kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

‘জীবনে এমন দুর্দিন আর আসেনি’

► লকডাউনে কর্মহীন ভাসমান শ্রমিক
► সরকারের কাছে খাদ্য সহায়তা দাবি
► ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাবার পাওয়ার কথা জানে না অনেকে

মোবারক আজাদ   

৩ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘জীবনে এমন দুর্দিন আর আসেনি’

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামাল মিয়া (৩০) বৈশাখ মাসে গ্রামে ধান কাটার কাজ শেষে প্রতিবছরই ঢাকায় এসে যোগ দেন ভাসমান শ্রমিকের কাতারে। কিন্তু দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কামালের সবই ওলটপালট হয়ে গেছে। তবু কোনো রকমে রাজধানীর ভাটারার ছোলমাইদ এলাকায় একটি মেসে থেকে কাজ করে পরিবারের কাছে প্রতি সপ্তাহে টাকা পাঠাতেন, কিন্তু এখন এই লকডাউনে কাজ নেই। পরিবারকেও আর টাকা পাঠাতে পারছেন না। নিজে কিভাবে চলবেন, তা নিয়েও কামালের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। 

করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সরকার আবার এক সপ্তাহের জন্য ২১ দফা কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে, যা শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার। লকডাউনে ভাসমান শ্রমিকদের অবস্থা জানতে গিয়ে গতকাল শুক্রবার কথা হয় কামালের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লকডাউনের পইলা দিন একজনরে অনুরোধ কইরা কোনো রকমে বারিধারা এলাকাত মাটি কাটার এক দিনের কাজ করছি। আইজ তো কাজ নাই। জমানো ট্যাহাও নাই যে কয়েক দিন বইয়া বইয়া খাইয়াম আর পরিবাররেও চালাইয়াম। বাড়িত যাওনের ট্যাহাও নাই, গাড়িও চলে না। এ অবস্থার মাইঝে সরকারি সাহায্য খুব দরকার। আগে লকডাউনে সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা আইত। এবার এগুলা নাই। তাই আমাদের খাওনের কষ্ট শুরু হইয়া গেছে।’

কুমিল্লার হোমনার ফজর আলী (৭৫) দেড় দশক ধরে রাজধানীতে থাকেন। আট সন্তানের জনক এই প্রবীণ ভাসমান শ্রমিক থাকেন নতুনবাজারের পাশে সাঈদনগর এলাকায়। লকডাউনের কারণে গত মঙ্গলবার থেকে আর কাজে যেতে পারছেন না। তিনি জানান, এলাকার ভোটার না হওয়ায় আগে কোনো সাহায্য পাননি। এবারও পাবেন কি না জানেন না। ফজর আলী বলছিলেন, ‘কাজে না যাইতে পাইরা অনেক কষ্ট হচ্ছে চলতে। খাবার কোনো রকমে চালাইতে পারলেও বাসাভাড়া তো আর মাফ নাই। ধার-করজের বোঝা বাড়তাছে। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ, লোক-দেখানো ত্রাণ না দিয়া লকডাউন যত দিন থাহে, তত দিন আমাদের মতো মাইনসেরে খাবার দেন।’

রাজধানী শহরে ২৬ বছর ধরে থাকেন আবুল হাশেম (৫০)। তিনি বলছিলেন, ‘বৃহস্পতিবার কাজের জন্য নতুনবাজারের রাস্তায় দাঁড়াইছিলাম।

পুলিশ খেদায় দিচ্ছে। বললাম, আমরা কাজ না করলে খামু কী। তারা বলে, ঘরে গিয়া আল্লাহ আল্লাহ করেন। এই সময়ের মাইজে আমরা যারা রোজ আনি রোজ খাই, তারা এক দিন রোজগার না করলে ঠিকমতন তিনবেলা ভাতও জোঠত না। সরকারি সাহায্য যেটুকু দেয়, কয়েক হাত ঘুইরা সামান্য পাই, তা দিয়া দুই দিন চলে ছয়জনের সংসারে। পরে কিভাবে চলি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের খাবার নিশ্চিত করে লকডাউন দিলে সমস্যা নাই। বড়লোকরা ঘর ভইরা পালছে বাজার কইরা। আমরার ট্যাহা নাই, বাজারও নাই। দোকানদার বাহিও (বাকি) দিতে চায় না। এমন দুর্দিন জীবনে আহে নাই। মাঝে মাঝে মনে কয় মইরা যাই।’

হাশেম জানান, গত বছর দুইবার পাঁচ কেজি করে চাল আর দুই কেজি করে আলু পেয়েছেন। কিন্তু এবার কিছু পাননি। তবে তিনি আশায় আছেন যে যত দিন লকডাউন থাকবে, সরকার তত দিন যাদের ঘরে খাবার নেই, তাদের খাবার নিশ্চিত করবে। না হলে করোনার চেয়ে খাবারের অভাবে মানুষ বেশি ভুগবে।

কামাল, ফজর আলী ও হাশেমের মতো রাজধানীর নতুনবাজার বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ফুটপাত, মিরপুর পল্লবী, যাত্রাবাড়ী, উত্তরাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কাজের সন্ধানে জমায়েত হতো হাজার হাজার শ্রমিক। তারা  মাটি কাটা, ইট-বালু টানা, রাজমিস্ত্রির জোগালী ও বাসাবাড়ি পরিষ্কার, বাসা বদলের কাজসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করত। লকডাউনে তাদের কাজ বন্ধ। আয় না থাকায় অনেকেই এরই মধ্যে দুর্দশার মধ্যে পড়ে গেছে। তারা বলছে, জীবনে অনেক কঠিন সময় পার করলেও এমন করুণ অবস্থার মধ্য দিয়ে কখনো যেতে হয়নি। ইচ্ছা করলেও অনেকে গ্রামের বাড়িতে পরিবারের কাছে যেতে পারছে না টাকার অভাবে। কারো কারো ধারদেনা শুরু হয়ে গেছে। এমনকি খাবারের কষ্টেও পড়েছে। সরকারিভাবে এখনো তেমন কোনো সাহায্য পাচ্ছে না। আর ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে যে সরকারি খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায় সে সম্পর্কেও তারা জানে না।

পুরুষদের পাশাপাশি ভাসমান শ্রমিকের কাজ করে নারীরাও। তারা রান্নাবান্না, ইট-বালু, সিমেন্ট ওঠানো-নামানো, টাইলস পরিষ্কার, ভবন ঢালাই, রাজমিস্ত্রির সহযোগী, বাসা ধোয়ামোছা, মাটি কাটা, ইট পরিষ্কার ও ভাঙা, টাইলস পুডিংয়ের কাজ করে। লকডাউনের কারণে তাদেরও কাজ নেই।

নতুনবাজারের ভাসমান শ্রমিকের হাটে আসা ছোলমাইদের রোকেয়া (৪০) বলেন, ‘আমি আগে ছাত্রদের মেসে রান্নার কাজ করতাম। করোনার জন্য হেরা বাসা ছাইড়া দিছে। পরে অনেক চেষ্টা কইরাও আর কাজ না পাইয়া নতুনবাজারে শ্রমিকের কাজের জন্য গিয়া দাঁড়াইতাম। স্বামী বয়স্ক। রিকশা চালাইত আগে, এখন কিছু করে না। ছেলে-মেয়েসহ পাঁচজনের সংসার আমিই টানতেছি। আত্মীয়-স্বজনের কারো সহযোগিতা পাচ্ছি না। এই অবস্থায় কিভাবে চলব চোখে-মুখে অন্ধকার দেখতাছি।’



সাতদিনের সেরা