kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

সাত বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাত বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

সাত বছর ধরে তদন্তই চলছে। আগুন কিভাবে লাগল, কেউ লাগিয়ে দিয়েছিল কি না সেটাই এখনো জানা গেল না। এখনো লোকজন আতঙ্কে থাকে। আগুনে মা-বাবাসহ পরিবারের ৯ জনকে হারিয়ে যে মেয়েটি এতিম হয়ে গেল, সে-ও অপহরণের ভয়ে ক্যাম্প ছেড়েছে। মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা সবাই নিরপরাধ, ক্যাম্পেরই বাসিন্দা। তদন্ত শেষ না হওয়ায় তাদের আদালতে হাজিরা দিয়ে যেতেই হচ্ছে।

২০১৪ সালের ১৪ জুন রাজধানীর পল্লবীর কালশীতে বিহারি ক্যাম্পে সংঘর্ষ ও আগুনের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা এভাবেই তাদের আক্ষেপের কথা বলছিল কালের কণ্ঠকে। সাত বছর আগে এদিন ভোরে কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। পরে পুলিশ আসে। তখন ত্রিপক্ষীয় সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে ক্যাম্পের কয়েকটি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষের সময় গুলিতে নিহত হয় একজন। অন্যদিকে আগুনে পুড়ে মারা যান ইয়াসিন ও তাঁর পরিবারের আটজন। ঘটনার বিষয়ে ওই সময় পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে দুই ধরনের ভাষ্য পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, বিহারিদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে সংঘর্ষ ও আগুনের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছিল, আতশবাজি পোড়ানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে বিহারিদের সংঘর্ষ বাধে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকে বিরোধ ছিল।

ওই ঘটনায় পল্লবী থানায় ছয়টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে একটি মামলা বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা বদরুল, সাব্বির, আজাদ, আরজু, আরিফ ও জুয়েলকে এজাহারভুক্ত করে অজ্ঞাতাপরিচয় প্রায় তিন হাজার জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। মামলাটি এখন অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।

গত শনিবার সরেজমিনে গিয়ে ওই ঘটনা নিয়ে ক্যাম্পের অন্তত ৩০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। তাদের মধ্যে মঈনুদ্দিন হোসেন মুন্না বলেন, ‘এখনো সেই আগুনের ঘটনার সঠিক রহস্য জানতে পারলাম না। বয়স হয়েছে। মৃত্যুর আগে সত্যটা জানতে চাই।’ তিনি বলেন, পরিকল্পিত ওই আগুনে ইয়াসিনের স্ত্রী, তিন ছেলে, তিন মেয়ে, ছেলের গর্ভবতী স্ত্রী মারা যান। ভাগ্যক্রমে বেঁচে আছে এখন ইয়াসিনের ছোট মেয়ে ফারজানা। কিন্তু সে-ও নিরাপদ নয়। ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তিনি বলেন, আগুনে দগ্ধ হয়েও ইয়াসিন কিছুদিন বেঁচে ছিলেন। পরে সুস্থও হন। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যে রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর রহস্যও এখনো অজানা।

ইয়াসিনের মেয়ে ফারজানা (২০) বলেন, ‘এতিম এই মেয়েটিকেও মারতে চায় ওরা। অপহরণের ভয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। ভয়ে ক্যাম্প ছেড়ে এখন খালার বাসায় রয়েছি।’ খুরিশদ আলম নামের অন্য একজন বলেন, ‘আগুন কিভাবে লেগেছিল তা এখনো আমরা জানতে পারিনি। আগুনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদেরই আসামি করা হয়। এখনো আমরা আতঙ্কে আছি।’

কালশী ট্র্যাজেডির সাত বছর উপলক্ষে নিহত বিহারিদের স্মরণে আগামী ১৪ জুন ক্যাম্পের ভেতরেই মানববন্ধন, সমাবেশ ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে বিহারিদের ছাত্রসংগঠন উর্দু স্পিকিং পিপলস ইয়ুথ রিহ্যাবিলিটেশন মুভমেন্ট (ইউএসপিওয়াইআরএম)। ওই সভায় বিহারিদের নিরাপত্তা জোরদার ও কালশীর ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের দাবি জানানো হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মইন উদ্দিন মুন্না। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পে আগুন দিয়ে ঘুমন্ত নিরপরাধ বিহারিদের হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা থাকলেও তাঁদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়নি।’

জানা যায়, পল্লবী থানাধীন ১২ নম্বর সেকশনের ‘ই’ ও ‘ডি’ ব্লকে অবস্থিত আলোচিত কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। ২০১৪ সালে সংঘর্ষ ও আগুনের ঘটনার সময় এই ক্যাম্পের ৭৭৪ পরিবারের জন্য ছিল মাত্র একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার। যদিও এখন তা বেড়েছে। ক্যাম্পের ঠিক পূর্ব পাশে রাজু বস্তির অবস্থান। ওই বস্তিতে ঘর তোলার সময় একটি চক্র ৪০০ পরিবারের কাছ থেকে ২০-২৫ হাজার টাকা করে নিয়েছিল। সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয় কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্প থেকে। বিল বাবদ আদায় করা হতো প্রতি মাসে ঘরপ্রতি ৬০ টাকা করে। এই আর্থিক লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে স্থানীয় কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ঘটনার আগে ১০ জুন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ক্যাম্পের নেতারা আবার বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এ নিয়ে বিহারি ক্যাম্প ও রাজু বস্তির মধ্যে বিরোধ চলছিল।

সাত বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত : কালশীতে বিহারি ক্যাম্পের সংঘর্ষে ১০ জন প্রাণ হারালেও নেপথ্যের কারণ এখনো রয়ে গেছে ‘অজানা’। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি এবং কালশীর বিহারিদের পক্ষ থেকে চারটি মামলাসহ দায়ের করা ছয়টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ওই ঘটনায় করা মামলাটির তদন্ত প্রথমে পল্লবী থানার পুলিশ শুরু করলেও পরে অন্য গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ন্যস্ত হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আ স ম মাহতাব উদ্দিন গতকাল রবিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, মামলাটি শুরুতে থানা পুলিশ তদন্ত করলেও এখন আর থানা পুলিশ তদন্ত করছে না।

এখন কোন সংস্থা মামলাটি তদন্ত করছে জানতে চাইলে ডিসি মাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘আমার জানা নেই।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপকমিশনার মানস কুমার পোদ্দার বলেন, ‘এই মামলার বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। মামলাটি ডিবিতে আছে কি না তা-ও আমার জানা নেই।’

পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির পরিদর্শক নুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলাটি বেশ কিছুদিন আমি তদন্ত করি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাই। কিন্তু এখন আর মামলাটি আমি তদন্ত করছি না। আমি সিআইডি থেকে বদলি হয়েছি। এখন মামলাটি অন্য এক কর্মকর্তা তদন্ত করছেন।’