kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ঢলে ভেঙেছে বাঁধ নালিতাবাড়ীর দুই মহল্লায় কান্না

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

২ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঢলে ভেঙেছে বাঁধ নালিতাবাড়ীর দুই মহল্লায় কান্না

বাঁধটি ছিল তাদের সুরক্ষার দেয়াল। ভোগাই নদীর ভাঙন থেকে বাঁচতে বাঁধটি রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা চালায় এলাকাবাসী। শুরু হয় মানুষ আর প্রকৃতির যুদ্ধ। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। প্রবল বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে গত বুধবার ভেঙে যায় শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরের উত্তর গড়কান্দার ভোগাই নদীর তীর রক্ষা বাঁধ। মুহূর্তেই ভেসে যায় তিনটি ঘর। পানি প্রবেশ করে দুই শতাধিক ঘরে। নষ্ট হয় ঘরের আসবাব। পানির তোড়ে ভেসে যায় হাঁস-মুরগি। কেউ নিজ ঘরে চৌকির ওপরে, কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, কেউ বা বাগানবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় রাত কাটাতে বাধ্য হয়। একই অবস্থা পৌরসভার নিজপাড়া এলাকারও।

উত্তর গড়কান্দা ও নিজপাড়া মহল্লায় পাঁচ শতাধিক পরিবারের বাস। বর্ষা মৌসুম এলেই তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। প্রায় প্রতিবছরই ভোগাই নদীর বাঁধ ভাঙে, দুর্ভোগে পড়ে মানুষ। এই দুর্ভোগ লাঘবে পানি উন্নয়ন বোর্ড দুই বছর আগে বালুর বস্তা দিয়ে তিন শ মিটার দীর্ঘ একটি নদী তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে। সে সুবাদে দুইটি বছর তারা কিছুটা স্বস্তিতেই ছিল। কিন্তু এবার সে বাঁধ ভেঙে তারা আবারও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে জানা যায়, উত্তর গড়কান্দায় দুই শতাধিক ও নিজপাড়া মহল্লায় তিন শতাধিক পরিবার বসবাস করে। উত্তর গড়কান্দার বেশির ভাগ মানুষই দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। এই মহল্লার প্রায় তিন শ মিটার দীর্ঘ বাঁধের তিনটি জায়গায় ভেঙে গেছে। প্রতিবছর একটু একটু করে ভাঙতে ভাঙতে মহল্লাটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনেকে এখানকার বাড়ি-ভিটা হারিয়ে ভাসমান জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

সরকারি হিসাবে এবার পাহাড়ি ঢলে নালিতাবাড়ীতে নয়াবিল, পৌরসভাসহ প্রায় দুই কিলোমিটার বাঁধের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তালিকায় রয়েছে সাতটি ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম।

চাতাল শ্রমিক খোদেজা বেগম (৪৫) জানালেন, তাঁর ৩৫ শতক জমিতে বসতভিটা ছিল। এখন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে মাত্র এক শতক জায়গা অবশিষ্ট আছে। এখানে একটি মাটির ঘর তৈরি করে তিনি স্বামী-সন্তান নিয়ে আছেন। এবারের ভাঙনে সেটুকুও যায় যায় অবস্থা। শেষ সম্বলটুকুও নদী গ্রাস করলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন সেই দুশ্চিন্তা পেয়ে বসেছে।

আকিকুল, দুলাল, আজবাহারসহ কয়েকজন জানালেন, বুধবার এই বাঁধ ভাঙার পর উত্তর গড়কান্দার বাসিন্দাদের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। ঘরে ঘরে পানি ওঠায় রান্নাবান্না বন্ধ। দুই দিন ধরে শুকনা খাবার খেয়ে আছেন। তার ওপর সাত দিনের কঠোর লকডাউনে কাজ বন্ধ। ঘরবাড়ি কাদাপানিতে সয়লাব। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তাঁদের দাবি, বালুর বাঁধ নয়, সিসি ব্লক ফেলে শক্ত বাঁধ নির্মাণ করে তাঁদের রক্ষা করা হোক।

ঢলের পানিতে ভাটির জনপদ কলসপাড়, যোগানিয়া, বাঘবেড় ও মরিচপুরাণ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভোগাইপাড়ের বাসিন্দা স্থানীয় সাংবাদিক সামেদুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘অনেক বছর ধরে ভোগাইর এমন রুদ্র রূপ দেখিনি। পানি নামার গতিও এবার মন্থর।’

জেলা প্রশাসক মোমিনুর রশীদ, নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হেলেনা পারভীন, উপজেলা চেয়ারম্যান মোকসেদুর রহমান লেবু, পৌর মেয়র আবুবকর সিদ্দিক দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে শুকনা খাবার তুলে দেন। এ সময় জেলা প্রশাসক দুর্ভোগ লাঘবে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

এদিকে ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর থেকে পাহাড়ি ঢলের পানি নামতে থাকায় নিম্নাঞ্চলের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে শতাধিক পুকুরের মাছ, ডুবে গেছে আবাদি জমি। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। ঢলের তোড়ে বুধবার রাতে ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের রামনগরে একটি এবং ধানশাইল ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকায় আরেকটি সেতু ধসে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিরুজ্জামান লেবু। এতে ওই সব এলাকার মানুষ চলাচলে দুর্ভোগে পড়েছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ঢলের পানিতে বেশ কিছু এলাকার পুকুর তলিয়ে গেছে। প্রায় ২৫ হেক্টর জমির বীজতলা নিমজ্জিত হয়েছে। তবে পানি দ্রুত নেমে গেলে ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না।

ইউএনও ফারুক আল মাসুদ জানান, বৃষ্টি কমেছে, পাহাড়ি ঢলের পানিও নেমে গেছে। ক্ষতি নিরূপণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 



সাতদিনের সেরা