়সে ছেলে সাইফুল তাঁর দেখাশোনা করেন। দোকানে কাজ করতেন সাইফুল। লকডাউনে তিনি কাজ হারিয়েছেন। ফলে করোনার এই কঠিন সময়ে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে করুণ সময় পার করছিলেন তিনি। বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ সহায়তা পেয়ে রহিমা বেগম বলেন, ‘হামার অসুখ হইছে, ওষুধ খাইতে পারি না বা। আপনারা যদি দেন তাইলে কয় দিন খাইতে পারি বা। এ রকম মায়ের কাছে আপনারা সাহায্য নিয়া আইসেন বা। যুগ যুগ বাঁচে থাকেন বা।’

রহিমার মতো একই অবস্থা জরুরা বেগমের। করোনা পরিস্থিতি জীবনটা আরো কঠিন করে দিয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ পেয়ে তিনি বলেন, ‘করোনায় বেটাটার কাজ নাই। খুব কষ্টে আছি বা। বসুন্ধরার সাহায্য পাইয়া খুব উপকার হইল। আল্লা বাঁচায় রাখুক।’

মাটির হাঁড়ি-পাতিল বানিয়ে সংসার চালান গোপাল চন্দ্র পাল। বর্ষা মৌসুমে কাজ বন্ধ থাকে। এই সময়টায় অভাব-অনটনে দিন কাটাতে হয় তাঁকে। বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ পেয়ে তিনি বলেন, ‘হামরা পাঁচটা লোক, দিনে দুই কেজি চাল লাগে। তোমার ত্রাণত পাঁচ দিন চলে যাবে। বসুন্ধরাক মালিককে আশীর্বাদ করি। তোমরা দুধেভাতে থাকো।’

ত্রাণ সহায়তা নিতে এসে বৃদ্ধা নীরবালা বলেন, ‘মুড়ি বায় বুড়া মানষি, মোর ছোয়াপোয়া কাহই মোক দেখে না। এইলা চাল, আটা, ডাইল দিয়া মোর ১০ দিন চলিবে। এইলা দিবার তানে বসুন্ধরা গ্রুপক মেল্লা মেল্লা ধইন্যাবাদ। সুবহান বাবা আরো মেল্লা দিন বাঁচুক।’

বীরগঞ্জ উপজেলায় ত্রাণ বিতরণের সময় দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে শুভসংঘের সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিনাজপুরে চার হাজার মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে। তাদের এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে মহৎ। দেশে বসুন্ধরা গ্রুপের মতো অনেক বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকলেও কেউ করোনার এই সময়ে এগিয়ে আসছে না। আমি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানকে অনেক ধন্যবাদ জানাই এই মহতী উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।’

খানসামা উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হাতেম। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করব, আপনারা সবাই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের জন্য দোয়া করবেন। তিনি যেন ভালো থাকেন, মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন। করোনার এই সময়ে আপনারা সবাই মাস্ক পরবেন। সচেতন থাকবেন।’

ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুল কাদের, পৌর মেয়র মোশাররফ হোসেন বাবুল, বীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন প্রধান, কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, বীরগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক আল মামুন, বীরগঞ্জ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক, শুভসংঘ দিনাজপুর জেলা শাখার সহসভাপতি জাকেনুর বাবু, সাধারণ সম্পাদক রশিদুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত রাফি, বীরগঞ্জ উপজেলার শুভসংঘের উপদেষ্টা সোহেল আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফরহাদ হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় জিতু, তানভীর, রাকেশ, সাব্বির, আকাশ, জাহিদ, কামরুল, মোজাম্মেল, মাসুদ, রায়হান, সজন, রাব্বানা, ধনদেব, আরিফ, অটল রায়সহ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বীরগঞ্জ দিনাজপুরের সাধারণ সম্পাদক মো. মোর্শেদ হাসান আসিফ প্রমুখ।

খানসামা উপজেলায় দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রশিদুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত রাফি, খানসামা উপজেলার কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সভাপতি মো. আফ্রিদি হাসান, সহসভাপতি লাবু ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুর রহমান, সহসাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাকিব, প্রচার সম্পাদক নাইম ইসলাম ও মনিরুল ইসলাম, তথ্যবিষয়ক সম্পাদক নেসারুল ইসলাম, নারীবিষয়ক সম্পাদক আইরিন আক্তারসহ সদস্য তারেক আজিজ, রিপন সেন, নয়ন দেবনাথ, মাসুদ রানা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

কাহারোল উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত থেকে দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল বলেন, ‘করোনার মধ্যেও কালের কণ্ঠ’র শুভসংঘ মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করছে। দেশের হতদরিদ্র মানুষকে খুঁজে খুঁজে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। বসুন্ধরা গ্রুপ পুরো বাংলাদেশেই ত্রাণ বিতরণ করছে। তাই আমি বসুন্ধরা গ্রুপকেও ধন্যবাদ জানাই এবং বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের জন্য আপনাদের কাছে দোয়া চাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপ আজ দেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শুভসংঘ তাদের এই মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে—এটা আমরা প্রত্যাশা করি।’

কাহারোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরুল হাসান বলেন, ‘সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও বিভিন্ন সংগঠন থেকে করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় আজকে শুভসংঘ আপনাদের ত্রাণ দিল। তাই আমরা বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই। আপনারা লকডাউনের এই সময়ে কেউ ঘর থেকে বের হবেন না। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।’

কাহারোলে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন কাহারোল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মালেক সরকার, কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, শুভসংঘের দিনাজপুর জেলা শাখার সহসভাপতি জাকেনুর বাবু, সাধারণ সম্পাদক রশিদুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত রাফিসহ শুভসংঘের নির্মল, শুভ, তানভির, রনি, প্রান্ত, পারভেজ, রাব্বি, এলিনা, নাহিদ, ইতি, মসাদ্দেক, সুমাইয়া, আলামিন, রকুনুজ্জামান, রঞ্জন প্রমুখ।



সাতদিনের সেরা