kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত

বাস্তবায়ন নিয়ে যত সংশয়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত

ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তের পর গতকাল রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনায় গাড়ি থেকে ব্যাটারি খুলছেন এক চালক। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীসহ দেশজুড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের ব্যাপারে আগে থেকেই উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তার পরও বছরের পর বছর রাস্তায় বীরদর্পে চলছে এসব অবৈধ যান। ফলে সারা দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চলাচল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না সাধারণ মানুষ।

তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের পরপরই রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তে এরই মধ্যে নতুন করে ধরপাকড় শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর অলিগলি থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ করে আগারগাঁওয়ের ডাম্পিং এলাকায় নিয়ে গেছে পুলিশ। তবে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে রাস্তা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা তুলে নেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন রিকশার মালিক ও চালকরা।

এদিকে সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও আগামীকাল বুধবার সমাবেশের ডাক দিয়েছে দুটি সংগঠন। আলাদা বিবৃতিতে তাদের পক্ষ থেকে অবিলম্বে বুয়েট প্রস্তাবিত রিকশাবডি, গতি নিয়ন্ত্রক, উন্নত ব্রেকসহ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় চলতে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

রাজধানীর পল্লবী এলাকা থেকে গত শনিবার সন্ধ্যায় এক ট্রাক এবং গতকাল রাজধানীর রূপনগর, শাহআলী, দারুসসালাম ও ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকা থেকে তিন ট্রাক ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ করে ডাম্পিংয়ে নিয়ে যায় পুলিশ।

অভিযোগ রয়েছে, বৈধ অনুমতি না থাকার পরও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশকে চাঁদা দিয়ে রিকশাগুলো চলাচল করে। একটি সাধারণ পেডালচালিত রিকশা ভাড়া দিয়ে মালিক দৈনিক পান ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, তবে রিকশায় ব্যাটারিচালিত ইঞ্জিন সংযোজনের পর প্রতিদিন রিকশার মালিক ভাড়া পান ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। রিকশা চালানোর জন্য প্রতিদিন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের দিতে হয় এক হাজার টাকা। মালিক প্রতিদিন সন্ধ্যার পর স্থানীয় নেতাদের চাঁদার টাকা পৌঁছে দিয়ে আসেন।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা সেই টাকার অর্ধেক দেন স্থানীয় থানায়, বাকিটা নেন নেতারা। প্রতিটি রিকশা চালকের সঙ্গে সাংকেতিক ভাষায় লেখা একটি লেমেনেটিং করা কার্ড রয়েছে। ওই কার্ড দেখালে পুলিশ ওই রিকশা জব্দ করে না।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে মিরপুর কালশী এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আহমেদ বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ হলে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় অনেক নেতার আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে, সে কারণেই এ ধরনের রিকশা জব্দের অভিযান কত দিন চলে তা দেখার বিষয়।’

মিরপুরের পল্লবী এলাকার ব্যাটারিচালিত রিকশার মালিক মহর আলী বলেন, ‘মানুষ এখন ধীরগতির যানবাহনে চড়তে চায় না, সে কারণে আমরা রিকশায় ব্যাটারিচালিত ইঞ্জিন সংযোগ করেছি। সরকার চাইলে সব কিছুই বন্ধ করতে পারে, তবে আমাদের একটু সময় দেওয়া উচিত ছিল।’ কালশী এলাকার আরেক চালক জোবেদ আলী বলেন, ‘পায়েচালিত রিকশায় আয়-রোজগার কম, তাই নতুন রিকশা চালাই। আমি তো জানি না সরকার এগুলো নিষিদ্ধ করেছে, সকালে বের হয়েছি পুলিশ রিকশাটা নিয়ে গেল। এই করেনাকালে কী করে খাবার জুটাব বলেন তো?’

মানিকগঞ্জ থেকে আঞ্চলিক প্রতিনিধি জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তের খবরে মানিকগঞ্জের শিবালয়ের পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাটসহ আঞ্চলিক সড়কে চলাচলকারী রিকশাচালকরা বিপাকে পড়েছে। এ উপজেলার বেশির ভাগ চালক নিম্নবিত্ত হওয়ায় বিভিন্ন এনজিও থেকে লোন নিয়ে ক্রয় করে এসব রিকশা। প্রতি মাসেই দুই থেকে তিন হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। এ অবস্থায় এসব রিকশা বন্ধ হয়ে গেলে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়াবে বলে জানান তাঁরা। তবে পুলিশের দাবি, গতকাল থেকে সবাইকে সর্তক করা হচ্ছে। মঙ্গলবার থেকে অভিযান চালিয়ে এসব বাহন জব্দ করা হবে।

মানিকগঞ্জের ট্রাফিক পরিদর্শক (প্রশাসন) আবুল হোসেন জানান, গত রবিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চলাচলের নিষেদ্ধের বিষয়টি তাঁরা গণমাধ্যমে জানতে পেরেছেন। কিন্তু অফিশিয়ালি কোনো নির্দেশনা পাননি। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে  বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘শহর ও গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চলছে। এগুলো এখন প্রায়ই মহাসড়কে উঠে যাচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকায় ১২ হাজার রিকশা আছে, এর মধ্যে এখন ছয় হাজারই মোটর দিয়ে চলে। তবে সারা দেশে এই সংখ্যা কত তা আমাদের জানা নাই। মোটরের রিকশা পরিসংখ্যানে সরকার কাজ করছে। স্থানীয় পর্যায়ে এর তথ্য নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে রিকশা, ব্যাটারি রিকশা, ইজি বাইক চালক সংগ্রাম পরিষদ কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন ও সদস্যসচিব প্রকৌশলী ইমরান হাবিব রুমন এক বিবৃতিতে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক, গণবিরোধী ও তুঘলকি বলে উল্লেখ করেছেন। এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও কাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশের ডাক দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।

আরেক বিবৃতিতে রিকশা-ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি শাহাদৎ খাঁ ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস বলেছেন, যখন ব্যাটারি রিকশা বিক্রি হলো, যন্ত্রাংশ আমদানি করা হলো তখন সরকার কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে এখন দরিদ্র মানুষের রুটি রুজি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে সড়ক পরিবহনবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায় ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চলাচল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের নির্দেশনা জারি হয়নি।

 



সাতদিনের সেরা