kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

গণপরিবহন যেখানে নারীর আতঙ্ক

ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে গণপরিবহন সিসিটিভির আওতায় আনার পরামর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও সাভার (ঢাকা)   

৩১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




গণপরিবহন যেখানে নারীর আতঙ্ক

আবার চলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটল। গত শুক্রবার মানিকগঞ্জে বোনের বাসা থেকে নারায়ণগঞ্জ ফেরার পথে ঢাকার উপকণ্ঠে আশুলিয়ায় চলন্ত বাসে পোশাক শ্রমিক এক তরুণী (২২) দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি আবারও জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য মতে, গত চার বছরে সারা দেশে বাসে ৫১ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই সময়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন কয়েক শ নারী। আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক হিসাবে, ২০১৮-১৯ সালের ১৪ মাসে গণপরিবহনে অন্তত ৩২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তবে সামাজিক সম্মানহানির ভয়সহ হয়রানি এড়াতে অনেকেই অভিযোগ করেন না। তাই প্রকৃত ঘটনা আরো বেশি হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অ্যাকশনএইডের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪৯ শতাংশ নারী গণপরিবহনে এবং ৪৮ শতাংশ গণসেবা গ্রহণে অনিরাপদ বোধ করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে পরে আর এ ধরনের অপরাধ করতে কেউ সাহস না পায়। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম মনে করে, এ ধরনের অপরাধ রোধে বাসের ভেতরে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) স্থাপন করা দরকার। 

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সর্দার শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই বছরে এই এলাকায় বাসে দুটি ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ পেয়েছেন। দুটি ঘটনার পরপরই দ্রুততার সঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক (কমান্ডার) খন্দকার আল মঈনও প্রায় একই দাবি করেন। তিনি বলেন, শুধু এই ঘটনাই নয়, আশুলিয়াসহ ওই এলাকায় যেকোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলে র্যাব দ্রুত সেখানে ছুটে যায়।

যেভাবে অনিরাপদ আশুলিয়া

ঢাকা জেলা পুলিশ সূত্র বলছে, আশুলিয়া অনেকটা ঢাকার গেটওয়ে। বিভিন্ন রুটের বাস এই রুট দিয়ে চলাচল করে। মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের জেলায় স্বল্প দূরত্বের নিয়মিত গণপরিবহন চলে। দূরপাল্লার বহু বাসও এখান দিয়ে চলাচল করে। আর আশুলিয়া এলাকায় অনেক গার্মেন্ট কারখানার পাশাপাশি অন্যান্য অনেক কারখানা রয়েছে। ফলে এলাকাটিতে রাতেও যাত্রীর চাপ থাকে। এসব বিবেচনায় বিশেষ করে রাতের কথা বিবেচনা করে ২৫টি পুলিশের টহল টিমে শতাধিক পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। সেই সঙ্গে র্যাবেরও টহল রয়েছে এলাকায়।

এই রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী কয়েকজন পোশাকশ্রমিক নারীর সঙ্গে গতকাল শনিবার কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা বলেন, বাসে তাঁদের নানাভাবে যৌন হয়রানি করা হয়। রাতে পরিস্থিতি হয় আরেকটু লাগামছাড়া। ওঠার সময় হেলপাররা এমনভাবে দাঁড়াবেন বা সহায়তা করার নামে এমনভাবে হাত বাড়াবেন, যাতে তাঁরা কুঁকড়ে যান। কখনো কখনো সরাসরি গায়ে হাত দেওয়া হয়। লোকলজ্জার ভয়ে অভিযোগ করেন না বলে জানান ওই নারীরা।

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, সাভার-আশুলিয়া মহাসড়কসহ বিভিন্ন অলিগলি সন্ধ্যার পর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। ফলে এই সময় নারী শ্রমিকরা কারখানা থেকে বাসায় ফেরার পথে নানাভাবে হয়রানির শিকার হন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা জড়িত।

থানা পুলিশ ও শিল্প পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণে এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে অভিযোগ করে তিনি আরো বলেন, এর প্রতিকার করতে হলে মহাসড়কসহ অলিগলিতে লাইটের ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশের টহল বাড়াতে হবে। কারখানার আশপাশে কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে লাইটের ব্যবস্থা করতে পারে।

পুলিশ ও র্যাব সূত্র মতে, আশুলিয়া ও সাভার এলাকাকেন্দ্রিক বিশাল একটি অপরাধীচক্র রয়েছে। তাঁদের অনেকেই পরিবহন শ্রমিক। আবার অনেকে ভাসমান অবস্থায় ঘুরে বেড়িয়ে অপরাধ করেন।  

পুলিশ বলছে, তাঁরা এ বিষয়ে প্রায়ই পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বাসে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রথমেই বাস মালিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে বলে মনে করে পুলিশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সামিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ গতকাল রবিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, “এ ধরনের অপরাধ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে।”

মালিক সমিতির পক্ষ থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এমন প্রশ্নে তিনি আরো বলেন, ‘দেখুন বাস মালিকরা তো এ ধরনের কাজে জড়িত নয়। কিছু পরিবহন শ্রমিক জড়িত। আমরা বিভিন্ন সময়ে পরিবহন শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে কঠোরভাবে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। যাঁরা এ ধরনের কাজে জড়াবেন তাঁদের ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে তুলে দিতে বলেছি।’ প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে হলেও এ ধরনের অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।