kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩০ জুলাই ২০২১। ১৯ জিলহজ ১৪৪২

মুখে মুখে হাসির দোল

কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে আরো খাদ্য সহায়তা

আব্দুল খালেক ফারুক, কুড়িগ্রাম ও হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট   

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




মুখে মুখে হাসির দোল

দেলজন ও আবিরন বিধবা যুগল। শেষ কবে এত খাদ্যসামগ্রী নিয়ে বাসায় ফিরেছেন অনেক চেষ্টায়ও আনতে পারেননি স্মৃতিতে। গতকাল কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী বড়ভিটা ইউনিয়নে কালের কণ্ঠ শুভসংঘের ত্রাণ কার্যক্রম অনুষ্ঠানে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভাঙতে ভাঙতে একেবারে উঠানেই চলে এসেছে রাক্ষুসী ধরলা। এবারও হয়তো খুপরিটা সরিয়ে নিতে হবে পাশের চরে। এর আগেও দুইবার খুব কাছ থেকে ধরলার রক্তচক্ষু দেখেছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর বড়ভিটা ইউনিয়নের ধনিরাম গ্রামের বিধবা দেলজন (৭০)। তখন ধরলার উত্তাল জল দেখে নিজের দুই চোখও ভিজিয়েছেন জলে। নিজের ভিটা আর স্বামীর স্মৃতি পেছনে ফেলে হেঁটেছেন অজানা পথে। নোঙর করেন নয়া চরে, নতুন ঠিকানায়। স্বামী নেই, সন্তান নেই। সব কিছু হারিয়ে ফতুর দেলজনের এখন সম্বল ভিক্ষার থালা। গতকাল বৃহস্পতিবার ধরলাপারের বড়ভিটা ইউনিয়নের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে নিঃস্ব দেলজনও এসেছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের আমন্ত্রণে। এখানে এসেই কিছু সময়ের জন্য দেলজনের মুখে দোল খেয়েছে আনন্দের আলো। খাদ্যসামগ্রী হাতে পেয়ে তাঁর অনুভূতি প্রকাশের ভাষা শুনে যে কারোরই হবে হৃদয়ক্ষরণ। অভিব্যক্তিটি ছিল এমন—‘সকালে চাইরটা মুড়ি খাচি। চাউল নাই। দুপরা উপাস আছি। তোমরা যে ইলিপ দিলেন হামরা এলা চাইরটা ভাত খাবার পামো।’

একই চরের দিনমজুর আবিরনের (৬৫) করোনার এই দুঃসময়ে নেই কাজ। দিনে এক বেলা ভাত জোটানোই কঠিন। ত্রাণের প্যাকেট বুকে জড়িয়ে আবিরন বলে উঠলেন, ‘চাউল জোটপার পাই না। খুদি আন্ধি খাই। যে চাউল দিলেন, তার অনেক বাপা হইবে। উয়াকে কোনোমতে কম কম করি খামো। এই ইলিপ পায়া হামরা খুব খুশি হইছি।’

কালের কণ্ঠ শুভসংঘের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের দ্বিতীয় দিনে গতকাল কুড়িগ্রামের পাঁচ উপজেলা ও লালমনিরহাটের আদিতমারীর এক হাজার ৮০০ পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ হাতে পেয়ে দুস্থরা সবাই আনন্দে হেসেছে।

ফিরোজা বেগম (৬৫) গতকাল বিকেলে শুভসংঘের টোকেন হাতে এসেছিলেন লালমনিরহাটের আদিতমারীর সাপ্টিবাড়ী ডিগ্রি কলেজ মাঠে। সেখানে তাঁর মতো আরো অনেকে সামাজিক দূরত্ব মেনে বসেছিলেন লাইনে। সেখানেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি জানান, দুই মেয়েসহ তিনজনের সংসার। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। হাঁপানি রোগী বলে অনেকেই কাজে নিতে চান না। ফিরোজার অভিব্যক্তির ভাষাটা ছিল এ রকম—‘অ্যালা কাজ নাই, খাওয়ার খুব কষ্ট। ইলিপ নিবার আছছুং না খেয়া। তোমার চাইল-ডাইল দিয়া ম্যালা দিন চলবে।’

গতকাল আদিতমারীর সাপ্টিবাড়ী ডিগ্রি কলেজ মাঠে কর্মহীন ও দুস্থদের মাঝে বিতরণ করা হয় চাল, ডাল, আটা ও তেল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনসুর উদ্দিন, অধ্যক্ষ সুদান চন্দ্র রায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম, ফরহাদ আলম সুমন, আশিকুর রহমান ডিফেন্স, খোরশেদ আলম সাগর, নিয়াজ আহমেদ শিপন, মাজেদ মাসুদ, তন্ময় আহমেদ নয়ন, নাসিরুল আলম মন্ডল প্রমুখ।

এদিকে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন দীপক কুমার দেব শর্মা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ রাশেদুজ্জামান বাবু, ভূরুঙ্গামারী সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান, জয়মনিরহাট ইউপি চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন সানোয়ার, ভুরুঙ্গামারী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহেল বাকী তালুকদার, শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, উপজেলা শুভসংঘের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক প্রমুখ।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর বড়ভিটা ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণে উপস্থিত ছিলেন ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. নুর ইসলাম শেখ, শিক্ষক তৌহিদ উল ইসলাম, বড়ভিটা ইউপি চেয়ারম্যান খয়বর আলী, প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান, ফুলবাড়ী শুভসংঘের সাধারণ সম্পাদক নুর নবী মিয়া।

এর আগে সকালে নাগেশ্বরী উপজেলার দুধকুমারপারের কালীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে ৩০০ দুস্থ পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কালীগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আফজালুল হক খোকা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণ চন্দ্র সরকার, প্রধান শিক্ষক ইউনুছ আলী, ইউপি চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান, শুভসংঘের সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান হৃদয়।

কুড়িগ্রামের আঞ্চলিক প্রতিনিধি কুদ্দুস বিশ্বাস জানান, রৌমারী উপজেলা হলরুম ও রাজীবপুরের কোদালকাটি ইউনিয়নে ৬০০ পরিবারের মাঝে গতকাল খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। কোদালকাটি গুচ্ছগ্রামের আব্বাস মিয়া বলেন, ‘নদী ভাইঙ্গা আইসা আমগর সাহায্য দিলেন তোমরা। হুনছি কালের কণ্ঠ পেপার এই সাহায্য দিছে আমগর মতো অনেক গরিব দুস্থগরে। তাগরে যেন আল্লাহ ভালা করে।’ ত্রাণসামগ্রী পেয়ে আনার আলী, আব্বাস মিয়ার মতো খুশিমনে বাড়ি ফেরেন কোদালকাটি মাস্টারপাড়া গ্রামের স্বামীহারা জমেলা বেগম, ফুলবাসি, নাসির আলীসহ অনেকেই।

চরসাজাই মণ্ডলপাড়া গ্রামের দিনমজুর আনার আলী বলেন, ‘থাইক্যা থাইক্যা লকডাউনে কামকাজ না থাহায় বইসা বইসা খাইছি। ধারদেনায় ভরে গেছে, এহন কেউ ধারকর্জ দিবার চায় না। এমন সময় চাইল, ডাইল, আটা ও তেল দিয়া বাঁচাইলেন তোমরা।’

রৌমারী উপজেলা হলরুমে খাদ্য সহায়তা বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল্লাহ, সদর ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম সালু, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হারুন-অর রশীদ, রৌমারী শুভসংঘের সভাপতি মাসুদ পারভেজ রুবেল প্রমুখ। রাজীবপুরের কোদালকাটিতে উপস্থিত ছিলেন শুভসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা স্বপ্ন ও শুভসংঘের ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি আমিনুর রহমান।