kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুচ্ছ উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি  কমাতে গুচ্ছ উদ্যোগ

রাজধানীর বসুন্ধরায় ইডাব্লিউএমজিএল সম্মেলনকক্ষে কালের কণ্ঠ ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে গতকাল আয়োজিত ‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রিত অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানী ঢাকায় ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলেই মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে ৭০ হাজার ভবন। ভূমিকম্পের সময় ভবনের ইউটিলিটি সেবাগুলো যাতে অটো শাটডাউন করা যায় সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ ছাড়া ভূমিকম্পের সংকেত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে দেওয়া যায় সেই চেষ্টাও চলছে। বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকলেও সচেতনতাই রক্ষার উপায়। ভূমিকম্প সহনীয় দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে বাংলাদেশের আরো ৫০ বছর সময় লাগতে পারে। ফলে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর জন্য বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণের তাগাদা বিশেষজ্ঞদের। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় শুধু প্রকল্পভিত্তিক প্রস্তুতি কার্যক্রমে আটকে থাকলে হবে না, সঠিক পরিকল্পনার প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সঙ্গে প্রকল্প-পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠ ও ব্র্যাক যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা  ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরে ভূমিকম্প মোকাবেলায় নানা পরামর্শ দেন।

রাজধানীর বসুন্ধরার ইডাব্লিউএমজিএল সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত বৈঠক সঞ্চালনা করেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও ইডাব্লিউএমজিএল পরিচালক ইমদাদুল হক মিলন। সূচনা বক্তব্য দেন ব্র্যাকের হিউম্যানিটারিয়ান প্রগ্রামের পরিচালক সাজেদুল হাসান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, ‘দেশে বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ জন্য সরকার দেশকে ভূমিকম্প সহনীয় করতে ৫০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। জাপানে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ক্ষতি হয় না। আমরা জাপানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। জাপান বলেছে, ভূমিকম্প সহনীয় দেশ করতে তাদের ৩০ বছর লেগেছে, আমাদের ৫০ বছর লাগবে। এ জন্য জাইকার সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে; তারা বিনা সুদে আর্থিক সহায়তা দেবে।’

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তরিক। করোনার এই দুঃসময়েও ভূমিকম্প মোকাবেলায় সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দিয়েছেন। এই প্রকল্পের জন্য সর্বপ্রথম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করা হবে। দুর্যোগ মোকাবেলায় টাকার কোনো সমস্যা হবে না। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ভবন নির্মাণের সময় আমাদের অবশ্যই বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে। ভূমিকম্পের সংকেত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে দেওয়া যায় সেই চেষ্টাও করা হচ্ছে।’

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমরা মৃদু ভূকম্পন অনূভব করছি। যখনই এসব ছোটখাটো ভূমিকম্প ঘটে তখনই আমাদের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। এরপর অনেক দিন ভূমিকম্প না হলে সেই আতঙ্ক মাথায় থাকে না। এ বিষয়ে আমাদের নিয়মিত সচেতনতামূলক কাজ করা উচিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘যেকোনো দুর্যোগের বিষয়ে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কালের কণ্ঠ বরাবরই এসব বিষয়ে কাজ করে আসছে। ভবিষ্যতেও সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে থাকবে কালের কণ্ঠ।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন বলেন, ‘বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো বিষয়গুলো আমাদের দেশের মানুষ মোকাবেলা করতে শিখেছে। আশা করি ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের বিষয়েও মানুষকে সহজে সচেতন করা সম্ভব। ভূমিকম্প হলে ইউটিলিটি সেবাগুলো যাতে অটো শাটডাউন হয়ে যায় সে ব্যাপারেও সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। একটি ভূমিকম্পের পরদিন থেকেই আরেকটি ভূমিকম্পের জন্য শক্তি সঞ্চয় হতে থাকে। সেই হিসেবে আরেকটি ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছি আমরা। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা শহর বেশি ঝুঁকিতে আছে। সেই তুলনায় কম ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও ঢাকা শহরে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হলেও ব্যাপক ক্ষতি হবে।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘১৭ কোটি মানুষের দেশে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য আমাদের মাত্র ১১ হাজার কর্মী বাহিনী রয়েছে। এ জন্য ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবী তৈরির জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। এ বছর ১৭ হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকা শহরে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৭০ হাজার ভবন ধসে পড়বে। তখন ইউটিলিটি সেবার কী অবস্থা হবে আমরা জানি না। কারণ আমাদের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবস্থা খুবই বিপজ্জনক। এগুলোকে একটা পদ্ধতিতে আনা জরুরি।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া এখনো সম্ভব হয়নি। তবে ভূমিকম্প হওয়ার পরবর্তী তথ্য আমরা সংরক্ষণ ও প্রদান করে থাকি। বর্তমানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরে ১০টি ভূমিকম্প স্টেশন আছে, যেগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এই স্টেশনগুলো থেকে একেবারে সঠিক সময়ে ভূমিকম্পের তরঙ্গ রেকর্ড করা হয়।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘ঝুঁকি শুধু শহরে নয়, গ্রামেও। কারণ গ্রামেও বিল্ডিং হচ্ছে। ফলে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা দরকার। আর ভূমিকম্পের ধারাবাহিক প্রস্তুতি নিতে হবে। সচেতনতার জন্য একটি দিবস ঘোষণা করা যেতে পারে। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন বড় ভূমিকম্প হয়েছিল, সেই দিনকে আমরা সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করতে পারি।’ 

সূচনা বক্তব্যে ব্র্যাকের হিউম্যানিটারিয়ান প্রগ্রামের পরিচালক সাজেদুল হাসান বলেন, ‘সম্প্রতি সিলেটে বারবার ভূমিকম্প হওয়ার পর এ ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির ব্যাপারটি আবার সামনে এসেছে। ১৯৭২ সালে ব্র্যাক সৃষ্টির পর থেকেই বাংলাদেশের যত ধরনের মানবিক কার্যক্রম আছে, সেগুলোর প্রস্তুতিমূলক কাজে ব্র্যাক যুক্ত আছে। এই দুর্যোগগুলোর সময়ে সরকারের সহযোগিতায় আমরা সম্মিলিতভাবে একটি ভালো অবদান রাখতে পেরেছি।’

আলোচনায় আরো অংশ নেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক তাহমীদ মালিক আল হুসাইনী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের রিপ্রডাকটিভ অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. রওশন আরা, ইউএনডিপির সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি খুরশিদ আলম, ইউএন উইমেনের প্রগ্রাম স্পেশালিস্ট দিলরুবা হায়দার, ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবহাওয়াবিদ মমিনুল ইসলাম ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উপপরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন।

 



সাতদিনের সেরা