kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

‘সমঝোতা’ করেও নিস্তার নেই নারীর

ফাতিমা তুজ জোহরা   

৩ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘সমঝোতা’ করেও নিস্তার নেই নারীর

গত জানুয়ারিতে ১০৯ নম্বরে ফোন করে ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা জানান মাদারীপুরের এক তরুণী (২০)। তাঁর এই অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করা হয়। তবে ভুক্তভোগী ওই তরুণীসহ তাঁর পরিবারকে সালিসের মাধ্যমে সমঝোতার জন্য চাপ দেওয়া হয়। মামলা দায়েরের পর আদালতের বাইরে মিটমাটের সুযোগ না থাকলেও সামাজিক চাপের মুখে রাজি হতে বাধ্য হন তাঁরা। এতে ‘পার’ পেয়ে যান অভিযুক্ত ব্যক্তি। পরে আবারও যৌন নিপীড়নের চেষ্টা চালান তিনি। ফলে আবারও হেল্প নম্বরে ফোন করে সহযোগিতা চান ভুক্তভোগী ওই তরুণী।

পঞ্চগড়ে ধর্ষণের শিকার এক নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তাঁর পরিবার তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। অসহায় এই নারী ১০৯ নম্বরে ফোন করে সতায়তা চান। ভুক্তভোগীকে প্রথমে ওসিসিতে (ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) নেওয়া হয়, পরে আইনি সহয়তার জন্য লিগ্যাল এইডে পাঠানো হয়। রাজশাহীতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের শেল্টার হোমে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। বাচ্চা জন্ম নেওয়ার পর ডিএনএ স্যাম্পল নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে আদালতে অপরাধী ক্ষমা চেয়ে ভুক্তভোগীকে বিয়ে করতে চান। সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখানেও ভুক্তভোগী সমঝোতার পথে পা বাড়ান। তবে বছর না ঘুরতেই ভুক্তভোগী আবারও ফোন দিয়ে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

এভাবেই ধর্ষণের শিকার হয়ে আইনের দ্বারস্থ হয়েও সামাজিক চাপে সমঝোতা করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক ভুক্তভোগী নারী। এভাবে আইনের আওতায় গিয়েও সমঝোতার পথ বেছে নেওয়ায় যৌন নিপীড়নের প্রতিকার যেমন হচ্ছে না, ভুক্তভোগীও ‘বিচার’ পাচ্ছেন না। উল্টো অভিযুক্ত রেহাই পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা সামাজিকসহ পারিপার্শ্বিক চাপে সমঝোতার দিকে এগোন। এতে অপরাধী শাস্তিও পান না। ফলে অপরাধী আশকারা পেয়ে যান, দ্বিতীয়বারও একই অপরাধ করার সাহস দেখান। অন্যদিকে আইনি সহায়তা পেলেও ভুক্তভোগী অনেকে সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে আড়ালে থাকতে চান। এসব কারণে গণমাধ্যমেও প্রকাশ পায় না নারী নিপীড়নের বহু ঘটনা।

কুড়িগ্রাম থেকে গত মাসে ১৬ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রী ১০৯ নম্বরে ফোন করে বলে, ‘আমাকে রেপ করা হয়েছে। বিষয়টি বাড়িতে মা-বাবা কেউ জানে না। কাউকে বলতেও পারব না।’ কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। সামাজিকভাবে হেয় হওয়াসহ সারা জীবন কলঙ্ক বয়ে বেড়ানোর ভয় ও নিরাপত্তাহীনতায় কাউকে বলতে পারছে সে। তবে ব্ল্যাকমেইলের আশঙ্কায় হেল্পলাইনে ফোন করে বিষয়টি জানিয়ে রাখে জীবনের শুরুতেই নরকযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই কিশোরী।

হেল্পলাইনে ফোন দিয়ে নিপীড়ন থেকে সাময়িক রক্ষা পেলেও সমঝোতার ফলে নিপীড়ন থামছে না, বরং বাড়িয়ে দিচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিছু অর্থের বিনিময়ে মিটমাট করা হয় কিংবা অভিযুক্তের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। ফলে অপরাধী পার পেয়ে যান। ভিকটিম ব্লেইমিং (ভুক্তভোগীকেই উল্টো অপবাদ দেওয়া), সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, বিচারহীনতা, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা, নিরাপত্তাহীনতা, দীর্ঘদিন মামলা ঝুলে থাকার মতো জটিলতায় ভুক্তভোগী বা তাঁর পরিবার সমঝোতার পথে যেতে বাধ্য হয় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাঁদের ভাষ্য, ঠিক এসব কারণেই অনেক ভুক্তভোগী মুখ খুলতে ভয় পান। ফলে সমঝোতা বা গোপন করায় সাময়িক একটা ‘সমাধান’ হলেও পরে শারীরিক নিপীড়ন কিংবা হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে বলে জানান বিশ্লেষকরা।

গত বছর ২১ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৩০ হাজার ২৭২টি মামলা দায়ের হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা বলছে, দেশে যে পরিমাণে ধর্ষণ হচ্ছে তার ৪ শতাংশের কম মামলার বিচার হচ্ছে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫৩৬টি ধর্ষণ মামলার তদারকি করেছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। এর মধ্যে বিচার হয়েছিল মাত্র চারটির। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার ২২ হাজার ৩৮৬ জনের মধ্যে ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে। রায় ঘোষণার হার ছিল ৩.৬৬ শতাংশ। ব্লাস্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিফাত-ই-নূর বলেন, র্দীঘদিন মামলা ঝুলে থাকা, সাক্ষীর নিরাপত্তা ইত্যাদি কারণে ভিকটিম মামলা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন না।

করোনাকালে নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন আট হাজার ১২১ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৫৪ নারী শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এই পাঁচ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৮৭ জন, যৌন সহিংসতার শিকার ৫১৭ জন, মানসিক নিপীড়নের শিকার এক হাজার ১০৩ জন এবং যৌতুকের জন্য নির্যাতন সয়েছেন ৭১৩ জন নারী।

নারী নির্যাতন রোধে জাতীয় পরিষেবা সূত্রে আরো জানা যায়, মে মাসেই ছয় হাজার ২৪০টি ফোন এসেছে হেল্পলাইনে। এই মাসে গড়ে প্রতিদিন দুটি ধর্ষণ ও ৪৫টি শারীরিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। যৌন হয়রানির শিকার  হয়েছেন ৬০ জন এবং শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার দেড় হাজার জন।

২০২০ সালে নিপীড়নের শিকার হন ১৭ হাজার ৮৭৬ জন নারী। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ১৭৬।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম শামীম আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব অভিযোগ আমলে নিয়ে ১০৯ সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিচ্ছে ভুক্তভোগীকে। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। সাক্ষী ও অভিযুক্ত অনুপস্থিত থাকে। আবার অনেকে সমঝোতার দিকে চলে যায়।’

এ জন্য সমাজব্যবস্থাকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘গ্রামের সালিসি ব্যবস্থা আবহমানকাল থেকে এভাবে চলে আসছে। কিছু অর্থের বিনিময়ে মিটমাট করে ফেলতে চায়। এতে দোষী শাস্তি পায় না।’ এটাকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।

মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, ‘আমাদের আইন আছে; কিন্তু ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা, দ্রুত বিচারকার্যের ব্যবস্থা নেই। আইনের ধীরগতির জন্য সালিসে দ্রুত সমাধানের আশায় ভুক্তভোগী রাজি হন। সালিসের উদ্দেশ্যই থাকে সমঝোতা করানো। সালিস প্রথা বন্ধ করতে হলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিনাত হুদা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্যাতিতার জন্য আরো একবার নির্যাতন করা হলো সালিসি সমঝোতা। নারীর সমাজে যে অবস্থান নেই, সে যে দুর্বল-অসহায় সেটিকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। ছোট একটি মেয়ে ধর্ষণ হলেও তাকে বয়স্ক একজনের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পরিবার বা সমাজের একমাত্র উদ্দেশ্যই যেন নারীর বিয়ে দিয়ে দেওয়া। ধর্মের অপব্যাখ্যা, এমনকি আদর্শিক জায়গায় দিয়েও অপপ্রচার করা হচ্ছে।’ হতাশা প্রকাশ করে এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড নেই, নারী সংগঠনের নেত্রীরাও এখন টক শো নির্ভর। মোটকথা সামাজিক কোনো আন্দোলন নেই।



সাতদিনের সেরা