kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

গলদে সংক্রমণ বাড়ছেই

তৌফিক মারুফ   

১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গলদে সংক্রমণ বাড়ছেই

করোনা সংক্রমণের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে দুই সপ্তাহের সময়সীমাকে সূচক ধরে বিবেচনায় নেন বিশেষজ্ঞরা। সেই বিবেচনায় গেল দুই সপ্তাহ এবং তারও আগের দুই সপ্তাহের সংক্রমণ পরিস্থিতির তথ্য-উপাত্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাতে দেখা গেছে, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে শনাক্ত আর মৃত্যু বেড়েছে ১৯ শতাংশ। নমুনা পরীক্ষা কিছুটা বাড়লেও তা সংক্রমণ অনুপাতে অনেকটাই কম, যা ১২ শতাংশ।

অর্থাৎ ১৫ থেকে ২৯ মে পর্যন্ত দুই সপ্তাহে দেশে করোনা পরীক্ষা হয় দুই লাখ ১২ হাজার ৭৭২টি নমুনার। এর মধ্যে ১৭ হাজার ৫৯০ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। ওই দুই সপ্তাহে মারা যায় ৪২৫ জন। তবে ৩০ মে থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত এই দুই সপ্তাহে দুই লাখ ৪১ হাজার ৩০৫টি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে করোনা শনাক্ত হয় ২৭ হাজার ১০০ জনের শরীরে। মারা যায় ৫২২ জন। শুধু তা-ই নয়, দৈনিক শনাক্তের হার এবং সংখ্যাও দুই সপ্তাহের ব্যবধানে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ফলে সংক্রমণের প্রধান তিন সূচকের (শনাক্ত, মৃত্যু ও পরীক্ষা) এমন চিত্র থেকেই দেশে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির প্রমাণ মিলেছে।

বিশেষজ্ঞরাও এসব তথ্যের ওপর চোখ রেখে একবাক্যে বলছেন, আগামী দিনে সংক্রমণের গতি আরো বাড়বে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা সংক্রমণ বিস্তার নিয়ে যতটা জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ঠিক উল্টো হতাশা ও আক্ষেপ করছেন সংক্রমণ ঠেকানোর মতো পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়নে ঢিলেঢালা প্রেক্ষাপট দেখে। সরকার গঠিত কভিড-১৯ মোকাবেলায় জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্যদের কেউ কেউ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনা দেখে আগে থেকেই হতাশার কথা জানিয়েছিলেন। এখন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখে হতাশাগ্রস্ত ওই পরামর্শক সদস্যের সংখ্যা আরো বেড়েছে। কেউ কেউ এখন আর থাকতেই চান না এই কমিটিতে। তবে বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ চান, আগামী ১৬ জুন পর্যন্ত সরকারঘোষিত যে বিধি-নিষেধ আছে তা যেন আরো বাড়ানো হয়। অন্ততপক্ষে ওই বর্ধিত সময়ে যেন এমন ঢিলেঢালা অবস্থা না থাকে। যদিও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক সূত্র এরই মধ্যে কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন, ১৬ জুনের পরও আবার বাড়ছে বিধি-নিষেধ। সে ক্ষেত্রে আবারও কিছু ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ দেখা যেতে পারে। তবে এসব পরামর্শ ও নির্দেশনা বাস্তবায়ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৬ জুন চলতি বিধি-নিষেধের সময় শেষ হওয়ার পর তা আবার বাড়াতে হবে। আর শুধু বাড়ালেই হবে না, সেটা কার্যকর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে হোক আর সারা দেশেই হোক, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিপূর্ণ লকডাউন করা না গেলে পরিপূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যে পরামর্শ দিচ্ছি তা তো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। সব ঢিলেঢালা, আবার মানুষও নিজেরা সুরক্ষামূলক আচরণ করছে না। দুই দিক থেকেই সুরক্ষাব্যবস্থায় মনোযোগী না হলে কাজ হবে না।’

জাতীয় কমিটির আরেক সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘সামনে কিন্তু আমাদের আরো বড় বিপদ আসছে। সমস্যা হচ্ছে, আমরা যে পরামর্শ দেই, সেটা প্রশাসনের জায়গা থেকে কার্যকর করা হচ্ছে না। মানুষের মধ্যেও ব্যাপক মাত্রায় অসচেতনতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী বা বিজিবি নামিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’ ডা. ইকবাল আর্সলান আরো বলেন, ‘সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আমাদের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিভিন্ন মহলের চাপে ওই পরামর্শ সরকার আর কার্যকর করতে পারে না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সদস্য বলেন, কমিটির পরামর্শ যেখানে বাস্তবায়ন করা হয় না, সেখানে থাকা না থাকা সমান কথা। কমিটির অনেকেই এখন সভায়ও অংশ নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন, কেউ কেউ সভায় কোনো পরামর্শও দিতে চান না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি আছেই। এ ক্ষেত্রে আমি বারবার তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছি। এগুলো হচ্ছে, আক্রান্ত প্রত্যেকের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানতে কমিউনিটি লিডার ও মেম্বারদের সম্পৃক্ত করা এবং যত দ্রুত সম্ভব টিকা নিশ্চিত করা।’ তিনি বলেন, শুধু যেখানে সংক্রমণ আছে সেখানে বিধি-নিষেধ কার্যকর করলেই হবে না, ওই জেলা বা এলাকার আশপাশেও একই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে, নয়তো বিস্তার ঠেকানো যাবে না।

জাতীয় কমিটির সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ : গত ৩১ মে ও ১ জুনের জাতীয় কমিটির সভায় করোনা সংক্রমণের সর্বশেষ পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলা হয়, দেশের সার্বিক করোনা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণের উচ্চহার দেখা যাচ্ছে। কমিউনিটি পর্যায়েও ডেল্টা ভেরিয়েন্ট ছড়িয়েছে। ফলে সামনে স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণ হলে চিকিৎসাব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় সংক্রমণ প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই, এতে জনপ্রশাসনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

ওই সভা থেকে সরকারের কাছে সুপারিশে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে জারি করা বিধি-নিষেধ কঠোরভাবে পালন করতে হবে। সঠিকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে, রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে, সব ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জনসমাবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে, পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হবে, সীমান্ত জেলা ও উচ্চ সংক্রমিত এলাকায় অঞ্চলভিত্তিক সম্পূর্ণ লকডাউন দিতে হবে, সীমান্ত জেলাগুলোতে জরুরি সেবায় নিয়োজিত ছাড়া সব মানুষকে বাড়িতে থাকার আদেশ জারির কথাও বলা হয়েছে। উচ্চ সংক্রমিত এলাকা থেকে আন্ত জেলা গণপরিবহন বন্ধ, স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিধি-নিষেধ নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে কঠোর তদারকি জোরদার করার ব্যাপারে মত দেওয়া হয়েছে।



সাতদিনের সেরা