kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ কার্তিক ১৪২৮। ২৬ অক্টোবর ২০২১। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

আলেয়ার ঘরে আলো

ডোমার ও ডিমলায় ৯০০ দুস্থের হাতে ত্রাণ

ভুবন রায় নিখিল ও নাজমুল হুদা, নীলফামারী    

৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আলেয়ার ঘরে আলো

নীলফামারীর ডিমলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের বন্দরখড়িবাড়ী গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩০০ দুস্থের হাতে গতকাল কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা খাদ্য সহায়তা তুলে দেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

লাঠির সঙ্গেই তাঁর সন্ধি, দীর্ঘ বন্ধুতা। ৮৫ বছরের থুত্থুড়ে আলেয়া লাঠিকে বন্ধু ভেবে একাই চলছেন বন্ধুর পথ। কোথাও কেউ নেই, শুধু দরিদ্রতা হাঁটছে তাঁর পিছু পিছু। লাঠির ভরে দিনভর গ্রামের পথে পথে ঘুরে ভিক্ষার থালায় যা পান, তা নিয়ে সাঁঝবেলায় ফেরেন ভঙ্গুর একচালা নীড়ে। সারা দিন উপোস শেষে এর পরই দানা পড়ে পেটে। ভাঙা চশমায়ও দুনিয়াটা তাঁর কাছে ঝাপসা। হাড়ের সঙ্গে লেপ্টে গেছে চামড়া। নানা রোগ-শোক বেঁধেছে বাসা। কদম ফেললেই দম ফুরায়। তাই তাঁর শরীর নামের ‘জীবনগাড়ি’ আর চলে না। নীলফামারীর ডোমার মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠের এক কোণে আবিষ্কার করা গেল আলেয়া খাতুনকে। নিমন্ত্রণ পেয়ে এসেছেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে।

ত্রাণ হাতে পেয়ে বস্তা খুলে খাদ্যসামগ্রী একে একে পরখ করছিলেন আলেয়া। হয়তো ভাবছিলেন, ১০ কেজি চালে কত বছর আগে রেখেছিলেন হাত। বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে এসেছে এই খাদ্য সহায়তা। খবরটি কানে যেতেই দুই হাত তুললেন আকাশপানে। আবেগী আলেয়া কাঁপাকণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের ঢেইরল্যা (অনেক) ত্রাণ পায়া হামার খুব উপকার হইল। মেল্ল্যা দিন হামাক কাহো এত্ত ত্রাণ দেয় নাই। করুনাত (করোনা) খুব কষ্টে আছ। এইলা দিয়া কিছুদিন পেট ভরে খাবার পারিম। অনেক দোয়া করিমো, ওমরা ভালো থাকুক (ত্রাণদাতা)।’

পাশেই রমিছা বেগম নামে আরেক বৃদ্ধা ছেলের বউয়ের সঙ্গে নিতে এসেছিলেন ত্রাণ। তিনি বললেন, ‘করোনার সময় বসুন্ধরা গ্রুপ হামাক ত্রাণ দিছে, হামরা এই কয়দিন ভালো করি খাবার পারিম।’

গতকাল শনিবার নীলফামারীর ডোমার ও ডিমলার ৯০০ অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা। এর মধ্যে ডোমারে ৬০০ এবং ডিমলায় দেওয়া হয়েছে ৩০০ দুস্থকে।

বিকেলে ডিমলায় ত্রাণ পাওয়া ৩০০ পরিবারের সবার ঠিকানা খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের বন্দরখড়িবাড়ী, বালাপাড়া ইউনিয়নের রূপাহারা, ডিমলা সদর ইউনিয়নের রামডাঙ্গা, খালিশা চাপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুরে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে। লকডাউনের এই সময় ত্রাণ পেয়ে খুশিতে মন ভরে ওঠে এসব অসহায় মানুষের।

ত্রাণসামগ্রী পেয়ে খুশিতে আপ্লুত ডিমলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের বন্দরখড়িবাড়ী গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের জেলেখা বেগম বলেন, ‘সাকাল থাকি একমুঠি মুড়ি আর চা খায়া আছ। খাবার জুটিবার ভাবিতে ভাবিতে বেলা পড়ি গেইল। খাবার তো জুটিবার পারো নাই। তোমরা চাউল, কালাই, আটা, তেল পায়া মোর ভাবনা দূর হইল। মোর সাত দিনের খাবার অভাব দূর হইল বাহে।’ তিনি বলেন, ‘মোর স্বামী নাই, ভিটামাটিও আছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দয়া করি ঘর-জমি দিয়া আশ্রয় দিছে।’

একইভাবে ত্রাণ পেয়ে খুশি আশ্রয়ণ প্রকল্পে আশ্রিত সুফিয়া বেগমের। স্বামী-সন্তানহীন ওই নারী বলেন, ‘আজি মোর খাবার জুটিবার কোন উপায় ছিল না। এইলা পায়া মোর কলিজা একেনা ভরি উঠিল।’

এসব আশ্রয়ণে আশ্রিত মজিরন বেগম ত্রাণ সহায়তা পেয়ে খুশিতে বলেন, ‘হামার কোন ভিটামাটি নাই। সরকারের আশ্রয়ত থাকেছি। বয়স হইছে, তাও মানুষের জমিত কাম-কাজ করি খাই। অভাবের দিনোত মেল্ল্যা খাবার পানু। বসুন্ধরা গ্রুপের জন্য মুই দোয়া করিম।’

এর আগে ডোমারের ৬০০ অসহায় ও দরিদ্র পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেয় কালের কণ্ঠ শুভসংঘ। সকালে ডোমার মহিলা ডিগ্রি কলেজের বারান্দায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৪০০ অসহায় পরিবারকে এবং দুপুরে বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের দোলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ২০০ দরিদ্র পরিবারকে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ সময় সবার মাঝে মাস্ক বিতরণ ও করোনা সুরক্ষায় সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়।

ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, শুভসংঘ জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন, ডোমার শাখার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক লায়লা আরজুমান বানু, ডোমার আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক খাইরুল আলম বাবুল, প্রধান শিক্ষক তানিয়া পারভীন, ভুবন রায় নিখিল, মো. আব্দুর রশিদ শাহ্, অধ্যক্ষ শাহিনুল ইসলাম বাবু, হারুন-অর রশিদ, আবু ফাত্তাহ কামাল পাখি প্রমুখ।

ডিমলায় ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিথন, বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম, মো. ফেরদৌস আলম, জুয়েল হোসেন, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।

ত্রাণ বিতরণের সময় কালের কণ্ঠ শুভসংঘের জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘করোনার এই দুঃসময়ে শুভসংঘ সুদূর ঢাকা থেকে নীলফামারীতে বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ সহায়তা নিয়ে এসেছে। আমাদের জেলার তিন হাজার পরিবারকে ওই ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা সবাই মিলে শুভসংঘের সব শুভকাজের সঙ্গে থাকব। মানুষের পাশে দাঁড়াব।’



সাতদিনের সেরা