kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতি

নগরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি শনাক্ত-মৃত্যুহার

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নগরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি শনাক্ত-মৃত্যুহার

ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা খাগড়াছড়ির রামগড়ের পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা। গত ঈদুল ফিতরের কয়েক দিন পর থেকে এ উপজেলায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছিল। সেখানে সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ৪২টি নমুনা পরীক্ষায় ৩০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৭১.৪৩ শতাংশ, যা এ পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। এখানে শনাক্তের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে করোনা হাসপাতালে রোগীর শয্যাও খালি নেই। ২০ শয্যার এ হাসপাতালে গতকাল রবিবার বিকেল পর্যন্ত ২৪ জন করোনা রোগী চিকিৎসাধীন ছিল।

ফটিকছড়ির পার্শ্ববর্তী হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায়ও করোনা জেঁকে বসেছে। চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলার মধ্যে এই চার উপজেলায় করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বাস্থ্য বিভাগ চিন্তিত হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় (গ্রামাঞ্চলে) মোট করোনা শনাক্তের মধ্যে এই চার উপজেলায় শনাক্ত হয়েছে ৫৩.৬২ শতাংশ।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ দিন আগে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর ওই চার উপজেলায় সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়। গত ১৪ জুন এ সম্পর্কিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কভিড-১৯ নমুনা পরীক্ষায় ফল বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় সংক্রমণের হার বেড়েছে। পজিটিভ শনাক্তের পর্যালোচনার হার সমগ্র জেলায় ২৪ শতাংশ হলেও উপজেলা পর্যায়ে ৫০ শতাংশের ঊর্ধ্বে। এ অবস্থায় সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের করোনার তথ্য পর্যালোচনায় আরো জানা যায়, শুধু ওই চার  উপজেলাই নয়, চট্টগ্রাম নগরের তুলনায় এখন গ্রামাঞ্চলেই (উপজেলাগুলোতে) করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুহার দুটিই বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে মোট ১৩৬ জনের মধ্যে নগরে ৬৭ ও জেলায় (১৪ উপজেলায়) ৬৯ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় ৪৯ হাজার ১৬৪টি নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৮৮১ জনের। জেলায় নমুনা পরীক্ষার অনুপাতে গতকাল পর্যন্ত করোনা শনাক্তের হার ২৪.১৭ শতাংশ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরের করোনা পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নতির দিকে। গতকাল পর্যন্ত নগরে চার লাখ ৩৪ হাজার ৯৩৯টি নমুনা পরীক্ষার মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৪৪ হাজার ১০০ জনের দেহে, যা পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার ১০.১৪ শতাংশ।

করোনার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বর্তমানে নগরের তুলনায় জেলায় ১৪.০৩ শতাংশ বেশি করোনার সংক্রমণ। মৃত্যুহারও নগরের তুলনায় জেলায় বেশি। চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত হয়ে এই পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৫৫৭ জনের। এর মধ্যে নগরে ৪৬০ ও জেলায় ১৯৭ জন। নগরে শনাক্ত অনুপাতে মৃত্যুহার ১.০৪ শতাংশ। জেলায় শনাক্ত অনুপাতে মৃত্যুহার ১.৬৬ শতাংশ।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নগরে নমুনা পরীক্ষা (৪৯৫টি) অনুপাতে শনাক্তের (৬৭ জন) হার ১৩.৫৪ শতাংশ। জেলায় নমুনা পরীক্ষা অনুপাতে (১৪৭) শনাক্তের (৬৯) হার ৪৬.৯৪ শতাংশ।

ফটিকছড়িতে আক্রান্তের হার ঊর্ধ্বগতি বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাবিল চৌধুরী গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফটিকছড়িতে কাজকর্ম করেন এমন অনেক শ্রমিকের বাড়ি উত্তরবঙ্গে। ঈদের ছুটির পর যাঁরা বাড়ি গিয়েছিলেন, সবাই কর্মস্থলে ফিরেছেন। হঠাৎ করে এখানে সংক্রমণ বেড়ে গেছে। আমাদের ২০ শয্যার কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে ২৪ জন ভর্তি রয়েছে। করোনা রোগী আগের চেয়ে বেড়েছে।’

চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলার মধ্যে নমুনা পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি করোনা শনাক্ত হয়েছে হাটহাজারীতে। নগরের পার্শ্ববর্তী ও ফটিকছড়িসংলগ্ন এই উপজেলায় গতকাল পর্যন্ত সাত হাজার ৬২টি নমুনা পরীক্ষার মধ্যে দুই হাজার ৭০১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩৮.২৫ শতাংশ। এখানে শনাক্ত অনুপাতে মৃত্যুহার ১.৫৫ শতাংশ (৪২ জন)। ফটিকছড়িতে শনাক্তের হার ২৫.২৮ শতাংশ। এই উপজেলায় মৃত্যুহার ১.০৫ শতাংশ। এ ছাড়া রাউজান উপজেলায় এক হাজার ৪৪০ জন শনাক্ত ও ১৭ জনের মৃত্যু এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ৬৪২ জন শনাক্ত ও ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে ১৪ উপজেলার মধ্যে মৃত্যুহার বেশি সাতকানিয়ায়। এই উপজেলায় গতকাল পর্যন্ত করোনা শনাক্ত ৪২৫ জনের মধ্যে মারা গেছে ১৫ জন। মৃত্যুহার ৩.৫৩ শতাংশ। এভাবে চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলায় করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েছে।

চার উপজেলায় (ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া) সংক্রমণ বাড়ায় চিন্তিত প্রশাসনের কর্মকর্তারা। আলোচনা হচ্ছে এসব উপজেলায় কী এলাকাভিত্তিক লকডাউন আসছে! তবে করোনার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে বৈঠকে বসবেন প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান শনিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২২ জুনের সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চট্টগ্রামে দৈনিক করোনার সংক্রমণ এখন ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যেই আছে।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘লকডাউনের মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি। ওই চার উপজেলার সংক্রমণ আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি। পুরো জেলায় সংক্রমণ কিছুটা কমলেও উপজেলাগুলোর মধ্যে হাটহাজারীতে সবচেয়ে বেশি।’

হাটহাজারী উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ইমতিয়াজ হোসাইন গতকাল রবিবার বলেন, ‘হাটহাজারীতে নমুনা পরীক্ষা বেশি হওয়ার কারণে শনাক্তের হারও বেশি। এখানে বেশ কয়েকটি এলাকা আছে অতি ঘনবসতিপূর্ণ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করে অসংখ্য মানুষ। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব কম মানার কারণে আক্রান্ত বেড়েছে। আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি।’

জানা যায়, জেলার (উপজেলা) মধ্যে সবচেয়ে বেশি নমুনা পরীক্ষা বাঁশখালী উপজেলায় হলেও সেখানে শনাক্ত হার সবচেয়ে কম। এখানে গতকাল পর্যন্ত ৯ হাজার ৭২৫টি নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৫৯১ জনের দেহে। শনাক্ত হার ৬.০৮ শতাংশ। মৃত্যুহার ১.১৮ শতাংশ।

 

 



সাতদিনের সেরা