kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

ভূমিকম্প প্রস্তুতিতে ধীরগতি মন্ত্রণালয়ে

বাহরাম খান   

১২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভূমিকম্প প্রস্তুতিতে ধীরগতি মন্ত্রণালয়ে

ভূমিকম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগের সময় জরুরি যন্ত্রপাতি কেনাসংক্রান্ত একটি প্রকল্প গত ৫ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দিয়েছে। একনেকের বৈঠকে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু গত ছয় মাসে প্রকল্পটির অগ্রগতি বলতে শুধু প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্পের মূল কাজ কেনাকাটা করা। নীতিগত পরিবর্তন না হলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দেরি হওয়ার কথা নয়।

‘ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও সচেতনতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি রয়েছে। কিন্তু সিলেটে ভূমিকম্প হওয়ার আগে গত দুই বছরে এই কমিটির কোনো বৈঠকই হয়নি। সিলেটের ঘটনার পর গত ১ জুন কমিটির একটি বৈঠক জুম প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এরও আগে নেপালে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর সেটা মাথায় রেখে দেশে একটি ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার করার জন্য চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। কিন্তু গত ছয় বছরেও সেটা হয়নি।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১২ জুন বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবছরের মতো ভূমিকম্প সচেতনতা দিবস পালন করছে। যদিও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ভূমিকম্প সচেতনতা দিবস পালন করে না। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা সেলিম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেছেন, এবারও এসংক্রান্ত কোনো দিবস পালনের পরিকল্পনা তাঁদের নেই।

‘ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগকালে অনুসন্ধান, উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ (তৃতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। গত ৩০ মে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যুগ্ম সচিব ওয়াহিদুল ইসলামকে। চলতি অর্থবছর প্রায় শেষ। কিন্তু প্রকল্পের মূল কাজ শুরুই হয়নি। এখনো পর্যন্ত প্রকল্পের অফিস নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি। গত শনিবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে প্রকল্পের জন্য যা বরাদ্দ থাকে সে অনুযায়ী উদ্যোগ নেব।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প পরিচালক এখনো অফিস পাননি। অফিস পেলে প্রকল্পটি ভালোভাবে বুঝে-শুনে তারপর সেটির জন্য প্রয়োজনীয় ক্রয় প্রক্রিয়া প্রস্তুত করবেন, যা অনেক সময়সাপেক্ষ। পাঁচ মাসের বেশি সময় লেগে গেল শুধু প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করতেই।

প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য (সচিব) জাকির হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই প্রকল্পে কেনাকাটার বাইরে কোনো কাজ নেই। এত দেরি হওয়ার কারণ দেখছি না, বিষয়টি দুঃখজনক।’

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরাসরি কেনাকাটা (ডিপিএম) পদ্ধতির কথা প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি কেনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রকল্পটিতে কিছু পরিবর্তন আনার চিন্তা চলছে বলে জানা গেছে। এ কারণেই প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগ করতে দেরি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনই আমরা পরিবর্তনের কথা ভাবছি না। কাজ করতে গিয়ে যদি মনে হয় নতুন কিছু করতে হবে তখন দেখা যাবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘ছয় মাস খুব বেশি দেরি নয়। প্রাথমিক কাজ কিন্তু চলছে। পিডি নিয়োগ হয়েছে। এই অর্থবছরে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে টাকা পাওয়া যায়নি। আগামী অর্থবছরে যে টাকা পাওয়া যাবে তা দিয়ে প্রকল্পের কাজ দ্রুতই শুরু করতে পারব আশা করি।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকল্পে কিছু পরিবর্তন হতে পারে। প্রকল্প ব্যয়ের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হলে আমরা নিজেরাই করতে পারব। প্রকল্পের কাজ শুরু হোক তখন এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

সাবেক সচিব জাকির হোসেন আরো বলেন, ‘প্রকল্পটি একনেকে ওঠাতে ব্যাপক কাজ করেছি আমরা। প্রকল্প প্রস্তাব দেখে প্রধানমন্ত্রী খুব উৎসাহ দিয়ে এটি দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। কিন্তু এত দিনে প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগসহ দীর্ঘসূত্রতার কারণ বোধগম্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার যতটুকু মনে পড়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের মাধ্যমে কেনার কথা। তাদের একটি সাপ্লাই চেইন ইউনিট আছে।’

উল্লেখ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার যন্ত্রপতি কেনা হলে সেগুলো ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রগ্রামের (সিপিপি) ভলান্টিয়াররা।

বুয়েটের সঙ্গে যৌথভাবে সরকারের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাড়ে সাত মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়বে। তৈরি হবে সাত কোটি টনের বেশি কনক্রিটের স্তূপ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান সচিব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে খুব অভিজ্ঞ ব্যক্তি। কিন্তু তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ওয়ার্কশপ, সেমিনার, বিভিন্ন ধরনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান ও প্রকাশনা বের করার কাজে বেশি আগ্রহ লক্ষ করছেন তাঁরা। মন্ত্রণালয়ের মৌলিক কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। বিশেষ করে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ প্রস্তুতির জন্য যে মনোযোগ দরকার তা লক্ষ করা যাচ্ছে না।

সিলেটে ভূমিকম্পের পর : দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে ‘ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও সচেতনতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রণীত দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলির (এসওডি) ৩.১.৪ ধারা অনুযায়ী, এই কমিটি প্রতিবছর ‘অন্তত’ দুইবার বৈঠক করবে। প্রয়োজনে আরো বেশি বৈঠকে বাধা নেই। কিন্তু গত দুই বছরে এই কমিটির কোনো বৈঠকই হয়নি। সম্প্রত সিলেটে ভূমিকম্প হওয়ার পর গত ১ জুন কমিটির একটি বৈঠক জুম প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এই বৈঠক সম্পর্কে গণমাধ্যমকে কোনো তথ্য অবহিত করা হয়নি। এসওডিতে কমিটির ‘দায়িত্ব ও কার্যাবলি’র মধ্যে ১৭টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বেশির ভাগই ভূমিকম্প সচেতনতার জন্য সুপারিশ ও পরামর্শ। এসবের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁরা ভবন ব্যবহারের নিয়ম-কানুন প্রতিপালন করার বিষয়টি নজরদারি করবেন। কিন্তু ভূমিকম্প সচেতনতায় এ ধরনের অভিযান চালানো হয় না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির বৈঠকই ঠিকমতো হয় না। সেখানে অন্যদের কিভাবে পরামর্শ ও সুপারিশ করবে তারা। উচ্চপর্যায়ের এই কমিটিতে ২৫ জন সচিবসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার ৮৫ জন সদস্য আছেন।

কমিটির সদস্যসচিব ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা) রঞ্জিৎ কুমার সেন কালের কণ্ঠকে জানান, দেশে একের পর এক দুর্যোগের কারণে বৈঠক হয়নি। কমিটির আকার অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা থাকায় বৈঠক অনুষ্ঠানে সমস্যা হয়েছে। এবার জুম প্ল্যাটফর্মের কারণে তাঁরা সহজে বৈঠক করতে পেরেছেন।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সাবেক একজন মহাপরিচালক কালের কণ্ঠকে বলেন, ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের বিষয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সময় দিয়ে বৈঠক করতে পারেন। কিন্তু আমলারা সেই সময় পান না। মন্ত্রণালয় নিজে ভূমিকম্প প্রস্তুতির গুরুত্ব কতটুকু দেয় এটা থেকেই বোঝা যায়।

অর্ধযুগেও হয়নি ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিষদ রয়েছে। নেপালের ভূমিকম্পের পর ২০১৫ সালের ৫ মে সরকারপ্রধানের সভাপতিত্বে পরিষদের একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে অন্যান্য সিদ্ধান্তের সঙ্গে রিখটার স্কেলে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহায়ক ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। ওই বছরের ২ জুলাই ইমার্জেন্সি সেন্টারের বিষয়ে গঠিত একটি কমিটির প্রধান ছিলেন দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব মো. মোহসীন, যিনি এখন এই মন্ত্রণালয়ের সচিব। কিন্তু ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের অবয়ব দৃশ্যমান হওয়া তো দূরের কথা, জায়গা পাওয়ার ঝামেলাই শেষ হয়নি। ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারটি চীন সরকার করে দেবে বলে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছিল, সেটার মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

কাজের ধীরগতির বিষয়ে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহসীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেন্টারটি তেজগাঁওয়ে হবে। কিছুদিনের মধ্যেই জায়গা পেয়ে যাব। চীনের সঙ্গে এমওইউ শেষ হলেও তাদের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করেছি। নতুনভাবে তারা এমওইউ স্বাক্ষর করতে রাজি হয়েছে। আশা করি চীনের মাধ্যমে এটা হবে।’



সাতদিনের সেরা