kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

অনন্য বিজ্ঞাপন জয়নাল

মোবারক আজাদ   

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অনন্য বিজ্ঞাপন জয়নাল

জয়নাল আবেদীন। রাজধানীর মৌচাকে গতকাল দুপুরে এভাবেই রিকশা নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

মধ্যদুপুর। আকাশ মেঘের কোলে দিয়েছে ডুব। কখনো ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। আবার কখনো ঝুম। আর তাতেই কাকভেজা জয়নাল। পুরো নাম জয়নাল আবেদীন। বয়স পেরিয়েছে ষাটের ঘর। মহাজনের কাছ থেকে রিকশা নিয়ে প্রতিদিনের মতো গতকাল শনিবারও ঘর থেকে বেরিয়েছেন সেই সাতসকালে। মাথায় পলিথিন প্যাঁচানো, তার ওপর সাদা ক্যাপ। এরই মধ্যে পেডাল মারতে মারতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। মুখাবয়বে বিষণ্নতা আঁকা। রাজধানীর মৌচাকের ফরচুন মার্কেটের সামনের রাস্তায় এসে এক যাত্রীকে নামালেন। বৃষ্টিতে ভিজতে পারে, তাই ভাড়ার কচকচে দুটি ২০ টাকার নোট পরম যত্নে রাখলেন পলিথিনে মোড়ানো সিগারেটের প্যাকেটে।

এই বয়সে এমন বর্ষণমুখর দিনে রিকশা নিয়ে বের হওয়ার কারণ জানার চেষ্টা করতেই দুই চোখ ছলছল করে ওঠে জয়নালের। ভেজা শরীরে কাঁপতে কাঁপতে বলতে থাকেন, ‘বউ মরছে দিন বিশেক আগে। ঘরে দুইটা কিশোরী মাইয়া একা একা থাহে। বড্ড টেনশনে থাহি। তাই দূরে কোথাও খেপ লইয়া যাই না। এহন আমিই তাদের মা, আমিই তাদের বাবা। ঝড়-তুফান যা আসুক, রিকশা চালাইয়া ঘরে তো সদাই নিতে অইব।’

এ রকম বাবা, একজন জয়নাল আবেদীনের জন্যই আজকের এই দিনটি। বাবা থাকুক কাছে, দূরে কিংবা পরপারে। আজ বাবাদের দিন। দেশভেদে ‘বাবা’ শব্দটি নানা অর্থে মঞ্চায়িত হলেও সন্তানের জন্য পরম মমতা ও আগলে রাখার ছবি বিশ্বজুড়ে একই রংতুলিতে আঁকা। বাবার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছরের জুনের তৃতীয় রবিবার ১১০টিরও বেশি দেশে উদযাপিত হয় দিনটি। বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে বাবা দিবসের রং।

সেই জয়নালের গল্প : জন্মের পর থেকেই দরিদ্রতার সঙ্গে ‘বন্ধুতা’ জয়নাল আবেদীনের। জীবনের যেটুকু পথ হেঁটেছেন এই বাবা লড়েছেন। আজও থামছে না সেই লড়াই। দাম্পত্য জীবনে ঘরে দুটি ছেলে এলেও দুইবারই কেঁদেছেন অঝোরে। তারা জন্মের পরই যে চলে গেছে না-ফেরার রাজ্যে। শেষমেশ দুই মেয়ে, মুন্নি ও তন্নি এখন জয়নালের সংসারের দুই রানি। তাদের মা মারা যাওয়ার পর থেকে জয়নাল তাঁর বাসা খিলগাঁও গোড়ান এলাকার আশপাশের এলাকা ছাড়া দূরে কোথাও যাত্রী নিয়ে যেতে সাহস দেখাননি। রাস্তায় রাস্তায় রিকশার পেডাল ঘুরালেও মন পড়ে থাকে দুই মেয়ের ভালোবাসার অভিধানে। কখন কী হয়ে যায়, সেই চিন্তায়। তার পরও মেয়েদের সাধ্যমতো ভালো রাখতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শরীর নোনা জলে ভেজাচ্ছেন। কুমিল্লার মুরাদনগরের জয়নাল রিকশার তিন চাকার সঙ্গে সখ্য গড়েছেন কিশোর বয়সেই। তখন থেকেই পুরো রাজধানীর ভূগোল তাঁর মুখস্থ। এখন শুধু দুই মেয়ের জন্যই ছোট হয়ে এসেছে জয়নালের রিকশাযাত্রার পৃথিবী।

জয়নাল বলেন, ‘আমার বউ মারা যাওয়ার পর থেইকা, সব সময় মেয়েদের সামনে হাসি-খুশি থাকি। আর তাদের বুঝাই, মানুষ চিরদিন পৃথিবীতে বাঁইচা থাকে না। তাদের কাছেও একটা মোবাইল দিছি, ঘণ্টা দুয়েক পরপরই কল দেয় তারা, আমিও কল দেই। কোথায় আছি জানাচ্ছি। সাবধানে দরজা-জানালা দিয়ে ঘরে থাকার কথা বলছি। কী আনতে হবে বলছি। এভাবে তাদের ছায়া দিয়া রাখতাছি। ছোট মেয়ে এলাকারই এক স্কুলে ফাইভে ও বড়টা সিক্সে পড়ত। করোনায় দেড় বছর ধইরা স্কুল বন্ধ, তাই বাসায় বন্দি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন আমার স্বপ্ন একটাই, যত দিন পরিশ্রম করতে পারি তাদের পড়াশোনা করাইয়া আমার সাধ্যমতো তাদের বিয়ে দেওয়া। কারণ আমার বয়সও তো ৬০-এর ওপরে হয়ে গেছে। কখন হঠাৎ কইরা ওপরওয়ালা নিয়া যায়!’ দ্বিতীয় বিয়ে করার ইচ্ছা আছে কি না, জানতে চাইলে ভড়কে যান জয়নাল! বললেন, ‘আরে না! এখন মেয়েগুলারে নিয়াই আমার পুরা পৃথিবী। আজ যদি কোনো ছেলে থাকত তাইলে হয়তো বৃষ্টিতে ভিজা ভিজা এই বয়সে রিকশা চালান না-ও লাগতে পারত। সবই ওপরওয়ালার ইচ্ছা।’

 



সাতদিনের সেরা