kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

‘এইলা ইলিপ হামার পেটের লকডাউন কাটাইবে বাহে’

নীলফামারী ও পঞ্চগড়ে শুভসংঘের ত্রাণ বিতরণ

ভুবন রায় নিখিল ও নাজমুল হুদা, নীলফামারী এবং লুৎফর রহমান ও নাজমুল হুদা, পঞ্চগড়   

৭ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘এইলা ইলিপ হামার পেটের লকডাউন কাটাইবে বাহে’

পঞ্চগড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেডিয়ামে দুস্থদের হাতে গতকাল কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা খাদ্য সহায়তা তুলে দেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

পদ্ম রায় ছিলেন হোটেল শ্রমিক। স্ত্রী আর দুই ছেলের সংসারের ঘানি টানতে শহরের বিভিন্ন হোটেলে হাড়ভাঙা শ্রম দিতেন। সে শ্রমের শুরুটা হতো কাকডাকা ভোরে আর শেষ হতো মধ্যরাতে। এতেও হাল ছাড়েননি তিনি। স্বপ্ন ছিল ছেলেরা বড় হলে অন্তত বৃদ্ধ বয়সটা শান্তিতে কাটাবেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় কর্মক্ষমতা হারালে অন্ধকার নামতে শুরু করে তাঁর জীবনে। এখন সন্তানরা বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সুখ ফেরেনি তাঁর জীবনে। কোনো সন্তান, এমনকি স্ত্রী সুমিত্রা রানী রায়ও খবর রাখেন না তাঁর। ৮০ বছরের এই বৃদ্ধকে ক্ষুধা নিবারণ করতে হয় মানুষের দান-দক্ষিণায়। করোনার এই দুঃসময়ে সে পথও ক্ষীণ হওয়ায় বড়ই অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। সেই অসহায় বৃদ্ধের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে নীলফামারী জেলা শহরের মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পদ্ম রায়ের মতো দেড় শতাধিক অসহায় মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। একই দিন পঞ্চগড়ে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়া হয় ৫০০ দরিদ্র-অসহায় মানুষের হাতে। দেশের শীর্ষ শিল্প গ্রুপ বসুন্ধরার সহযোগিতায় এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন শুভসংঘের সদস্যরা।

ত্রাণ পেয়ে আনন্দে ছলছল চোখে নীলফামারী শহরের বাড়াইপাড়া গ্রামের পদ্ম রায় বলেন, ‘মুই কাম-কাজ করিবার পারো না। সেইটার জন্য বেটা-বউ মোর পাছ ছাড়িছে। মুই কোনঠে থাকো, কোনঠে খাও সেইটাও খবর নেয় না। পেটততো খিদা লাগে, নিরুপায় হয়া মানষিরঠে হাত পাতিয়া যা পাও তাই খায়া দিন কাটাও। আজি তোমারা মোক ঢেইলা ত্রাণ (চাল, ডাল, আটা, তেল) দিলেন। মোর একটা মানষির মেল্ল্যা দিন চলিবে। মুই তোমরলার সববার জন্য আশীর্বাদ করেছে বাহে।’

ত্রাণ সহায়তা নিতে আসা মুন্সিপাড়া গ্রামের হাসান মোহাম্মদ ইব্রাহিম নামের ৮৯ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বলেন, ‘মোর ঠ্যাং ভাঙা বাবা। এইজন্য মুই অকেজো, কোনো কাম (কাজ) করির পারো না। লাঠিৎ ঢোকা দিয়া একেনা চলাফেরা করি এর-ওর কাছে খুঁজি খাও। তোমারলার সাহয্য পায়া মুই খুব খুশি। এইলা দিয়া ঢেইরল্ল্যা দিন খাওয়া চলিবে। তোমারা ভালো করিলেন, মুইও দোয়া করেছ তোমারল্লার জন্য।’

ঢুলিয়া গ্রাম থেকে আসা প্রফুল্ল রায় নামের ৮২ বছরের আরেক বৃদ্ধ বলেন, ‘দেড় বছর ধরি শ্বাসকষ্ট মোর। ছোট বেটা যা দেয় তাই খাই। করোনায় বেটারও কামাই নাই। খিব কষ্টে দিন যাছে হামার। বসুন্ধরার খাবার দিয়া হামেরা কিছুদিন চলিবার পারিমো।’

এদিকে মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলে জিকরুলকে (২০) নিয়ে বিপাকে পড়েছেন গতর খেটে খাওয়া ৭৫ বছর বয়সী আব্দুল লতিফ। বৃদ্ধ বয়সে শ্রম দিতে না পারায় বড়শি দিয়ে মাছ শিকার আর তা বিক্রি করে যেদিন যেমন আয়, তা দিয়েই কাটে তাঁর দিন। পাশাপাশি তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রীও গৃহকমীর কাজ করে সংসারে জোগান দেন কিছুটা। কিন্তু করোনার ক্লান্তিতে হারিয়ে ফেলেছেন গৃহকর্মির কাজ। সেই সঙ্গে তাঁদের পরিবারেও নেমে আসে অন্ধকার। শুভসংঘের ত্রাণ পেয়ে খানিকটা বেঁচে থাকার আলো দেখেছেন তিনি।

একই এলাকার ভেনকেটি রায়ের (৮০) সংসার চলে হোটেল আর কুলি শ্রমিক দুই ছেলের আয়ে। সেই আয়ে কোনোমতে খেয়ে-পরে জীবন চলছিল তাঁদের। কিন্তু করোনার ভয়াবহতা আর লকডাউনে ক্ষীণ হয়েছে সে পথ। তিনি বলেন, ‘লকডাউন শুরু হওয়ার পর থাকি হামার পেটতও লকডাউন শুরু হইল। হামেরা বড় মানষিলা খিদা সহ্য করেছি; কিন্তু ছাওয়ালাতো আর সহ্য করির পারেছে না। ভগবান তোমারল্লার ভালো করুক। এইলা ইলিপ হামার পেটের লকডাউন কাটাইবে বাহে।’

সেখানে ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির জেলা সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান সবুজ, জেলা শুভসংঘের সভাপতি অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক সালমা আক্তার, কুদ্দুস সরকার, সাইদুল আলম, মাইদুল ইসলাম, দীপু রায়, গিরেন রায়, সাদ্দাম আলী প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, গত ৩ জুলাই থেকে নীলফামারী জেলায় বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগিতায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ, যা গতকাল শেষ হয়েছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত জেলার ছয় উপজেলায় তিন হাজার অসহায় ও করোনায় কর্মহীন মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জেলা সদরে ৬০০ জন, ডোমারে ৬০০ জন, জলঢাকায় ৬০০ জন, সৈয়দপুরে ৬০০ জন, ডিমলায় ৩০০ জন এবং কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ৩০০ জনকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণের মধ্যে রয়েছে প্রতিটি পরিবারের অন্তত সাত দিন চলার মতো চাল, ডাল, আটা ও ভোজ্য তেল।

কয় দিন শান্তিত দুই বেলা খাবা পারিমো

ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে পঞ্চগড়েও। সেখানকার হালিমা আক্তার। বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। হাঁটেন লাঠিতে ভর দিয়ে। চোখে-মুখে ক্ষুধার ছাপ স্পষ্ট। দেখার কেউ নেই। থাকেন ডোকরোপাড়ায়। মানুষের কাছে চেয়ে চেয়ে প্রতিদিন দুমুঠো ভাত জোটে তাঁর। কঠোর লকডাউনে এই বৃদ্ধার জীবনে আরো সংকট নেমে আসে। খেয়ে না খেয়ে কাটছিল তাঁর দিন। শুভসংঘের ত্রাণ পেয়ে বৃদ্ধার মলিন মুখ তৃপ্তির হাসিতে ভরে ওঠে। নিজ থেকেই বলে ওঠেন, ‘১০ দিন খাবার পামো বা। বড় উপকার হইল। আল্লাহ তোমহার ভাল করুক।’

জেলা শহরের কামাতপাড়া এলাকার কোহিনুর আক্তার (১০)। দরিদ্র শিশুটি তার বাবা কবে মারা গেছেন বলতে পারে না। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তিন বোনের মধ্যে বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। মা মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে যে টাকা পান, তা দিয়েই চলে টানাপড়েনের সংসার। মেজো বোনও থাকে মানুষের বাড়িতে। করোনার দুঃসময়ে পরিবারটি চরম দুর্ভোগে পড়ে। শুভসংঘের ত্রাণ পেয়ে শিশুটির চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক। কোহিনুর বলে, ‘বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ দিতে চাই, আমার মতো এতিমের পাশে দাঁড়ানোয়।’

এদিকে বাল্যকালেই বিয়ে হয়েছে রোকেয়া আক্তারের। রয়েছে দুই মেয়ে। স্বামী থাকলেও ধরেননি সংসারের হাল। তাই বাধ্য হয়ে হাল ধরেছেন ২০ বছর বয়সী রোকেয়া। মানুষের বাসায় বাসায় কাজ করে প্রতিদিন যে টাকা পান, তা দিয়েই চলে মানবেতর জীবন। শুভসংঘের সদস্যদের হাত থেকে ত্রাণ পেয়ে অশ্রু ঝরে রোকেয়ার। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলেন, ‘নোকের বাড়িত কামলা খাটি। সারা দিন বাড়ির কাজ করি ৫০ টাকা করে পাও। সাত দিন ধরে কাজ নাইও। টাকাও নাই। তাই বাজার করিবার পারুনি। ধার করে খাছিনো। তোমরা চাল, ডাল, আটা, তেল দিলেন, কয় দিন শান্তিত দুই বেলা খাবা পারিমো।’

শুধু হালিমা, কোহিনুর ও রোকেয়া নন, পঞ্চগড়ে ৫০০ দুঃখী অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের হাতে ত্রাণ সহায়তা তুলে দিয়েছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ। গতকাল বিকেলে পঞ্চগড় বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেডিয়ামে বসুন্ধরা গ্রুপের এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

ত্রাণ সহায়তা পেয়ে রমিজ উদ্দিন নামের এক অটোভ্যানচালক বলেন, ‘লকডাউনে হামার পেটডাউন হইয়া গেইছে। ভ্যান ধরে বাইর হইলে পুলিশ পিটাছে। হামরা দিন আনি দিন খাই। কয়েক দিন ধরে ভ্যান ধরি বাইর হবা পারু না। কঠিন সমস্যাত পড়ি গেইছি হামরা। ত্রাণ পানু এলা কয় দিন খোওয়া যাবে।’

ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন পঞ্চগড় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদাত সম্রাট, মকবুলার রহমান সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. দেলওয়ার হোসেন প্রধান, পঞ্চগড় সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ হোসেন, পঞ্চগড় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সফিকুল আলম, পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হাসনুর রশিদ বাবু, শিক্ষক নেতা মনিরুল হক মনির, শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কালের কণ্ঠ’র সহসম্পাদক আতাউর রহমান কাবুল, পঞ্চগড়ের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম শহীদ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের জেলা প্রতিনিধি সরকার হায়দার, বাংলানিউজের জেলা প্রতিনিধি সোহাগ হায়দার, শুভসংঘ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, শুভসংঘ পঞ্চগড় জেলার সভাপতি ফিরোজ আলম রাজিবসহ শুভসংঘের সদস্যরা।

মকবুলার রহমান সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. দেলওয়ার হোসেন প্রধান বলেন, ‘ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়েই শুভসংঘের সদস্যরা দরিদ্র ও অসহায় মানুষের দোড়গোড়ায় ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। এর চেয়ে ভালো কাজ আর কী হতে পারে?’

পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, ‘দেশের সর্ব-উত্তরের এই জনপদে ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই।’

সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত কাজটিই করছে বসুন্ধরা গ্রুপ। তাদের এই মহৎ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।’

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদাত সম্রাট বলেন, ‘সরকারের পাশাপাশি বসুন্ধরা গ্রুপ এই অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে। জেলার তিন হাজার পরিবারকে ১০ দিনের খাবার সরবরাহ করেছে। এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমাদের নেই।’

গতকাল ত্রাণ বিতরণের মধ্য দিয়ে পঞ্চগড়ে সমাপ্ত হলো বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম। গত ৩০ জুন থেকে পঞ্চগড়ের বোদা, দেবীগঞ্জ, আটোয়ারী, তেঁতুলিয়া ও পঞ্চগড় সদর উপজেলার তিন হাজার দরিদ্র, অসহায়, শ্রমজীবী, প্রতিবন্ধী, নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে ত্রাণ সহায়তা তুলে দিয়েছে শুভসংঘ।



সাতদিনের সেরা