kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

যানজটের ভোগান্তি আর কত দিন

সজিব ঘোষ, ঢাকা ও শরীফ আহমেদ শামীম, গাজীপুর   

১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যানজটের ভোগান্তি আর কত দিন

গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্রতিদিনই তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। যানজটের অসহনীয় ভোগান্তি আর এই ১৩ কিলোমিটার সড়কে সীমাবদ্ধ নেই। মাঝেমধ্যেই যানজট এসে ঠেকছে রাজধানীর মহাখালী পর্যন্ত। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে মহাখালীর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতেও। এ কারণে কখনো কখনো রাজধানীর যানজট ভয়াবহ হচ্ছে।

মূলত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজের কারণে মহাসড়কের এই অংশে যানজটের ভোগান্তির বিষয়টি প্রকল্প কর্তৃপক্ষও স্বীকার করে। কিন্তু এই ভোগান্তি নিরসনে স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগের সীমাবদ্ধতার কথাও তারা বলছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাসড়কের যে যে অংশে বিআরটির কাজ শেষ হয়ে গেছে, সেসব অংশে সড়কের পুরোটি সব ধরনের যানবাহনের জন্য খুলে দিলে সাময়িকভাবে কিছুটা হলেও ভোগান্তি কমতে পারে। এ ছাড়া বিকল্প সড়ক তৈরির কথাও বলছেন তাঁরা।

টঙ্গী থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত মহাসড়কে উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও স্থানীয় সড়কসহ মোট ৩৫টি সড়ক যুক্ত হয়েছে। এই মহাসড়ক  দিয়ে প্রতি মিনিটে অন্তত ১০০ গাড়ি ঢাকায় প্রবেশ করে এবং ঢাকা থেকে বের হয়। সড়কের কোথাও ১০ মিনিটের জন্য এক মুখী গাড়ি আটকে গেলে অন্তত এক হাজার গাড়ি আটকে যায়। কখনো কখনো ২০ মিনিটের গন্তব্যে যেতে ছয়-সাত ঘণ্টা লেগে যায়।

গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে এমন তীব্র যানজটের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক বড় হলেও অর্ধেক অংশই যানবাহন চলাচলের জন্য উপযোগী নয়। বিআরটি প্রকল্পের কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। সড়কের পাশে নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে। ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার উপযুক্ত বিকল্প সড়ক নেই। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত গাড়ির চাপ রয়েছে।

টঙ্গী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত মহাসড়কে নেই বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। নালার পানিও উপচে সড়কে এসে পড়ে।

সম্প্রতি সরেজমিনে টঙ্গী বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের মাঝ বরাবর চলছে বিআরটি-৩ প্রকল্পের ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ। পিলারের জন্য তৈরি বিশাল গর্তে জমে আছে কাদাপানি। আর গর্তের মাটি সড়কে রাখায় ময়মনসিংহ অভিমুখী দুই লেনের মধ্যে একটি লেন বন্ধ হয়ে গেছে। টঙ্গীর মিলগেটের অবস্থাও প্রায় একই। ময়মনসিংহ অভিমুখী দুই লেনের মধ্যে একটি লেন ভেঙে নালার মতো তৈরি হয়ে আছে। জমে থাকা পানি ও গর্তের কারণে যানবাহনগুলো এক লেনে চলাচল করছে। সবচেয়ে বেহাল টঙ্গীর চেরাগ আলী থেকে হোসেন মার্কেট পর্যন্ত অংশ। নির্মাণাধীন চেরাগ আলী ফ্লাইওভারের মালপত্র যত্রতত্র রাখা হয়েছে। এখানেও ফ্লাইওভারের পিলারের মাটি যানবাহন চলাচলের লেনে ফেলা হয়েছে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) আব্দুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর চৌরাস্তা দিয়ে প্রতিদিন কী পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে তার পরিসংখ্যান তৈরির কাজ চলছে। ঢাকা থেকে আসা গাড়ি টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও জয়দেবপুরের দিকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য পরিসংখ্যান তৈরিতে সময় লাগছে। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছোট-বড় মিলিয়ে মিনিটে উভয় দিকে (ঢাকা ও ময়মনসিংহমুখী) ১০০ গাড়ি প্রবেশ করে।’

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, বিআরটি তাদের কাজের পদ্ধতিই বদলে ফেলেছে। এতেই এখন বেশি সমস্যা হচ্ছে। প্রথম দিকে ওই সড়কে যেভাবে কাজ করার কথা ছিল, এখন তা হচ্ছে না। শুধু পিলারই বসিয়ে যাচ্ছে। কাজের কাজ তেমন কিছুই আগাচ্ছে না। আর ট্রাফিক পুলিশের অব্যবস্থাপনা তো আছেই। রাতে টঙ্গী, আব্দুল্লাহপুর ও গাজীপুরের পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে না। রাত ৮টার পর অনেক স্থানে ট্রাফিক পুলিশ না থাকার অভিযোগও আছে। রাতে হাজার হাজার পণ্যবাহী গাড়ি ঢাকায় প্রবেশ করতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যার রেশ সকাল পর্যন্ত থাকে।

রাতে সড়কে ট্রাফিক পুলিশ না থাকা প্রসঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এমনিতেই আমরা জনবল সংকটে আছি। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

বিআরটি-৩ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী এ এস এম ইলিয়াস শাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে এই সড়কে বিআরটির কাজের জন্য কিছু সমস্যা হচ্ছে। সড়ক-মহাসড়ক বিভাগ ও সেতু কর্তৃপক্ষ মিলে কাজটি করছে। আমরা সড়ক-মহাসড়ক বিভাগ টঙ্গী কলেজ থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত কাজ করছি। এখানে রাস্তা এমনিতেই কিছুটা ছোট, বিকল্প পথ করার কোনো সুযোগ নেই। আব্দুল্লাহপুর থেকে টঙ্গী কলেজ গেট পর্যন্ত কাজ করছে সেতু কর্তৃপক্ষ। ওখানে বেশ কিছু গর্ত আছে এটা ঠিক, এতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তারাও সমাধানের চেষ্টা করছে। একটা জায়গা বন্ধ থাকলেই সমস্যাটা হয়, পেছন দিকে সব গাড়ি আটকে যায়।’

সড়ক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে যা অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে সহজেই সমাধান করা যাবে এমন উপায় নেই। তবে এভাবে চললে অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার আপাতত উপায় একটাই, বিআরটি সড়কের যতটুকু অংশে কাজ শেষ করেছে, ততটুকু উন্মুক্ত করে দিতে হবে। পুরো কাজ শেষ করে উন্মুক্ত করার চিন্তা পরে করা যাবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, শুধু বাস নয়, সব ধরনের যানবাহনের জন্যই যেন খুলে দেওয়া হয়। নয়তো আবার ভিন্ন সমস্যা তৈরি হবে। এ ছাড়া যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করে যানবাহন চলাচলের জন্য মূল সড়ক ঠিক করা দরকার। কেননা বিআরটি পুরোপুরি উদ্বোধন হওয়ার পরও মূল সড়কের চাপ খুব একটা কমবে না।’

 

 



সাতদিনের সেরা