kalerkantho

সোমবার । ১১ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৬ জুলাই ২০২১। ১৫ জিলহজ ১৪৪২

বর্ষার আগেই ভাসল চট্টলা

► ঝরল ৯৮.৪ মিলিমিটার বৃষ্টি আজও হতে পারে ভারি বর্ষণ
► চার মেগাপ্রকল্পের সুফল কবে মিলবে জানে না কেউ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বর্ষার আগেই ভাসল চট্টলা

বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলা। শুধু এই হাসপাতালই নয়, গোটা নগরীর চিত্রই ছিল এমন। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

আকাশজুড়ে কালো মেঘের বিচ্ছুরণ। গোমড়া আকাশের বাগড়ায় ফুটছিল না ভোরের আলো। সকাল ৯টা বাজতেই মেঘের রাগ ঝরল জল হয়ে। মুষলধারার বৃষ্টিতে মুহূর্তেই ডুবল দেশের ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ চট্টগ্রাম। এর পরের গল্পটা চেনা নিয়মেই। জলজট আর যানজটে নাকাল চট্টলাবাসী। বৃষ্টি যখন থামল তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। তখনো নগরীর নিম্নাঞ্চল পানিতে থইথই। কোথাও গলাপানি, আবার কোথাও কোমরপানি। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৯৮.৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। ভারি বর্ষণের ধারা আজ সোমবারও অব্যাহত থাকতে পারে। আজও নগরী জলমগ্ন থাকার শঙ্কা রয়েছে।

আজ বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ভারি বর্ষণের সতর্কবার্তা জারি করে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এ সময় রয়েছে পাহাড়ধসের শঙ্কাও। এ কারণে প্রশাসনকে সর্বাত্মক সতর্ক থাকতে হচ্ছে, যদিও গতকাল দুপুর থেকেই চট্টগ্রামের প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের অবৈধ বসতঘরের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে।

গতকাল সকালে জলজট তৈরিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে কর্ণফুলী নদীর জোয়ার। ভর জোয়ারের সময় ভারি বর্ষণ শুরু হলে নগরী থেকে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এরপর দ্রুতই নগরীতে বাড়তে থাকে জলজট। এই জলজটের কারণে পথচারীদের দুর্ভোগ বাড়ে বহুগুণ। কোথাও কোথাও গাড়ি চলাচল করেছে হেডলাইড জ্বালিয়ে। কিছু গাড়ি আটকে যায় পানিতে। এমন দুর্ভোগের পথ পাড়ি দিয়ে কর্মজীবীদের পৌঁছাতে হয়েছে কর্মস্থলে। বিকেলেও একইভাবে দুর্ভোগকে সঙ্গী করে ফিরতে হয়েছে বাসায়।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. শহীদুল ইসলাম বলেন, কর্ণফুলী নদীর জোয়ার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় ৪.৫ ফুট বেশি উচ্চতায় ছিল। বর্ষার আগমুহূর্তে এমন ভারী বর্ষণকে স্বাভাবিক মনে করছেন না এই আবহাওয়াবিদ। তিনি বলেন, ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস স্বাভাবিক বৃষ্টির ইঙ্গিত বহন করে না। তাই জুনে স্বাভাবিক বৃষ্টি এটা নয়। এমন বৃষ্টি সোমবারও স্থায়ী হতে পারে। মঙ্গলবার থেকে পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে।

বৃষ্টির পর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে বসতি সরিয়ে নেওয়া শুরু : ভারী বর্ষণ শুরুর পরপরই প্রাণহানি এড়াতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে গড়ে ওঠা বসতঘরের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে। গতকাল দুপুর থেকে মহানগরীর লালখানবাজার, মতিঝর্ণা, বাটালিহিল, টাংকির পাড় এলাকা থেকে দুই শতাধিক লোককে সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া ফিরোজশাহ পাহাড় থেকে ১২ পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

লোকজন সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ছয়জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান পরিচালনা করেছেন। ১০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এদিকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন অভিযোগ করেছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সমন্বয়হীনতার কারণে ক্রমান্বয়ে চট্টগ্রাম নগরী ভারসাম্যহীন হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রামে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে এসব উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আরো দুর্ভোগ তৈরি করছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে চলমান খালগুলোতে বাঁধ দেওয়ায় চট্টগ্রাম বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।

মেগাপ্রকল্পের সুফলের অপেক্ষায় নগরবাসী : বৃষ্টি হলেই নগরের প্রধান সড়কের ষোলশহর (২ নম্বর গেট) থেকে বহদ্দারহাট প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন উপসড়ক পানির নিচে থাকে। এই এলাকায় বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা থাকায় প্রায় সাত বছর আগে বহদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত ২.৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৬৫ ফুট প্রস্থ নতুন একটি খাল খননের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে (চসিক) প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল সরকার। এরই মধ্যে এ প্রকল্পটির ব্যয় দুই দফা সংশোধিত হয়ে এখন এক হাজার ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে সরকার চসিককে ৯১৪ কোটি টাকা ছাড়ও দিয়েছে। কিন্তু এখনো নতুন খালটির খননকাজ শুরুই হয়নি।

এ কারণে গতকালের বৃষ্টিতে প্রধান ওই সড়কসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। জলাবদ্ধতা থেকে মিলছে না মুক্তি। শুধু ওই প্রকল্পও নয়, কয়েক বছরে বাণিজ্যিক রাজধানীকে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে সরকার আরো তিনটি মেগাপ্রকল্পে অর্থ বরাদ্দও দিয়েছে। সব মিলে বর্তমান সরকারের আমলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চসিক, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) চারটি মেগাপ্রকল্পের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এর মধ্যে চসিকের প্রকল্পটির মূল কাজ শুরুই হয়নি। নতুন খাল খনন প্রকল্পটি এখনো ভূমি অধিগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। সিডিএ দুটি প্রকল্পের মধ্যে একটি ৪৬ থেকে ৪৭ শতাংশ এবং আরেকটি ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ; পাউবো প্রকল্পটির ৮ থেকে ১০ শতাংশ অগ্রগতি। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে নগরের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পগুলোর কাজ কখন, কবে শেষ হবে তা নিশ্চিত করে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলতে পারছেন না।

কয়েক বছর ধরে প্রতি বর্ষা মৌসুম কিংবা জোয়ারের পানি অথবা অনাবৃষ্টি-অতিবৃষ্টি হলে নগরের অনেক এলাকা তলিয়ে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা তিন-চার বছর ধরে জলাবদ্ধতা হলে তাঁরা বলে আসছেন, আগামী বছর থেকে সুফল পাওয়া যাবে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতে, প্রকল্পগুলোতে এরই মধ্যে যে কাজ শেষ হয়েছে তারও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বাস্তবায়ন সংস্থাগুলো একে অন্যের মধ্যে প্রকল্প কাজে সমন্বয়হীনতা এখনো দৃশ্যমান।

অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এসব মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় না হওয়ার প্রকল্প কাজে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। এসব কারণে কবে নাগাদ জলাবদ্ধতা ও জোয়ারের পানি সমস্যা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাবে, তা কেউ বলতে পারছে না।

তিন দিন আগে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘নগরের বিভিন্ন খালে অস্থায়ী বাঁধ যেখানে আছে, সেখানে পানির প্রবাহ বিঘ্ন ঘটছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে সব বাঁধ অপসারণ করতে হবে। তা না হলে চট্টগ্রাম শহর একগলা পানিতে ডুববে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নতুন খাল খনন কবে শুরু হবে জানতে চাইলে ওই প্রকল্পের পরিচালক ও করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনো আমরা প্রকল্প কাজের জায়গা বুঝে পাইনি। সরকার এই প্রকল্পের নির্ধারিত ৭৫ শতাংশ টাকা (৯১৪ কোটি টাকা) দিয়েছে। এই টাকা আমরা ভূমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসনকে দিয়েছি। অধিগ্রহণ করে জায়গা বুঝিয়ে দিলে আমরা এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের মূল কাজ (খনন) শেষ করতে পারব।’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক রাজীব দাশ বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পের অধীনে ১২টি রেগুলেটরের কাজ চলমান আছে। আশা করছি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে স্লুইস গেটগুলোর কাজ শেষ হবে। আগামী বর্ষায় এর সুফল পাওয়া যাবে। আমাদের প্রকল্পের প্রায় ৪৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।’

এক হাজার ৬২০ কোটি টাকা ব্যয়ে অন্য একটি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটি একনেক থেকে অনুমোদন হওয়ার পর গত বছরের অক্টোবরে কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে কাজের অগ্রগতি প্রায় ১০ শতাংশ। জানা যায়, এই প্রকল্পে অর্থ ছাড় কম হওয়ায় কাজের অগ্রগতি কম হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

ওই প্রকল্পের পরিচালক ও পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী ত্রয়ন ত্রিপুরা বলেন, ‘এক হাজার ৬২০ কোটি টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত আমরা সাড়ে ২৬ কোটি টাকা পেয়েছি। চলতি অর্থবছরে এ প্রকল্পে আরো ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ বেশি হলে কাজের অগ্রগতি আরো বেশি হবে। তবে কাজ বন্ধ নেই। চলমান আছে।’ 

 



সাতদিনের সেরা