kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার

নারী ইউএনওর বিকল্প চায় সংসদীয় কমিটি

‘এ ধরনের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য, সংবিধান পরিপন্থী’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নারী ইউএনওর বিকল্প চায় সংসদীয় কমিটি

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী ইউএনওদের বিকল্প খুঁজতে বলেছে সংসদীয় কমিটি। কমিটির বৈঠকে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী চিহ্নিত রাজাকারের সন্তানদের সরকারি চাকরিতে নিষিদ্ধের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শেষে মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া শিশু পার্কের স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।

গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি শাহাজান খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, রাজি উদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর-উত্তম, কাজী ফিরোজ রশীদ, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল ও মোছলেম উদ্দিন আহমদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কমিটি সূত্র জানায়, বৈঠকে কমিটির সভাপতি নিজেই চিহ্নিত রাজাকারের সন্তানদের সরকারি চাকরিতে নিষিদ্ধের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনাকালে কমিটির সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সরকারি চাকরি নিষিদ্ধের বিষয়টি তুলে ধরেন। বিশেষ করে ভিয়েতনামের মতো দেশে যুদ্ধাপরাধীদের তিন প্রজন্ম নিষিদ্ধ সে বিষয়টি উল্লেখ করেন। আলোচনা শেষে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা সংগ্রহ ও চিহ্নিত রাজাকারের পরবর্তী প্রজন্মকে সরকারি চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রে বৈঠকে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণের সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার দিনের বেলায় আয়োজন ও নারী ইউএনওর বিকল্প ব্যক্তি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি শাহাজান খান সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের পরিবারের সদস্যদের সেই দেশে সরকারি চাকরি করার সুযোগ নেই। চিহ্নিত রাজাকারদের বিষয়ে সেই বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘মহিলারা তো জানাজায় থাকতে পারেন না। তাই মহিলা ইউএনও গার্ড অব অনার দিতে গেলে স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। তাই মহিলার বিকল্প একজন পুরুষকে দিয়ে গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। আমরা মন্ত্রণালয়কে এটা পরীক্ষা করে দেখতে বলেছি।’

প্রসঙ্গত, সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা যাওয়ার পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানায় সংশ্লিষ্ট জেলা বা উপজেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে থাকেন। কফিনে সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী কর্মকর্তা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। অনেক স্থানে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দায়িত্বে নারী কর্মকর্তারা রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনার পর গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী ইউএনওদের বিকল্প খুঁজতে বলা হয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া শিশু পার্কের স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে জানিয়ে কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বলেন, সার্কিট হাউসের সামনের যে জায়গাটিতে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, সেখানে জিয়াউর রহমান শিশু পার্ক করা হয়েছে। সেখানে আত্মসমর্পণের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। আমরা বলেছি, সেখানে যে কক্ষটিতে জিয়াউর রহমাকে হত্যা করা হয়েছে, সেটা সংরক্ষিত থাকবে, কিন্তু শিশু পার্কের স্থলে স্মৃতিস্তম্ভ হবে। বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি রাজাকারদের তালিকা প্রকাশের সুপারিশ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

এ ধরনের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য সংবিধান পরিপন্থী

এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিকল্প ব্যক্তি নির্ধারণের সুপারিশে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু গতকাল রাতে এক বিবৃতিতে বলেন, এ ধরনের সুপারিশ স্বাধীন বাংলাদেশে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য, সংবিধান পরিপন্থী, নারীর মানবাধিকার পরিপন্থী ও নারীর ক্ষমতায়ন পরিপন্থী। তাঁরা আরো বলেন, এ ধরনের সুপারিশ একজন নারীর জন্য যেমন অবমাননাকর, ঠিক একইভাবে একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্যও অপমানজনক। কেননা একটি স্বাধীন সার্বভৌম নারী-পুরুষের সমতাপূর্ণ প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্যই মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সংসদীয় কমিটির এ ধরনের সুপারিশ গ্রহণ জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

মহিলা পরিষদ জানায়, বাংলাদেশে নারী ইউএনও বলে কোনো পদ নেই। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানে নারী-পুরুষ বিভাজন সংবিধানবিরোধী।

মহিলা পরিষদ নারীর ক্ষমতায়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে এ ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদী বিভিন্ন অজুহাত প্রতিহত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের এই সুপারিশ বাতিল ঘোষণা করার জোর দাবি জানিয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী ইউএনওর বিকল্প চেয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সুপারিশকে লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মুক্তিযোদ্ধা সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্যরা এমন সুপারিশ করেছেন—এটি বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে।

তিনি বলেন, ওই সুপারিশ যে বা যাঁরাই করে থাকুন, তাঁরা এর মাধ্যমে সংবিধানের বিরোধিতা করেছেন। রাষ্ট্র নারী-পুরুষ কারো প্রতি বৈষম্য করবে না বলা আছে, তাই এর মাধ্যমে তিনিও এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন।