kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

রংপুরবাসীর স্বপ্নের গ্যাস সঞ্চালন লাইন

মেয়াদ শেষ অথচ প্রকল্পের কাজ এখনো দৃশ্যমান নয়

সেরাজুল ইসলাম   

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেয়াদ শেষ অথচ প্রকল্পের কাজ এখনো দৃশ্যমান নয়

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত রংপুরবাসীর স্বপ্নের গ্যাস সঞ্চালন লাইন (বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর) প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি জুনে। এর মধ্যে তিন বছর পার হলেও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অদক্ষতায় এখনো ঠিকাদার নিয়োগ করতে পারেনি গ্যাস ট্রান্সমিশন কম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)।

এ অবস্থায় বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর সঞ্চালন পাইপলাইনের মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে প্রকল্প পরিচালক খোন্দকার আরিফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটির ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) অনুমোদিত হয়। এক হাজার ৩৭৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পের কাজ চলতি জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের আওতায় (বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে সৈয়দপুর) ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ১৫০ কিলোমিটার সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। এর সঙ্গে থাকছে দৈনিক ১০ কোটি (১০০ এমএমএসসিএফডি-মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফুট ডে) ঘনফুট সক্ষমতার সিজিএস (সিটি গেট স্টেশন) এবং রংপুর ও পীরগঞ্জে যথাক্রমে ৩০ ও ২০ এমএমএসসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন টিবিএস (টাউন বর্ডার স্টেশন) স্থাপনকাজ।

কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজই শেষ করা যায়নি। আর পাইপলাইন স্থাপনের ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টি কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। এসব কারণে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ ঝুলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। ১৫০ কিলোমিটার সঞ্চালন পাইপলাইনের জন্য পাঁচটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০২০ সালের অক্টোবরে। দরপত্র জমাদানের শেষ তারিখ ছিল একই বছরের ২৪ নভেম্বর। যথারীতি সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ পাঠানো হয় বোর্ডে। কিন্তু বোর্ড বিষয়টি অনুমোদন না দিয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্ল্যানিং) আইয়ুব খান চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেয়। সেই কমিটি পুনঃ দরপত্রের সুপারিশ করে। অভিযোগ রয়েছে, উচ্চদরে দরপত্র জমাদানকারী নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে সক্রিয় রয়েছে একটি চক্র।

পুনঃ দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হলে ই-প্যাকেজের সর্বনিম্ন দরদাতা দীপন গ্যাস কম্পানি প্রথমে পিডি, এরপর যথাক্রমে জিটিসিএলের এমডি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব  এবং সর্বশেষ সিপিটিইউ (সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট) বরাবর অভিযোগ দাখিল করে। সিপিটিইউ পাঁচটি প্যাকেজের মধ্যে এ, বি এবং ই প্যাকেজের পুনঃ দরপত্র সঠিক হয়নি বলে মতামত দেয়। সেই সঙ্গে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার আদেশ দেন। সিপিটিইউ যখন এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল তখন পুনঃ দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করলে রিট দায়ের করে দীপন গ্যাস কম্পানি। অন্যদিকে সিপিটিইউর আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যায় জিটিসিএল। আদালত আজ রবিবার শুনানির জন্য (২০ জুন) দিন ধার্য করেছেন।

দীপন গ্রুপের উপদেষ্টা মোক্তাদির আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাব তারা যে প্রক্রিয়ায় বাতিল করেছে সেটি যথাযথ হয়নি। তাই আমরা অভিযোগ দিয়েছি। পিডি ও জিটিসিএল কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় আমরা সিপিটিইউতে গেছি। সিপিটিইউ আমাদের পক্ষে রায় দিলে জিটিসিএল সেই আদেশ চ্যালেঞ্জ করেছে।’

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক খোন্দকার আরিফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দরপত্র জিটিসিএল বোর্ড বাতিল করেছে। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। পুনঃ দরপত্র জমার শেষ তারিখ আগামী ২৪ জুন।’ তিনি আরো বলেন, প্রকল্পের অগ্রগতি মাঠে হয়তো দৃশ্যমান নয়, তবে অগ্রগতি রয়েছে। পাইপলাইনের মালামাল ভারত, চীন ও ইতালি থেকে আমদানি করা হয়েছে। সেগুলো চট্টগ্রামে চলে এসেছে। এটি গুরুত্বপুর্ণ। জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় আমরা কিছুটা পিছিয়ে গেছি। এরই মধ্যে প্রস্তাব ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৪৮ শতাংশ।’

মূল পাইপলাইন অংশে ছয়টি নদী ও দুটি ক্যানেল রয়েছে। যার দৈর্ঘ্য আড়াই কিলোমিটার। এ অবস্থায় আগামী ২০২৩ সালের জুনের আগে প্রকল্পটির কাজ শেষ হচ্ছে না এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। বরং আরো পিছিয়ে যেতে পারে। তেমনটি হলে বর্তমান সরকারের মেয়াদে উদ্বোধন করা কঠিন হতে পারে।

জিটিসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রুখসানা নাজমা ইসহাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণে সময় লাগছে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি দ্রুততার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিতে। করোনার কারণে কাজ কিছুটা ব্যাহত হলেও সেটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।’

রংপুরবাসীর স্বপ্নের এই সঞ্চালন পাইপলাইনের সঙ্গে সংগতি রেখে বিতরণের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড। প্রকল্পের আওতায় ১০০ কিলোমিটার বিতরণ পাইপলাইন থাকবে। এর মধ্যে রংপুর শহরে ৪৪ কিলোমিটার, পীরগঞ্জে ১০ কিলোমিটার এবং নীলফামারী ও উত্তরা ইডিজেড এলাকায় ৪৬ কিলোমিটার। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারিত করা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য চলতি সপ্তাহে প্রকল্পটি একনেকে উঠতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী।

উত্তরাঞ্চলে বগুড়ার পর গ্যাস সরবরাহ নেই। যে কারণে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুরের ১০টি জেলায় শিল্পের প্রসার হয়নি বললেই চলে। এসব কারণে উত্তরাঞ্চলে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, গ্যাস সরবরাহ পেলে রংপুর অঞ্চলেও শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। হবে প্রচুর কর্মসংস্থান। আর চাপ কমে আসবে রাজধানীর ওপর।

 



সাতদিনের সেরা