kalerkantho

শুক্রবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৮। ৬ আগস্ট ২০২১। ২৬ জিলহজ ১৪৪২

বিধি-নিষেধ মানাতে কোথাও কড়াকড়ি কোথাও ঢিলেঢালা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিধি-নিষেধ মানাতে কোথাও কড়াকড়ি কোথাও ঢিলেঢালা

ভারতে প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের অতিসংক্রামক ডেল্টা ধরন নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিধি-নিষেধ জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক স্থানে প্রশাসন যেমন কঠোর অবস্থানে আছে, তেমনি ঢিলেঢালা ভাবও আছে বহু জায়গায়। টিকাসংকটের মধ্যে এই মিশ্র চিত্র ভাবিয়ে তুলেছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। করোনার কালবেলাতেও বেশির ভাগ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনাগ্রহী হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করছে।

বিশেষ লকডাউনের মধ্যে সংক্রমণে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে নোয়াখালীতে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৫৬৯টি নমুনা পরীক্ষা করে শনাক্ত হয়েছে ১৯১ জন (শনাক্তের হার ৩৩.৫৭ শতাংশ)। এই সংখ্যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার। তিনি জানিয়েছেন, এর আগে গত বছরের ৩০ জুন সর্বোচ্চ ১৯৭ জন শনাক্ত হয়েছিল। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক ও জেলা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. খোরশেদ আলমের ভাষ্য, লকডাউন বাস্তবায়নে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা কাজ করছেন। এর পরও কিছু অটোরিকশা চলাচলের চেষ্টা করায় পুলিশ ও প্রশাসন আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।

দুই ডোজ টিকা গ্রহণের পরও নড়াইল পৌর এলাকায় ব্যাংকার, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ অন্তত পাঁচজনের করোনা সংক্রমিত হওয়ার খবর মিলেছে। ২৪ ঘণ্টায় ৯৪টি নমুনা  পরীক্ষায় করোনা ধরা পড়েছে ৩৩ জনের। আক্রান্তের হার ৩৫ শতাংশ। ঝুঁকি বিবেচনায় নড়াইল পৌরসভা ও সদরের দুটি ইউনিয়ন, লোহাগড়া বাজার ও সেখানকার একটি ইউনিয়নে গত ১২ জুন থেকে লকডাউন চলছে।

সাতক্ষীরায় লকডাউনের মধ্যেও লোকজনের চলাচল অনেকটা স্বাভাবিক দেখা গেছে। হাট-বাজারগুলোতে বেশ ভিড় লক্ষণীয়। তবে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও মানুষ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। এদিকে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যায়। এ নিয়ে জেলায় ৫৭ জনের প্রাণ কাড়ল করোনা।

গোপালগঞ্জে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৪৮ জন; প্রাণহানি হয়েছে একজনের। আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলায় শনাক্ত হয়েছে ৩৯ জন আর কাশিয়ানী, টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়ায় তিনজন করে। এদিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার তেলিভিটা ও কালিভিটা গ্রামে করোনা সংক্রমিত ৫০ জনের মধ্যে সাতজনের দেহে ডেল্টা ধরন শনাক্ত হওয়ায় গ্রাম দুটি অবরুদ্ধ করা হয়েছে। বৌলতলী, সাতপাড় ও সাহাপুর ইউনিয়নে সাপ্তাহিক হাট বন্ধ রয়েছে।

সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দিনাজপুর সদর উপজেলায় ঘোষিত সাত দিনের লকডাউনের প্রথম দিন ছিল গতকাল।  এদিন জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে মাঠে দেখা গেলেও ইজি বাইক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন জানান, শহরের প্রবেশমুখগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শহর থেকে কাউকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না যেমন, তেমনি কাউকে প্রবেশও করতে দেওয়া হচ্ছে না।

গতকাল লকডাউন শুরু হয়েছে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায়ও। বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নে দামুড়হুদা উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে। সেই সঙ্গে মাঠে দেখা গেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের। উপজেলার সব প্রবেশপথে কাঠের গুঁড়ি ফেলে ও বাঁশ বেঁধে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে।

যশোরে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বাধিক ২৪৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া মারা গেছে তিনজন। উচ্চ ঝুঁকির কারণে যশোর ও নওয়াপাড়া পৌরসভায় কঠোর বিধি-নিষেধ চলছে। তার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ অসচেতনভাবে চলাচল করছে।

যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজেস্ট্রেট কাজী মো. সায়েমুজ্জামান বলেন, কঠোর বিধি-নিষেধ কার্যকর করতে সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে আরো কঠোরতা আরোপ করা হবে।

সংক্রমণ ঠেকাতে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর ও শার্শা উপজেলায় কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিকেল ৫টার পর সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাসহ ১২ দফা কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইউসুফ আলি জানান, এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন ‘র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন’ পরীক্ষা করা হচ্ছে। অনীহার কারণে সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে টেস্টের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ এপ্রিল থেকে গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত ভারত থেকে পাঁচ হাজার ২৩০ জন পাসপোর্টধারী যাত্রী বাংলাদেশে ফিরেছেন। কভিড পজিটিভ সনদ নিয়ে ভারত থেকে ফিরেছেন ১৩ জন। ফেরত আসা যাত্রীদের মধ্যে ৪৬ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। ছয়জনের শরীরে মিলেছে ডেল্টা ভেরিয়েন্ট।

শেরপুরে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত আছে। গতকাল জেলায় নতুন করে আরো ২৪ জন শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণ বাড়ায় গত ১১ জুন থেকে শেরপুর পৌর এলাকায় দুই সপ্তাহের লকডাউন চলছে। তবে বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নে ঢিলেঢালা ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তা ছাড়া করোনা ধরা পড়লে ঘরবন্দি ও কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কায় উপসর্গ থাকার পরও অনেকে করোনা পরীক্ষা করাচ্ছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে।

বাগেরহাটের মোংলা ইপিজেডে চীনা কর্মীর পর এবার পাঁচ আনসার সদস্যের করোনা শনাক্ত হয়েছে। ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মো. মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বলেন, চীনা নারীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে। আর নতুন করে যে পাঁচ আনসার সদস্যের করোনা শনাক্ত হয়েছে, তাঁদের ইপিজেডের নির্দিষ্ট করোনা ইউনিটে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।

নাটোরে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে চারজনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে দুজন মারা গেছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে, একজন নাটোর সদর হাসপাতালে এবং অপরজন নিজ বাসায়। এ নিয়ে জেলায় মোট ৩৮ জনের প্রাণ কাড়ল করোনা। এদিকে সাত দিনের লকডাউনের শেষ দিনে গতকাল নাটোর শহরে জনসমাগম বেড়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ শাহরিয়াজ বলেন, ‘সাত দিনের লকডাউনে আমরা কিছু সুফল পেয়েছি। তবে প্রত্যাশিত নিয়ন্ত্রণ না আসায় ২২ জুন পর্যন্ত লকডাউন বর্ধিত করা হয়েছে।’

সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁয় গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা প্রাণ কেড়েছে আরো দুজনের। এতে জেলায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৫৪। সিভিল সার্জন ডা. এ বি এম আবু হানিফ জানিয়েছেন, গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত নতুন করে ৭২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

[এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠ’র সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা]



সাতদিনের সেরা