kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

অচেনা মাদকের ঝুঁকি নজরদারির অভাবে

এস এম আজাদ   

১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অচেনা মাদকের ঝুঁকি নজরদারির অভাবে

দেশে নতুন ধরনের বা অপ্রচলিত মাদকের ঝুঁকি বাড়ছে। হেরোইন, ফেনসিডিলের পর গত এক যুগে ইয়াবার বাজার তৈরির অপচেষ্টা সফল করেছেন মাদক কারবারিরা। দেশের ট্রানজিট রুটে পাচারের পাশাপাশি অপ্রচলিত আরো কিছু মাদকদ্রব্যের বাজার তৈরির অপচেষ্টা চলছে। এগুলো হলো নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেনসেস (এনপিএস) বা খাত, ভিন্ন রূপের এনপিএস, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), কোকেন, সিউড্রোএফিড্রিন, অ্যামফিটামিন (কাঁচামাল রূপে) ও লাইসার্জিক এসিড ডাই-ইথালামাইড (এলএসডি)। গত দুই বছরে এসব মাদকের বেশ কিছু চালান আটকের পর ভাবনায় পড়েছে প্রশাসন। বিমানবন্দর, স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে তল্লাশির ব্যবস্থা না থাকায় এসব অচেনা মাদকের পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। এই সুযোগে কারবারিরা দেশের বাজারেও বিক্রি করছেন বিভিন্ন মাদক। দেশে তৃতীয় প্রজন্মের এসব মাদকের বাজার তৈরি হলে উৎকণ্ঠা বাড়বে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা বলছেন, অপ্রচলিত এসব মাদক সাধারণ মানুষ, এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরাও চিনে উঠতে পারছেন না।

ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার বলেন, ‘আমরা গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বিমানবন্দরে প্রথম খাতের চালান ধরেছি। এমন আরো কিছু চালান ধরা হয়, যেগুলো অন্য দেশ থেকে এসে আবার আরেক দেশে পাচার হচ্ছিল। আইসের চালান আমরা পেয়েছি। সবশেষ এলএসডির তথ্যও পেয়েছি। এমন অবস্থা থাকলে দেশেও এসব মাদক প্রচলনের আশঙ্কা থাকে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বিমানবন্দরে স্ক্যানার স্থাপন ও ডগ স্কোয়াড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। সেখানে বিভিন্ন এজেন্সি কাজ করে। অনেক বিষয়ে অনুমতির ব্যাপার আছে। কুরিয়ার সার্ভিস নজরদারিতে আনতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

একাধিক সূত্র জানায়, বিমান ও স্থলবন্দরে ড্রাগ ডিটেক্টর বা শনাক্তকরণ মেশিন নেই। কুরিয়ার সার্ভিসেও নজরদারির ব্যবস্থা নেই। প্রাপক ও প্রেরকের ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে মাদক পাচার করা হয়। এ কারণে কুরিয়ারের পার্সেলে পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বন্দরে তল্লাশি মেশিন স্থাপন, ডগ স্কোয়াড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসি।

এসবের মধ্যেই নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে এলএসডি। গত ১৫ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর পর ভয়াবহ ধরনের হ্যালুসিনেশন (সম্মোহন) এবং নিয়ন্ত্রণহীন করা মাদকটি আলোচনায় আসে। তদন্তে তথ্য মিলেছে, অন্তত চার বছর ধরে ইউরোপ থেকে এই মাদক এনে ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রচারণা চালিয়ে বিক্রি চলছে। ১৫টি গ্রুপ আছে, যেখানে অন্তত ৭০০ এলএসডি সেবনকারী যুক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই মহাখালী ডিওএইচএস থেকে প্রথমবার পাঁচ মিলিগ্রাম তরল এলএসডি, ৪৬ ব্লটসহ দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছিল ডিএনসি। এর পরও নজরদারির বাইরে ছিল এলএসডির কারবার।

গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে জিন্সের প্যান্টের চালানে লুকিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাচারের সময় ১২ কেজি ৩২০ গ্রাম অ্যামফিটামিন জব্দ করে ডিএনসি। তদন্তে তথ্য মেলে, সতীশ কুমার তিলভারত নামের এক ভারতীয় নাগরিক কয়েকজন বাংলাদেশিকে নিয়ে ইয়াবাজাতীয় মাদক তৈরির কাঁচামালটি পার্সেলে পাচার করছিলেন। এর আগে ২০১১ সালে বিমানবন্দর দিয়ে সিউড্রোএফিড্রিন পাচারের তথ্য মেলে। এসব কারণে দেশে ওষুধ কম্পানিগুলোকে অনুমতি ছাড়া সিউড্রোএফিড্রিন ও অ্যামফিটামিন আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত বছর ১৫ ডিসেম্বর মিয়ানমারের সেন্ট্রাল কমিটি ফর ড্রাগ অ্যাবিউজ কন্ট্রোল (সিসিডিএসি) এবং বাংলাদেশের ডিএনসির চতুর্থ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে থাইল্যান্ড থেকে অ্যামফিটামিন প্রবেশের কথা স্বীকার করে মিয়ানমার।

২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর জিগাতলায় হাসিব মুয়াম্মার রশিদ নামের এক যুবকের আইস তৈরির ল্যাব পায় ডিএনসি। তদন্তে তথ্য মেলে, গোপন অনলাইন যোগাযোগে (ডার্কনেট) চলছে আইসের কারবার। ওই বছর ২৭ জুন ভাটারা থেকে আজাহ আনাইওচুকোয়া ওনিয়েনসি নামের এক নাইজেরিয়ান নাগরিককে ৫২২ গ্রাম আইসসহ গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। এরই মধ্যে ডিবি পুলিশ আইস বিক্রির তিনটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে। নজরদারিতে তথ্য মিলেছে, মিয়ানমার থেকেও আসছে আইস। গত ৩ মার্চ কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়ার গোলাম নবীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহকে দুই কেজি আইসসহ গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। ২৫ মার্চ  টেকনাফ সদর ইউনিয়নের উত্তর বরইতলী গ্রাম থেকে মোহাম্মদ হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে দুই কেজি আইসসহ গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। র‌্যাব-১৫-এর কর্মকর্তারা বলেছেন, চীন থেকে থাইল্যান্ড হয়ে গ্রিন টির প্যাকেট করে আইস আনেন রশিদ নামের এক কারবারি। সম্প্রতি আরো কয়েকটি চালান উদ্ধার হলে আইস নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়।

২০১৮ সালের ৩১ আগস্ট বিমানবন্দরে দেশের ইতিহাসে প্রথম নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যানসেস (এনপিএস) বা খাত চালান আটক করে ডিএনসি। এরপর ডিএনসি ও পুলিশ ১০টি চালান জব্দ করে। ইথিওপিয়াসহ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে গ্রিন টি নামে আমদানি করে ইউরোপ-আমেরিকায় পাচার করা খাত দেশেও সীমিত পরিসরে ব্যবহারের তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এনপিএস ধরনের এই বিশেষ পাতা ‘মিরা’ নামে চায়ের মতো ব্যবহার করে মাদকসেবীরা। খাত পাতা থেকে প্রক্রিয়াজাত এনপিএস ভিন্ন কৌশলেও সেবন করা হয়। নতুন কোনো চালান ধরা না পড়লেও ভিন্ন কৌশলে এনপিএস ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। 

কয়েক বছর ধরে কোকেনের চালান জব্দের পর তদন্তে দেখা গেছে, আফ্রিকান নাগরিকরা এই মাদক পাচার করছেন। দেশে তাঁরা কিছু কোকেন সেবনও করছেন। এ কারণে মাদকটির ব্যবহার বাড়ার শঙ্কা আছে।

 



সাতদিনের সেরা