kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

সংঘাত এড়াতে ছুটছে আট কোটি মানুষ

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস কাল

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সংঘাত এড়াতে ছুটছে আট কোটি মানুষ

নভেল করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও ২০২০ সালে বিশ্বে যুদ্ধ, সহিংসতা, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে পালিয়ে বাঁচা মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় আট কোটি ২৪ লাখে। এটি ২০১৯ সালের রেকর্ডসংখ্যা সাত কোটি ৯৫ লাখের চেয়েও ৪ শতাংশ বেশি। আগামীকাল রবিবার আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস। এর আগে গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ২০২০ সালের শরণার্থী ও গণবাস্তুচ্যুতির বার্ষিক বৈশ্বিক ধারাবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ইউএনএইচসিআর জানায়, বল প্রয়োগে বাস্তুচ্যুতি সারা বিশ্বে ৯ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বেড়েই চলছে। বিশ্বের ১ শতাংশ মানুষ আজ বাস্তুচ্যুত। ২০১১ সালের তুলনায় এই সংখ্যা বর্তমানে দ্বিগুণ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ আসে মাত্র পাঁচটি দেশ থেকে। এগুলো হলো সিরিয়া (৬৭ লাখ), ভেনিজুয়েলা (৪০ লাখ), আফগানিস্তান (২৬ লাখ), দক্ষিণ সুদান (২২ লাখ) ও মিয়ানমার (১১ লাখ)। সংঘাত, সহিংসতা, জাতিগত নির্মূল অভিযান থেকে প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গত বছর এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি আশ্রয় চেয়েছেন।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে শরণার্থীদের প্রতি ১০ জনে প্রায় ৯ জন (৮৬ শতাংশ) তাদের প্রতিবেশী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো আশ্রয় দিয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ শরণার্থীকে। টানা সাত বছর ধরে তুরস্ক সবচেয়ে বেশিসংখ্যক (৩৭ লাখ) শরণার্থী আশ্রয় দিচ্ছে। এর পরে আছে যথাক্রমে কলম্বিয়া (১৭ লাখ), পাকিস্তান (১৪ লাখ), উগান্ডা (১৪ লাখ) ও জার্মানি (১২ লাখ)। বিভিন্ন দেশে আশ্রয়প্রার্থীদের অমীমাংসিত আবেদনের সংখ্যা এখনো ২০১৯ সালের মতোই আছে (৪১ লাখ)। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউএনএইচসিআর মোট ১৩ লাখ আবেদন নিবন্ধিত করেছে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ১০ লাখ কম (৪৩ শতাংশ কম)।

ইউএনএইচসিআর সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে ক্রমবর্ধমান বাস্তুচ্যুতির প্রায় এক দশক ধরে চলমান ধারা বন্ধ এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে ২০২০ সাল শেষে বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে আছে ইউএনএইচসিআরের আওতাধীন বিভিন্ন দেশের দুই কোটি সাত লাখ শরণার্থী, পাঁচ কোটি ৭০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী এবং বিভিন্ন দেশে বাস্তুচ্যুত ৩৯ লাখ ভেনিজুয়েলান। এ ছাড়া আরো চার কোটি ৮০ লাখ মানুষ তাদের নিজ দেশের ভেতরে ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত’ অবস্থায় ছিল। এর সঙ্গে আছে আরো ৪১ লাখ আশ্রয়প্রার্থী। মহামারি ও বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরতির আহ্বানের পরও সংঘাতের কারণে যে মানুষের গৃহহীন হওয়া থামেনি, এই সংখ্যাগুলো তারই প্রমাণ।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেন, ‘এগুলো শুধুই সংখ্যা নয়। এদের মধ্যে প্রত্যেক মানুষের রয়েছে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা, সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া এবং যন্ত্রণার গল্প। শুধু মানবিক সাহায্য নয়, তাদের দুর্দশার সমাধানে আমাদের মনোযোগ ও যথাযথ সহায়তা দিতে হবে।’

ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেন, ‘১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন ও গ্লোবাল কম্প্যাক্ট অন রিফিউজিসের (শরণার্থীদের জন্য বৈশ্বিক সংহতি) মাধ্যমে আমরা বাস্তুচ্যুত ও শরণার্থীদের সাহায্যে আইনি কাঠামো এবং অন্যান্য উপায় পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের এর চেয়ে বেশি প্রয়োজন অনেক বেশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তাহলেই বাস্তুচ্যুতির মূল কারণ সংঘাত ও নিপীড়ন কমানো যাবে।’

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বল প্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মানুষদের ৪২ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। তারা স্পষ্টতই অধিকতর ঝুঁকিতে থাকে। ২০১৮ ও ২০২০ সালের মধ্যে মোট ১০ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে, যারা জন্ম থেকেই শরণার্থী। তাদের মধ্যে অনেকেই আগামী বছরগুলোতেও শরণার্থী হয়েই থাকবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে যখন চলমান মহামারি সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল, তখন ১৬০টিরও বেশি দেশ তাদের সীমান্ত বন্ধ করে রেখেছিল। এর মধ্যে ৯৯টি দেশ সুরক্ষার খোঁজে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্যও তাদের সীমান্ত খোলেনি। তবু কিছু দেশ মহামারি মোকাবেলার পাশাপাশি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। যখন একদিকে কিছু মানুষ পালাতে গিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে বাধ্য হচ্ছিল, তখন লাখ লাখ মানুষ নিজ দেশের ভেতরেই হচ্ছিল বাস্তুচ্যুত। এই অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আগের চেয়ে আরো ২৩ লাখ বেড়েছে, যারা মূলত ইথিওপিয়া, সুদান, সাহেল অঞ্চলের দেশগুলো, মোজাম্বিক, ইয়েমেন, আফগানিস্তান ও কলম্বিয়ার বিভিন্ন সংকটের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

পুরো ২০২০ সালে প্রায় ৩২ লাখ অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ও মাত্র দুই লাখ ৫১ হাজার শরণার্থী নিজ বাড়িতে ফিরতে পেরেছে। এই সংখ্যা ২০১৯ সালের তুলনায় যথাক্রমে ৪০ ও ২১ শতাংশ কম। প্রায় ৩৩ হাজার ৮০০ শরণার্থী তাদের আশ্রয় প্রদানকারী দেশে ‘ন্যাচারালাইজড’ হয়েছে। তৃতীয় কোনো দেশে শরণার্থীদের পুনর্বাসন অনেক কমে গেছে।



সাতদিনের সেরা