kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

কারাগারে রোজিনা, রিমান্ড নামঞ্জুর

স্বাস্থ্যের সংবাদ সম্মেলন বর্জন, বিভিন্ন মহলের নিন্দা প্রতিবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কারাগারে রোজিনা, রিমান্ড নামঞ্জুর

সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের ছবি তুলে চুরির অভিযোগে করা মামলায় প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসীমের আদালত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার জামিন শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন আদালত।

এদিকে গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ডাকা সংবাদ সম্মেলন বয়কট করে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ)। রোজিনার নিঃশর্ত মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং লাঞ্ছিত করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবিতে আজ বুধবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছে বিএসআরএফ। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) একই কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। সাংবাদিক নেতা ও বিশিষ্ট নাগরিকরা রোজিনার মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন। গতকাল ঢাকা ও বিভিন্ন জেলায় সমাবেশ ও মানববন্ধন করা হয়েছে।

অন্যদিকে গতকাল দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলানগরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিষয়টি অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে। পরে বিকেলে একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে তিন কর্মদিবসে প্রতিবেদন দিতে বলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। 

গতকাল বিকেলে সাংবাদিক রোজিনাকে প্রিজন ভ্যানে করে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া হয়। এর আগে সকালে আদালত চত্বরে রোজিনার স্বামী মনিরুল ইসলাম মিঠু বলেন, ‘তাকে (রোজিনা) নির্যাতন করা হয়েছে, অ্যাসল্ট করা হয়েছে, গলা টিপে ধরা হয়েছে। জোর করে তার মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁদের নামে মামলা করব।’

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বিএসআরএফ সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ বয়কটের ঘোষণা দিলে সাংবাদিকরা বেরিয়ে যান। পরে এক জরুরি সভা শেষে রোজিনার মুক্তি না হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলন বর্জন এবং আজ প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, ডিআরইউ চত্বর, শাহবাগ ও কারওয়ান বাজারে সমাবেশ-মানববন্ধন করেছেন সাংবাদিকরা। দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে দেখা করে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন ও সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান রোজিনাকে নির্যাতনকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। গতকাল আলাদা বিবৃতিতে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে রোজিনার মুক্তি দাবি করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, শরীয়তপুর সাংবাদিক সমিতি ঢাকা,  রিপোর্টার্স এগেইনস্ট করাপশন (র‌্যাক), অ্যাটমিক রিপোর্টার্স বাংলাদেশ, সিলেট বিভাগ সাংবাদিক সমিতি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন সংগঠন ও দল। ক্ষোভ প্রকাশ করে হামলাকারীদের বিচার দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন সম্পাদক পরিষদ এবং ১১ বিশিষ্ট নাগরিক। বিকেলে একদল সাংবাদিক স্বেচ্ছায় কারাবরণের আবেদন নিয়ে শাহবাগ থানায় ভিড় করেন।

গত সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখার পর নথিপত্র চুরি ও ছবি তুলে নেওয়ার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৪১১ ধারায় এবং অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারায় মামলা দিয়ে রোজিনাকে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়।

রোজিনার মুক্তি ও হেনস্তার বিচার দাবি সম্পাদক পরিষদের সচিবালয়ে কর্তব্য পালন করতে গিয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা হেনস্তার পর প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে থানায় সোপর্দ, মামলা দায়ের, সারা রাত থানায় রাখা, আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন এবং জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ প্রকাশ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম ও সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজাম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সম্পাদক পরিষদ গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে লক্ষ করছে, ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টের আওতায় রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই যুগে এই সময়ে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আমলের করা আইনে মামলা দায়ের সংশ্লিষ্টদের সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের নেতিবাচক মনোভাব ও অশুভ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্বের চেষ্টার পাশাপাশি আগামী দিনের স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের জন্য হুমকি। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের হীন চেষ্টা সংবাদপত্রের অস্তিত্বকে হুমকির দিকে ঠেলে দেয় এবং পেশাকে চ্যালেঞ্জের দিকে নিয়ে যায়।’

বিবৃতিতে বলা হয়, সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ‘এই নজিরবিহীন ঘটনা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে  থাকবে। রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি কক্ষে জিম্মি করে রাখা, তাঁকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করার ঘটনা শুধু দুঃখজনক নয়, এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন আইনে একজন সাংবাদিককে এভাবে আটকে রাখা হলো, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা বের করতে হবে। ব্যবস্থা নিতে হবে দোষীদের বিরুদ্ধে।’

বিবৃতিতে রোজিনা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তির পাশাপাশি পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।