kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

বর্ষার শুরুতেই ডেঙ্গুর হুল

► ২৪ দিনে রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬১
► রাজধানীর চার এলাকায় এডিসের ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ

শম্পা বিশ্বাস   

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বর্ষার শুরুতেই ডেঙ্গুর হুল

করোনা মহামারির মধ্যে রাজধানীতে শুরু হয়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই বাড়তে শুরু করেছে এডিস মশা। রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, বনানী, মোহাম্মদপুর, শাহবাগ ও পরীবাগ এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব বেড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ—এমন তথ্য উঠে এসেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জুন মাসের ২৪ দিনেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৬১ জন, যেখানে বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গু রোগী ছিল মাত্র ১০১ জন। এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যদি এখনই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাহলে ২০২০ সালের চেয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হবে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে কিউলেক্স মশার ঘনত্ব বেড়ে প্রায় চার গুণ হয়েছিল। তখন থেকেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে আসছে। মশক নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনামাফিক কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান দুই সিটির কর্তাব্যক্তিরা। তবে বর্ষা মৌসুমের শুরু না হতেই দুই সিটির সব পরিকল্পনা তোয়াক্কা না করে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। আর এতে এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর যত্রতত্র পড়ে থাকা গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, বাসাবাড়ির ওয়াটার মিটার হোল (ভবনে ওয়াসার পানি ধরে রাখার জন্য রিজার্ভ ট্যাংকের সঙ্গে লাগানো প্রায় এক ঘনফুট আকারের ছোট চৌবাচ্চা), নির্মাণাধীন ভবন, বাড়ির ছাদ এবং রাস্তাঘাটে পড়ে থাকা ভাঙা পাত্রসহ বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির কারণে জমে থাকছে পানি। আর এই জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতেই জন্মাচ্ছে এডিস মশা। ফলে নগরবাসী এখনই আক্রান্ত হচ্ছে ডেঙ্গুতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্ত হয়েছে ২৬২ জন, যার মধ্যে ১৬১ জনই আক্রান্ত হয়েছে জুনের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফল বলছে, রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস বেড়েছে, ব্রুটো ইনডেক্সে যার ঘনত্ব পাওয়া গেছে ২৫ থেকে ৫০ পর্যন্ত। তা ছাড়া সর্বোচ্চসংখ্যক মশার লার্ভা পাওয়া গেছে পরিত্যক্ত টায়ারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি স্থানেই জুলাই মাসের শুরুতে এডিস মশার ঘনত্ব বেড়েছে। আবার হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও অন্যান্য সপ্তাহের তুলনায় বেশি। ফলে জরুরি  ভিত্তিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নগরবাসী এবং সিটি করপোরেশনকে যৌথ উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বলছে, তারা মশক নিধনে নিয়মিত কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি নতুন আমদানি করা মশার ওষুধ ছিটানোর কাজও শুরু করে দিয়েছে। তবে বছরের শুরু থেকেই ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও কেন বর্ষা মৌসুম আসতে না আসতেই ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে—এমন প্রশ্নে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা ২০ থেকে ২২টি জায়গায় অভিযান চালিয়ে এডিসের লার্ভা পেয়েছি। তার মধ্যে ১৭ বা ১৮টি জায়গায় আমরা লার্ভা পেয়েছি বাসার ছাদবাগান থেকে। ফলে শুধু করপোরেশনের একার পক্ষে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, নগরবাসীকেও এগিয়ে আসতে হবে। তবে আমাদের মশক নিধন অভিযান অব্যাহত আছে। পাশাপাশি যেসব ভবনে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে সেই ভবন মালিককে জরিমানা করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘গত বছর মশার ওষুধ আনতে আনতেই জুলাই মাস পার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ বছর এরই মধ্যে আমরা সব ওষুধ হাতে পেয়ে গেছি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বলছে, এডিস নিয়ন্ত্রণে তারা সচেতনতামূলক রোড শো, মতবিনিময়সভা, জুনের ১ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত চিরুনি অভিযান এবং মশক নিধনের নিয়মিত কার্যক্রমসহ আরো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি সংস্থাটি আগামী ২৯ ও ৩০ জুন তাদের ৫৪টি ওয়ার্ডের ৫৬ জন সুপারভাইজারকে ট্রেনিং অব ট্রেনার্স (টিওটি) প্রশিক্ষণ দেবে। প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিউলেক্স মশা নিধনে নগরবাসী এবং সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব সমান। কিন্তু এডিস নিয়ন্ত্রণে ভবন মালিকদের দায় ৮০ শতাংশ। আমার ভবনের কোথাও পানি জমতে না দিলে তো এডিস জন্মাবে না।’ রাজধানীর ৯৫ শতাংশ পরিত্যক্ত টায়ারে মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব কী—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটাচ্ছি। তবে কোরবানির ঈদের পরে পশুর বর্জ্যের কারণে মশা আরো বাড়বে। তাই আমরা ১ থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার পাঁচ শতাধিক ইমামকে কোরবানির স্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গে এডিস নিয়ন্ত্রণেরও প্রশিক্ষণ দিব। আশা করছি এটাতে আমরা ভালো ফল পাব।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা এবং ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণগুলো একই। ফলে অনেকেই জ্বর হলে বাড়িতে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকছে। এ কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত প্রকৃত সংখ্যাটা চাপা পড়ে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডেঙ্গু বাড়ছে মানে আমাদের কাছে এটা পরিষ্কার যে এডিসের বংশ বিস্তার কমেনি। দুই সিটি করপোরেশনেই মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। তার পরও কেন মশা কমছে না, একটি কার্যকর কমিটি করে এর কারণ অনুসন্ধান করা উচিত। সেই সঙ্গে এডিস নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করতে হবে। কারণ শুধু সিটি করপোরেশন বা কেন্দ্রীয় সরকার এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। মানুষকেও সচেতন হতে হবে।’