kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

মহামারিকালে যৌন সহিংসতা

ভুক্তভোগীদের পাশে কেউ নেই

ফাতিমা তুজ জোহরা   

১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভুক্তভোগীদের পাশে কেউ নেই

করোনাকালে যৌন সহিংসতা, নিপীড়ন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেকোনো সংকটজনক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয় নারী ও শিশুরা। গেল বছর করোনার শুরুর পর থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশেই নারী নিপীড়ন ও সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি তারই প্রমাণ। উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি কিছু সংস্থা কাজ করলেও সরকারের তরফে তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে না।

তাঁরা বলছেন, সরকারের এমন ‘নির্বিকার অবস্থান’ সহিংসতা আরো বাড়িয়ে দেবে এবং অপরাধীরাও পার পেয়ে যাবে। বিচারহীনতা, রাজনৈতিক প্রশয়, ধর্ষণের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, ভিকটিম ব্লেইমিং (ভুক্তভোগীকেই উল্টো দোষারোপ করা) যৌন সহিংসতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে তাঁদের অভিমত।

এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী আজ পালিত হচ্ছে ‘সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা নির্মূল দিবস’।

জাতিসংঘের ভাষ্য মতে, ‘সংঘাত সমপর্কিত যৌন সহিংসতা’ বলতে যে কোনো সংঘাত বা সংকটকালে ধর্ষণ, যৌনদাসত্ব, জোরপূর্বক যৌনকাজ, গর্ভধারণ ও গর্ভপাত এবং জোরপূর্বক বিয়েকে বোঝানো হয়। এ ক্ষেত্রে নারী, পুরুষ, শিশু যে কারো যৌন সহিংসতার শিকার হওয়াকে বোঝায়। একই সঙ্গে যেকোনো সংকটময় অবস্থায় পাচারের ঘটনা এবং পাচারের শিকার নারী-পুরুষ যৌন সহিংসতার মুখে পড়ে।

সংঘাত-সংকটকালে যৌন সহিংসতা অবসানের লক্ষ্যে ২০১৫ সাল থেকে ‘সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা নির্মূলে আন্তর্জাতিক দিবস’টি পালন করা হচ্ছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মহামারিকালে যৌন সহিংসতার শিকার ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো।’ 

একাধিক জরিপে দেখা গেছে, করোনাকালে লকডাউনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিপীড়ন ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, করোনাকালে (২০২০ সালে) ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক হাজার ৬২৭ নারী। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন গত বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে দেশের বিভিন্ন জেলায় টেলিফোন জরিপ চালায়। সেখানে ৯৫২ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে, করোনার প্রথম বছর (২০২০ সালে) লকডাউন চলাকালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এক হাজার ২১৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণ ২২৩টি। এ ছাড়া যৌন নিপীড়ন ও শ্লীলতাহানির শিকার হয় ১০১ জন নারী।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৫ জন। এর মধ্যে ৫৫টি শিশু। ভুক্তভোগী তিন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৫০২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শিশুর প্রতি সহিংসতাও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই পাঁচ মাসে ৫৩৩টি শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে।

নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য গঠিত ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত যৌন হয়রানির শিকার আট হাজার ৪১৫ নারী ও শিশু সেবা নিয়েছে। গত বছর রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ১৯ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

এর আগে ২০১৮ সালে সারা দেশে ৭৩২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বলে আসক জানায়। তাদের হিসাবে এর পরের বছর এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪১৩।

জানতে চাইলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা কবির গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাকালে নারীরা বীভৎসভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এই সংকটকালে যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতা বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

আসকের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, ‘লকডাউনে নারী ও পুরুষ একই ছাদের নিচে থাকতে হয়েছে। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা হ্রাস পেয়েছে। অর্থনৈতিক দুর্দশায় যৌতুকের দাবিতে কিংবা কলহের জেরে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। পাশাপাশি ধর্ষণ বহুগুণে বেড়ে গেছে।’ এর অন্যতম কারণ বিচারে দীর্ঘসূত্রতা বলে মনে করেন তিনি।

নারী অধিকার কর্মী কামরুন নাহার বলেন, ‘মহামারিতে যৌন নির্যাতনের বলি যাঁরা হয়েছেন, আমরা তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই। মানসিকভাবে তাঁরা ট্রমার মধ্যে আছেন।’ তিনি সবাইকে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।



সাতদিনের সেরা