kalerkantho

শুক্রবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৮। ৬ আগস্ট ২০২১। ২৬ জিলহজ ১৪৪২

বঙ্গভ্যাক্স ট্রায়ালে কি আসবে?

আজ-কালের মধ্যে হতে পারে সিদ্ধান্ত

তৌফিক মারুফ   

১৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




বঙ্গভ্যাক্স ট্রায়ালে কি আসবে?

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এ পর্যন্ত বিশ্বে মোট ২০১টি টিকা নিয়ে কাজ চলছে। এর মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে আটটি টিকা। সীমিতভাবে জরুরি ব্যবহারের জন্য আরো আটটি অনুমোদন পেয়েছে বিভিন্ন দেশে। ৩১টি টিকার বড় আকারে বা তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে। ৩৬টির ট্রায়াল চলছে দ্বিতীয় পর্যায়ের। ৫০টি টিকার ট্রায়াল প্রথম পর্যায়ে চলছে। বৈশ্বিক এই টিকার দৌড়ে শুরুর দিকে বাংলাদেশও শামিল হয়েছিল অনেকের চেয়ে আগে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এখনো মূল ট্র্যাকে উঠতে পারছে না; ট্রায়ালের বিষয়টি ঝুলে আছে মাসের পর মাস। প্রথমে এই টিকার নাম হয় ‘ব্যানকভিড’। পরে নাম দেওয়া হয়েছে ‘বঙ্গভ্যাক্স’। আজ বুধবার এই টিকার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত মিলতে পারে বলে জানা গেছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) পক্ষ থেকে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাংলাদেশে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক গত বছরের ২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দিয়েছিল করোনাভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনের উদ্যোগের কথা। তারা প্রাথমিকভাবে ইঁদুরের শরীরে ওই টিকা প্রয়োগে সাফল্যের কথাও জানায়। এরপর পরবর্তী অনেক প্রক্রিয়া ধরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় টিকা আনার আবেদনকারী হিসেবেও নাম লেখায়। সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটিকে প্রস্তাবিত টিকার ট্রায়াল করতে প্রয়োজনীয় নমুনা টিকা উৎপাদনেরও অনুমতি দেয় গত ২৮ ডিসেম্বর। এরপর গত ১৭ জানুয়ারি ১০ হাজার পৃষ্ঠার প্রটোকল পেপার বিএমআরসির কাছে জমা দেয় গ্লোব বায়োটেকের পক্ষে নিয়োজিত একটি গ্রুপ।

কিন্তু তারপর থেকে অন্ধকারে পড়ে আছে বিষয়টি। না মিলছে ট্রায়ালের অনুমোদন, না হচ্ছে বাতিল। যদিও এখনো আশা ছাড়ছে না গ্লোব কর্তৃপক্ষ। তাদের বিশ্বাস, দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাদের টিকা আলোর মুখ দেখবে সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন জার্নালে তাদের টিকার প্রাণিদেহে কার্যকারিতার সাফল্য নিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশ পেয়েছে।

জানতে চাইলে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান মো. হারুন অর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেন আমরা এত দিনেও সিদ্ধান্ত পাচ্ছি না সেটা আমরাও জানি না। আমরা যোগাযোগ করেও তেমন কোনো সাড়া পাচ্ছি না। তবে বিভিন্নভাবে যতটুকু খোঁজ পেয়েছি, সে অনুসারে মনে হয় দ্রুত সময়ের মধ্যেই আমাদের টিকার ট্রায়ালের অনুমোদন পেয়ে যেতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক জার্নালে আমাদের টিকার প্রাথমিক সাফল্য প্রকাশের পর বিভিন্ন দেশ এই টিকা ট্রায়াল করার জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশেই এখনো ট্রায়ালের অনুমোদন পাচ্ছি না, তাই এসব বিষয়ও ঝুলে আছে।’

করোনা মোকাবেলায় সরকার গঠিত কারিগরি পরামর্শক কমিটির সিনিয়র সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে ট্রায়ালের জন্য; দেশীয় প্রতিষ্ঠান বলে সেদিকে নজর রয়েছে সবার। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কোনো একটি সিদ্ধান্ত না দিয়ে মাসের পর মাস বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা সমীচীন হচ্ছে না। বরং মানুষের মধ্যে এ নিয়ে নানা সংশয়, সন্দেহ ও বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কোনোভাবেই একটি ট্রায়ালের সিদ্ধান্ত দিতে এত সময় লাগার কথা নয়, কোথাও লাগেনি। বিএমআরসির উচিত এ বিষয়ে মানুষকে জানানো কেন এতটা দেরি হচ্ছে। ট্রায়াল হলেই তো ফলাফল থেকে বোঝা যাবে এটার সাফল্য-ব্যর্থতা।

গতকাল বিএমআরসির পরিচালক অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাল (আজ) সংশ্লিষ্ট কমিটির একটি বৈঠক হবে। সেখান থেকে বঙ্গভ্যাক্স টিকার ট্রায়ালের বিষয়ে কোনো একটি সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করছি।’

গ্লোব বায়োটেকের গবেষণা বিভাগ সূত্র জানায়, প্রথম গতবছর ২ জুলাই নিজেদের উদ্যোগে করোনার ভ্যাকসিন তৈরির কথা জানান দেয় তারা। তাদের দাবি, গত বছরের মার্চ থেকেই তারা উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেছিল। গ্লোবের চেয়ারম্যান এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছিলেন, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তাঁরা জানুয়ারিতেই করোনার নিরাপদ টিকা উপহার দিতে পারবে দেশ ও বিশ্বকে। তবে পরবর্তী ধাপগুলো প্রত্যাশিত গতিতে আর এগোতে পারেনি। ওই টিকা ট্রায়াল করার জন্য গ্লোব বায়োটেক ও আইসিডিডিআরবির মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তিও হয়েছিল, কিন্তু আইসিডিডিআরবি তেমন কোনো অগ্রগতি দেখাতে না পারায় গ্লোব চুক্তি থেকে সরে আসে।

গ্লোব বায়োটেক সূত্র জানায়, গত ১৫ অক্টোবর ডাব্লিউএইচও গ্লোব বায়োটেকের ডি৬১৪জি ভেরিয়েন্ট এমআরএনএ, ডিএনএ প্লাসমিড এবং এডিনোভাইরাস টাইপ৫ ভেক্টর নামের তিনটি ভ্যাকসিনের নাম আবেদনের তালিকায় তুলেছে। সূত্রটি আরো জানায়, সর্বশেষ গত ১৭ জানুয়ারি ‘বঙ্গভ্যাক্স’ মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য নীতিগত অনুমতি পেতে নিয়ম অনুসারে বিএমআরসির কাছে জমা দেওয়া হয়। ওই সময় গ্লোবের কর্মকর্তা ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এবং সিআরও গ্রুপের বিশেষজ্ঞরাও উপস্থিত ছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উপস্থিত থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল জানান, প্রটোকলের সঙ্গে জমা দেওয়া আবেদনে একই সঙ্গে ওই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের মানবদেহে ট্রায়ালের জন্য নীতিগত অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে শতাধিক মানুষের ওপর এই ট্রায়াল করা হবে। পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। ট্রায়ালে দেশে গবেষকদের একটি সমন্বিত দল কাজ করবে। বিএমআরসি অনুমতি দিলে তার পর ঔষধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদনসাপেক্ষে পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রায়াল শুরু করা যাবে। এ ক্ষেত্রে যাদের কভিড-১৯ নেগেটিভ থাকবে, অন্য কোনো রোগের জটিলতা থাকবে না তাদেরকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাদের বয়স হতে হবে ১৮ বছরের ওপরে।



সাতদিনের সেরা