kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

পূর্ণাঙ্গ লকডাউনে রাজশাহী

সীমান্তবর্তী জেলাগুলো আরো খারাপের দিকে

দৈনিক শনাক্তের হার ২৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত, বাড়ছে মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সীমান্তবর্তী জেলাগুলো আরো খারাপের দিকে

সীমান্তবর্তী বেশির ভাগ এলাকায়ই এখন দৈনিক করোনা শনাক্তের হার ২৫ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে। স্থানীয়ভাবে সর্বাত্মক লকডাউন বা বিধি-নিষেধ আরোপ করা হলেও তা পরিপূর্ণভাবে পালন করা হচ্ছে না ঝুঁকিপূর্ণ অনেক এলাকায়ই। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বৈধ জরুরি যাতায়াতের পাশাপাশি প্রতিদিনই বিভিন্ন সীমান্তসংলগ্ন এলাকার মানুষের অবৈধ যাতায়াত চলছে। চলছে চোরাকারবারও। এর সঙ্গে আসন্ন কোরবানির ঈদের জন্য গরু বাণিজ্য বাড়তি ঝুঁকি বয়ে আনছে, যদিও প্রশাসন গত কয়েক দিনে শতাধিক চোরাকারবারিকে আটক করেছে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে। এসব এলাকায় ভারতীয় বা ডেল্টা ভেরিয়েন্টের বেশি বিস্তার ঘটছে বলে আগেই জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে। এখন ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও কমবেশি ডেল্টা ভেরিয়েন্টের বিস্তার ঘটেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরাও। এর মধ্যেই প্রতিদিন শনাক্ত ও মৃত্যুও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বেশি থাকছে।

করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকাতে আজ শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে আগামী বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) পর্যন্ত রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহী সার্কিট হাউসে প্রশাসনের উদ্যোগে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে লকডাউনের ঘোষণা দেন বিভাগীয় কমিশনার হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, লকডাউনের সময় সব দোকান ও যান চলাচল বন্ধ থাকবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁ থেকে কোনো যানবাহন ঢুকতে পারবে না। রাজশাহী থেকেও কোনো যানবাহন জেলার বাইরে যাবে না। তবে রোগী ও অন্য জরুরি সেবাদানকারীর ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। এদিকে করোনার সংক্রমণ বাড়ায় শুক্রবার মধ্যরাত থেকে রাজশাহীর সঙ্গে সব রুটের যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত রাতে রেলপথ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গতকাল সকাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দিন এই হাসপাতালে মারা যায় আটজন। তার আগের দিন সাতজন। গত ৪ জুন ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যা করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পরে সর্বোচ্চ। রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস বলেন, শেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত ১২ জনের মধ্যে সাতজনের করোনা পজিটিভ ছিল। অন্য পাঁচজন মারা গেছে উপসর্গ নিয়ে। পজিটিভ হয়ে মৃতদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি রাজশাহী। দুজনের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

যশোর ও নওয়াপাড়া পৌর এলাকায় সাত দিনের কঠোর বিধি-নিষেধের আওতায় যশোর পৌর এলাকায় ১৩টি ফিডার রোড বন্ধ রাখা হয়েছে।

যশোর শহরে ১০টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। সাতজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে এসব চেকপোস্ট এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্বে প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। যশোরে বেড়েই চলেছে করোনা শনাক্তের হার। গত ২৪ ঘণ্টায় এ জেলায় ২০০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ছিল ৫৮ শতাংশ। তা আগের দিন ছিল ৪৯ শতাংশ।

লকডাউন চলাকালেও সাতক্ষীরায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আগের ঘোষিত লকডাউনের সঙ্গে আরো এক সপ্তাহ অর্থাৎ ১৭ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। জেলা করোনা কমিটির আহ্বায়ক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস এম মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাতক্ষীরায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরো চারজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলায় সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ৫০.৫৩ শতাংশ। সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ যাতায়াতের সময় ১৩ দিনে ৪৮ জনকে আটক করা হয়েছে।

মোংলায় দুই সপ্তাহ ধরে শনাক্তের হার ৫০ থেকে ৭০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। গতকাল ৫১ জনের মধ্যে ২৬ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে, শনাক্তের হার ৫১ শতাংশ। বুধবার ৩৪ জনের মধ্যে ২৩ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়, শনাক্তের হার প্রায় ৬৮ শতাংশ। গত মঙ্গলবার এ শনাক্তের হার ছিল ৬১ শতাংশ। এর আগে সোমবার ৫৪ শতাংশ এবং রবিবার ছিল ৫৩ শতাংশ। এর আগে ৪ জুন ৪৮ জনের মধ্যে ৩৪ জন করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়, শনাক্তের হার সর্বোচ্চ ছিল ৭১ শতাংশ। করোনার হার এভাবে বাড়তে থাকায় গতকাল থেকে চলমান লকডাউনের সময়সীমা আরো এক সপ্তাহ অর্থাৎ ১৬ জুন পর্যন্ত বাড়িয়েছে প্রশাসন।

নাটোরের দুটি পৌরসভার সর্বাত্মক লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে ৬২ জন করোনায় আক্রান্ত এবং করোনা নিয়ে ঢাকায় একজন, করোনা উপসর্গে নাটোর হাসপাতালে আরেকজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৬২ জনের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়। আক্রান্তের হার ৩২ শতাংশ।

মেহেরপুরে অবাধে কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে এ দেশের সীমানায় ক্ষেত-খামারে কাজ করতে আসছে ভারতীয় মানুষজন। মেহেরপুর সিভিল সার্জন নাসির উদ্দীন জানান, যারা করোনায় আক্রান্ত, তাদের মধ্যে ভারতীয় ভেরিয়েন্ট আছে কি না, তা পরীক্ষার জন্য আইইডিসিআর চাইলে নমুনা দেওয়া হবে।

নীলফামারী জেলা থেকেও অনেক এলাকায় অবাধে যাতায়াতের সুযোগে করোনার ভারতীয় ভেরিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ৫৬ বিজিবির নীলফামারী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি কিছু অ্যাডিশনাল কাজ করছি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে জনগণকে সচেতন করতে ঘন ঘন সভা করা হচ্ছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্যতম গরুর হাট কসবার বায়েকের হাটটি। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবারের মতো গতকালও বসে এই হাট। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এখানে ভারতীয় গরু আগের তুলনায় বেশি উঠছে। বায়েক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল-মামুন ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ভারতীয়রা গরু নিয়ে এলে বা গরু আনতে বাংলাদেশিরা সেখানে গেলে এর মাধ্যমে করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।

আখাউড়ার ইউএনও মোহাম্মদ নূর-এ আলম জানান, কভিড নেগেটিভ সনদ নিয়েই ভারত থেকে ফিরছে যাত্রীরা। তার পরও আসার সময় বাংলাদেশে প্রবেশের মুহূর্তে তাদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাদের রিপোর্ট পজিটিভ আসছে তাদের আইসোলেশনে পাঠানো হচ্ছে।

নওগাঁ জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৯৪ জন। শনাক্তের হার প্রায় ২৫.২৬ শতাংশ।

চুয়াডাঙ্গায় সীমান্ত এলাকা পেরিয়ে রোগী বাড়ছে সদর ও জীবননগর উপজেলায়। পুরো জেলা হয়ে উঠেছে করোনার জন্য ভীতিকর। তার পরও স্বাস্থ্যবিধি মানছে না বেশির ভাগ মানুষ। করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সীমান্ত এলাকার ১৬টি গ্রামে চলাচলে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হলেও করোনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। গত সাত দিনে জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৪১ জন। জেলার দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তবর্তী কার্পাশডাঙ্গা, কুড়ুলগাছি ও পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের পর এবার দামুড়হুদা সদর ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়েছে কভিড-১৯। দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবু হেনা মোহাম্মদ জামাল শুভ জানান, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এই সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। সিভিল সার্জন এ এস এম মারুফ হাসান বলেন, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৩৭ জন, যা শতকরা হিসাবে ৪৬.২৫। জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, সীমান্তবর্তী ১৬টি গ্রামে চলাচলে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যারা স্বাস্থ্যবিধি মানছে না তাদের ব্যাপারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলার জীবননগর উপজেলায়ও সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় ভারতীয় নাগরিকের জমি কাঁটাতারের বেড়ার এপারে রয়েছে, তারা চার ঘণ্টার চুক্তিতে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে এপারে আসতে পারে। এই সুযোগ থাকলেও করোনা সংক্রমণের কারণে এক মাস ধরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে জেলার পাটগ্রামে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে ভারত থেকে গরু-ছাগল, প্রসাধনী, কাপড়সহ চা পাতা পাচার হয়ে আসছে।

পঞ্চগড়ের সীমান্তগুলোতে আবারও সরব হয়ে উঠেছে চোরাকারবারিরা। যদিও সীমান্ত এলাকাগুলোতে জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি নজরদারি বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।

সিলেট জেলায় করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। চলতি জুন মাসের প্রথম ১০ দিনে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে ২১ জন মারা গেছে। এই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ৫৯৫ জন। জেলায় এ পর্যন্ত করোনায় ৩৯৪ জন মারা গেছে, যা সিলেট বিভাগের মোট মৃত্যুর ৮১ শতাংশের বেশি। একইভাবে বিভাগের মোট শনাক্তের ৬৫ শতাংশের বেশি সিলেট জেলার বাসিন্দা। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, বিয়ানীবাজার ও জকিগঞ্জ উপজেলাকে ঘিরে রয়েছে ভারতীয় সীমান্ত। এসব সীমান্ত দিয়ে লোক চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। গত রবিবার ভারতে ফিরে আসার পথে চারজনকে আটক করে কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ। পরে তাদের জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নোয়াখালীতে করোনার প্রকোপ বাড়ায় এর আগে দেওয়া জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ ছয়টি ইউনিয়নে চলমান লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। গতকাল বিকেলে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ও সিলেট এবং যশোর, নাটোর, নওগাঁ, পঞ্চগড়, নীলফামারী, নোয়াখালী, লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা ও দামুড়হুদা, মোংলা, পাটগ্রাম, জীবননগর, হাতীবান্ধা, ধামইরহাট প্রতিনিধি।]