kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

হুইপ সামশুলের জুলুম-পীড়ন

কেন্দ্রের কাছে তৃণমূলের অভিযোগের পাহাড়

তৈমুর ফারুক তুষার   

২৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কেন্দ্রের কাছে তৃণমূলের অভিযোগের পাহাড়

পটিয়া উপজেলার ১৪ নম্বর ভাটিখাইন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন সন্তোষ কুমার বড়ুয়া। ৭৪ বছর বয়সী এই সাবেক স্কুল শিক্ষক কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। তিনি স্থানীয় নলিনীকান্ত মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে কাজ করতেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ভাটিখাইন ইউনিয়নে হাতে গোনা যে দু-চারজন মানুষ আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, তাঁদের অন্যতম সন্তোষ কুমার বড়ুয়া। সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত প্রবীণ এই নেতাকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে জাতীয় পার্টি থেকে আসা এক নেতাকে পদায়ন করা হয়েছে।

শুধু সন্তোষ কুমার বড়ুয়াই নন, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি সাংগঠনিক নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভেঙে দিয়ে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত থেকে আসা অনেক নেতাকে নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হারানোর শোকের মাস আগস্টে আওয়ামী লীগের কোনো স্তরেই কমিটি গঠনের রেওয়াজ না থাকলেও পটিয়ায় এমনটাই করা হয়েছে। সম্মেলনের মধ্য দিয়ে গঠন হওয়া ১৪টি ইউনিয়ন কমিটি ২০১৯ সালের আগস্টে ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এমন কাণ্ডের পেছনের ব্যক্তিটি হলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী।

হুইপ সামশুল, তাঁর দুই ভাই ও এক ছেলের বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগের অন্ত নেই। মতের অমিল হলেই পুরনো ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্যাতন ও অপমান, জবর-দখল, দলীয় পদ বাণিজ্য, অনিয়ম-দুর্নীতির বহু অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে। গত সোমবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে পটিয়া আওয়ামী লীগ নেতারা নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। ১৪টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের কাছে লিখিত অভিযোগও দেন।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কিছু অভিযোগ পেয়েছি। আমরা তদন্ত করছি। তদন্তের পর ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সোমবার দুপুরে সার্কিট হাউসে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরী। প্রবীণ এই নেতা বলেন, ‘সামশুল হক চৌধুরী নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে দলকে বিতর্কিত করছেন। তাঁর কর্মকাণ্ডে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’ এ সময় তিনি সামশুল হকের নানা অপকর্মের কথা তুলে ধরতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন তাঁকে থামিয়ে দেন। সভায় আরো কয়েকজন নেতা সামশুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দিদারুল আলমকে থামিয়ে দেওয়ায় অন্যরা আর কথা বলেননি। তবে ১৪ ইউনিয়নের সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন।

পুনর্বহাল হতে যাচ্ছেন সামশুলবিরোধী নেতারা

সামশুল হকের সঙ্গে মতের অমিল হওয়ায় পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে যোগসাজশ করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে ১৪টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে এই কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। যদিও আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো পর্যায়ের কমিটিই শোকের মাস আগস্টে গঠন করা হয় না। নতুন গঠিত এসব কমিটিতে বিএনপি জামায়াত ও জাতীয় পার্টি থেকে আসা অনেক নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়। অসাংগঠনিকভাবে কমিটি ভেঙে দেওয়া ও অনুপ্রবেশকারীদের কমিটিতে স্থান দেওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতারা।

সোমবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ১৪ ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগপত্র কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারীগণ নিম্নলিখিত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সাংগঠনিক নিয়মে গঠনতন্ত্র অনুসারে সাংগঠনিক এবং দলীয় সব কর্মকাণ্ড সুচারুরূপে পরিচালনা করে আসছি। পরিতাপের বিষয় এই—সম্প্রতি কোনো প্রকার সভা-সম্মেলন না করে এবং আমাদের কোনোরূপ চিঠি বা মৌখিকভাবে অবগত না করে উপজেলা আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে অগঠনতান্ত্রিকভাবে পটিয়া উপজেলাধীন ১৪টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেয়। আরো দুঃখের বিষয় এই যে বিভিন্ন দল থেকে আগত অনুপ্রবেশকারী, পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগবিদ্বেষী, কট্টর সাম্প্রদায়িক ও অসাংগঠনিক ব্যক্তিদেরকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে অন্যায়ভাবে কমিটি ঘোষণা করা হয়। যার দরুন দলীয় ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।’

অভিযোগপত্রে পটিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের ১৩ জন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর রয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় কালের কণ্ঠ’র। তাঁরা জানান, কেন্দ্রীয় নেতারা অভিযোগগুলো আমলে নিয়েছেন। তাঁরা সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটি পুনর্বহাল হবে বলে জানিয়েছেন। সামশুল হকের অনুসারীদের দিয়ে গঠিত কমিটিগুলো ভেঙে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

জানতে চাইলে ১৪ নম্বর ভাটিখাইন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ভেঙে দেওয়া কমিটির সভাপতি সন্তোষ কুমার বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপি সাহেব যেটা দরকার মনে করেছেন সেটাই করেছেন। আমরা প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নেতা। কাউন্সিল অধিবেশনের মধ্য দিয়ে আমাদের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি কেন ভেঙে দেওয়া হলো সেটা উনিই জানেন। কেন্দ্রীয় নেতারা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগকে নির্দেশ দিয়েছেন আমাদের কমিটি পুনর্বহাল করার জন্য।’ তিনি বলেন, ‘দল থেকে কখনো কোনো কিছু চাইনি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনীতি করেছি। জীবনের পুরোটা সময় দলের জন্য উৎসর্গ করেছি। আমাদের কমিটি থেকে বাদ দিয়ে যারা তাঁদের কাজে সমর্থন দেবে বা তাল মিলিয়ে চলবে তাঁদেরকে দিয়ে কমিটি করেছেন।’

৪ নম্বর কোলাগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ভেঙে দেওয়া কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ হারুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে আমরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সাংগঠনিক নিয়ম ভঙ্গ করে আমাদের নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। কোনো প্রেস ব্রিফিং বা কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ না করে, আমাদেরকে না জানিয়ে অসাংগঠনিকভাবে ১৪টি ইউনিয়নের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এসব কমিটিতে আওয়ামী লীগবিদ্বেষী বহু অনুপ্রবেশকারীকে পদ দেওয়া হয়। পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কখনো দেখিনি শোকের মাস আগস্টে আওয়ামী লীগের কোনো কমিটি গঠন হয়। কিন্তু আগস্ট মাসে আমাদের কমিটির বদলে নতুন কমিটি ঘোষণা করে এখানে আনন্দ উদযাপন করা হয়েছে।’

কমিটি ভেঙে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে মোহাম্মদ হারুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরনো ও ত্যাগী আওয়ামী লীগের নেতারা টাকা পয়সার লোভ করেন না। তাঁরা দল নিয়ে ভাবেন, দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় কাজ করেন। টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণে সুবিধাবাদী লোক ঢুকে গেছে। তারা আমাদের মতো পুরনো নেতাদের কারণে অপকর্ম করতে পারে না। সে জন্য আমাদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করেছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমরা অন্যায়ভাবে কমিটি ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে লিখিত আবেদন করেছি। তৃণমূলের নেতারা ভোট দিয়ে আমাদের নেতা নির্বাচিত করেছিলেন। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতারা বুঝতে পেরেছেন। তাঁরা বলেছেন, আমাদের কমিটিই পুনর্বহাল হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সামশুল হক ভাটিখাইন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি করেছেন জাহাঙ্গীর চৌধুরীকে এবং সাধারণ সম্পাদক করেছেন মো. ইব্রাহিমকে। দুজনই জাতীয় পার্টির নেতা ছিলেন। দুজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতাকে বাদ দিয়ে অনুপ্রবেশকারী দুজনকে পদ দেওয়া হয়েছে।’

কমিটি ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে খেপে যান হুইপ সামশুল হকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম শামসুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এটা আপনার জানার প্রয়োজন কি? এখানে আমার দলের ভালো-মন্দ আমি বুঝতেছি। যেটা ভালো সেটা করতেছি।’

মোবাইল চুরির মামলা করিয়েছেন শিল্পপতি আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে

২০০৮ সালে পটিয়া আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে মনোনয়ন চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শিল্পপতি সেলিম নবী। এটাই কাল হয় তাঁর। পড়েন সামশুল হকের রোষানলে। বিভিন্ন সময় তাঁর ওপর হামলার চেষ্টা করেছেন সামশুলের অনুসারীরা। সামশুলের ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনও বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়েছেন নবীকে। সর্বশেষ গত মার্চে নবীর বিরুদ্ধে জামায়াতকর্মী আকবর হোসাইনকে দিয়ে পটিয়া থানায় মোবাইল চুরির মামলা করান সামশুল হক। সে সময় এক বিবৃতিতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান এক বিবৃতিতে এমন মিথ্যা মামলার প্রতিবাদ জানান।

জানতে চাইলে সেলিম নবী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সামশুল হকরা নিজস্ব বলয় তৈরি করতে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা দিচ্ছেন। পুরনো নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে ‘সামশুলীগ’ তৈরি করছেন। তাঁরা এলাকায় সন্ত্রাস, জমি দখলসহ নানা অপকর্ম করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন।’