kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

হাটহাজারীর দুর্গ ভাঙতে ছক

হেফাজতকে হটিয়ে শক্তিশালী হতে চায় আওয়ামী লীগ

তৈমুর ফারুক তুষার, চট্টগ্রাম থেকে   

২২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




হাটহাজারীর দুর্গ ভাঙতে ছক

চট্টগ্রামের হাটহাজারী হেফাজতে ইসলামের দুর্গ। সেই হাটহাজারীতে সাংগঠনিক ভিত্তি আরো মজবুত করতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। হাটহাজারীতে হেফাজতের শক্ত ভিত্তির কারণ অনুসন্ধান ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়গুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। জুন থেকেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নিয়মিত হাটহাজারী সফরে যাবেন। তাঁরা সেখানে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে স্থানীয় নেতাদের কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করবেন এবং উৎসাহ দেবেন। চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা কালের কণ্ঠকে এমনটাই জানিয়েছেন।

জানা গেছে, গত শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ এবং চট্টগ্রাম মহানগরের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, চট্টগ্রামের রাজনীতির প্রভাবশালী নেতা শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে হাটহাজারী মাদরাসাকেন্দ্রিক হেফাজতের বিভিন্ন সময়ে নাশকতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। হেফাজতের সঙ্গে সখ্যর জন্য একাধিক নেতা ও মন্ত্রীর সমালোচনা করেন হাটহাজারী আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা। হাটহাজারীতে হেফাজতের শক্ত অবস্থানের পেছনে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের সরল বিশ্বাস মূল কারণ বলে উল্লেখ করেন একাধিক নেতা। কেউ বলেন, দীর্ঘদিন হাটহাজারীতে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত না হওয়ায় সেখানে দল দুর্বল হচ্ছে আর প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করতে সমস্যা হচ্ছে। একাধিক নেতা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হাটহাজারীতে আওয়ামী লীগ দাঁড়াতে পারছে না এবং হেফাজত শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে টিকে আছে বলে মত দেন।

বৈঠকে হাটহাজারী আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, মাঠে শক্তি দেখানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগী সংগঠনের নেতারাই মূল ভূমিকায় থাকেন। কিন্তু হাটহাজারীতে দীর্ঘদিন সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলন নেই, কমিটিও হয় না। ফলে হেফাজতের সামনে দাঁড়ানোর মতো শক্তি পাচ্ছে না আওয়ামী লীগ।

বৈঠকে গত মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে হেফাজতের তাণ্ডবের বিষয়টি নিয়েও কথা হয়। সে সময় থানাসহ সরকারি দপ্তরে হামলা ও দেয়াল তুলে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে হেফাজত এমন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে বলে উপস্থিত নেতারা স্বীকার করেন।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকে স্থানীয় নেতাদের কথা শোনার পর কেন্দ্রীয় নেতারা বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দেন। তাঁরা হেফাজতের শক্ত দুর্গ ভাঙতে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে নির্দেশনা দেন। হেফাজতে ইসলামের নেতারা যে প্রকৃত ধার্মিক নন, তাঁরা যে ধর্ম ব্যবসায়ী, তা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে নানা সামাজিক কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দেন।

হাটহাজারীতে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন কেন্দ্রীয় নেতারা। ২০১৯ সালে হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলেও নিজেদের মতবিরোধে এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি আলোর মুখ দেখেনি।

সূত্র জানায়, হাটহাজারীতে যেহেতু আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নেই, সে কারণে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক ওয়াসেকা আয়েশা খানকে ওই এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই নেতা মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও আ জ ম নাছিরকেও হাটহাজারীতে বিশেষ ভূমিকা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সূত্রগুলো জানায়, হেফাজত নিয়ন্ত্রিত হাটহাজারীতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় নেতারা নিয়মিত সেখানে যাবেন বলে বৈঠকে জানানো হয়। জুনের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন হাটহাজারীতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

আগামী ২০ দিনের মধ্যে হাটহাজারীর পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওয়ার্ড পর্যায় থেকে সম্মেলনের কাজ শুরু করে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘হাটহাজারীতে হেফাজতের বহু তাণ্ডব আমরা দেখেছি। সেখানে আওয়ামী লীগকে আরো শক্তিশালী করতে আমরা কাজ শুরু করেছি। হাটহাজারী ও চট্টগ্রামের নেতাদের নিয়ে বসে বৈঠক করছি। নিজেদের মধ্যে সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলে তৃণমূলে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সংগঠনকে সুসংগঠিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

জানতে চাইলে হাটহাজারী আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সম্মেলন হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা যায়নি। আগামী ২০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘হেফাজতের অপতৎপরতা রুখতে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সংগঠনকে শক্তিশালী করার পাশাপশি সাংগঠনিক ও সামাজিক কার্যক্রমের ওপর জোর দিতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, যদি সংগঠনকে শক্তিশালী করা যায়, তাহলে শুধু হেফাজত নয়, বিএনপি-জামায়াত বা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির অপতৎপরতা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।’

হাটহাজারী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন নোমান বলেন, ‘মাঠের রাজনীতিতে আরো বেশি সক্রিয় হতে হবে। শুধু আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতাই নয়, সহযোগী সংগঠনগুলোকেও সম্মেলনের মাধ্যমে সক্রিয় করে যেকোনো অপতৎপরতা রোখা সম্ভব হবে। এ জন্য আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বাড়লে প্রশাসনের সঙ্গেও সমন্বয়টা ভালো হয়।’



সাতদিনের সেরা