kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

গভীর রাতে ছোটে দূরপাল্লার বাস

দিনে পুলিশের বাগড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গভীর রাতে ছোটে দূরপাল্লার বাস

ঈদ শেষে জনস্রোত রাজধানীমুখী। ট্রাক প্রাইভেট কার মাইক্রোবাসের পাশাপাশি অ্যাম্বুল্যান্সে গাদাগাদি করে ফিরছে মানুষ। ভাড়াও গুনতে হচ্ছে কয়েক গুণ। গতকাল বগুড়ার বনানী মোড় থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে সারি সারি বাস। তবে চারদিক সুনসান, যেন পিনপতন নীরবতা। রাত একটু গভীর হলেই রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে শুরু হয় হাঁকডাক। বিছিন্নভাবে ঢাকা ছাড়ে দূরপাল্লার বাস। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অভিমুখে বাস চলছে বেশি। তবে দিনের আলোতে রাজধানী থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছাড়ছে না। অন্যদিকে রাজধানীর বাইরে থেকে দিনের বেলা ছেড়ে আসা দূরপাল্লার বাসগুলো যাত্রীসহ আটকে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন জেলায়। আবার আটকানো বাসগুলো রাতের বেলা ছেড়েও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্যামলী, সেঁজুতি ও সেন্ট মার্টিন পরিবহনের একাধিক বাস গভীর রাতে যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছেড়ে সকালে পৌঁছে যাচ্ছে চট্টগ্রামে। প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

গত সোমবার রাতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেন আহমেদউল্লাহ হাসান নামের মিরপুরের এক যুবক। তিনি চট্টগ্রামের একটি শিল্প কারখানার প্রকৌশলী। তিনি জানান, এক পরিচিত লোক তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন রবীন নামের এক যুবকের সঙ্গে। রাত ১০টার দিকে রবীন তাঁকে নয়াপল্টনের ভিআইপি টাওয়ারের সামনে আসতে বলেন। তিনি নয়াপল্টনে পৌঁছে দেখেন দাঁড়িয়ে আছে একটি মাইক্রোবাস। এরই মধ্যে সেখানে উপস্থিত হন আরো কয়েকজন। মাইক্রোবাসে ওঠার সময় তাঁদের কাছ থেকে বাসের ভাড়া অগ্রিম নেওয়া হয়। তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয় এক হাজার ৮০০ টাকা। মাইক্রোবাসটি তাঁদের নিয়ে যায় কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম প্রান্তে। তাঁদের তোলা হয় একটি বাসে। সামনের কাচে পরিবহনের নাম সাদা কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। তবে ভেতর থেকে বোঝা যায়, পরিবহনের নাম শ্যামলী। ওই বাসেই তাঁরা পৌঁছে যান চট্টগ্রামে। পথে কয়েকটি স্থানে পুলিশ বাস দাঁড় করালেও চালক ও হেল্পার পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করেন।

গতকাল ফকিরাপুলের সেন্টমার্টিন, কমলাপুরের সেঁজুতি ও শ্যামলী পরিবহনের প্রধান কাউন্টারে গিয়ে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। তবে ওই দুটি পরিবহনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাওয়া একাধিক যাত্রী নিশ্চিত করেছেন যে তাঁরা ওই পরিবহনেই চট্টগ্রামে গেছেন। শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারের পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে কথা হয় ব্যবস্থাপক আনন্দ কুমারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো পরিবহন ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে না।’ শ্যামলী পরিবহনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গেছেন এমন এক যাত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দিতে চাইলে আনন্দ কুমার কথা বলতে অস্বীকার করেন।

গতকাল দুপুরে ফকিরাপুল এলাকায় বাস কাউন্টারগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে টিকিট খোঁজাখুঁজি করলে এক শ্রমিক এগিয়ে এসে বলেন, ‘আমি গ্রীনলাইন পরিবহনে কাজ করি। আমাদের বাস চলছে না, তবে আপনি যেতে চাইলে চট্টগ্রামের টিকিটের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। ভাড়া দিতে হবে দুই হাজার ৫০০ টাকা।’ কোন পরিবহনে যাওয়া যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিবহনের নামের দরকার কি, যদি যেতে চান রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে এখানে চলে আসবেন। আমি আপনাকে বাসের কাছে নিয়ে যাব।’

বগুড়ায় অ্যাম্বুল্যান্সে চলছে যাত্রী পরিবহন : রাস্তায় কড়াকড়ি আর দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ থাকার পরও বগুড়া থেকে লাশের গাড়ি আর অ্যাম্বুল্যান্সে ঢাকায় ফিরেছে মানুষ। শহরতলিতে মহাসড়কসংলগ্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবসা এখন রমরমা। যাত্রীপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা আদায় করছে তারা। অনেক সময় আবার পুলিশি ঝামেলা এড়াতে একজনকে রোগী বানিয়ে অন্যদের আত্মীয় পরিচয় দেওয়া হচ্ছে। বগুড়ার শেরপুরে হাইওয়ে পুলিশের ইন্সপেক্টর বানিউল আনাম বলেন, ‘আগের চেয়ে এখন রাস্তায় অ্যাম্বুল্যান্স চলাচল বেড়েছে। আর আত্মীয়-স্বজন পরিচয়ে যাত্রীও থাকে ঠাসা। রোগী একজন, কিন্তু তার সঙ্গে গাড়িতে থাকে ১০ জন। আমাদের সন্দেহ হলে থামিয়ে দিই। কখনো কখনো কাগজপত্রও চেক করি। রোগীর কাগজপত্র না থাকলে অ্যাম্বুল্যান্স যেখান থেকে আসে সেদিকে ঘুরিয়ে দিই।’ তিনি স্বীকার করেন, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মহাসড়কে অনেক যাত্রীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স চলছে।

বগুড়ার সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) ফয়সাল আহম্মেদ জানান, অনেকেই রোগী সেজে পরিবার-পরিজন বা আত্মীয়-স্বজন নিয়ে ঢাকায় ফিরছেন—এমন তথ্য তাঁদের কাছে আছে। এ জন্য শহরের মোড়ে মোড়ে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

গতকাল সকালে বগুড়ার বনানী মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রী তোলার জন্য অপেক্ষায় অ্যাম্বুল্যান্স। শফিকুল নামের এক যাত্রী ঢাকায় যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সচালকের সঙ্গে দরদাম করছেন। চালক মিরাজ জানালেন, জনপ্রতি এক হাজার ২০০ টাকা দিতে হবে। আর কোনো লাগেজ থাকা যাবে না।

এর পেছনে সাইরেন বাজিয়ে একটি অ্যাম্বুল্যান্স এসে থামল। সেখানে ওঠার জন্য দৌড়ে গেলেন মিনারা বেগম এবং তাঁর স্বামী মনির হোসেন। তাঁরা দুজনই ঢাকার একটি বেসরকারি কম্পানিতে চাকরি করেন। সঙ্গে বড় ব্যাগ থাকায় অ্যাম্বুল্যান্সচালক তাঁদের নিতে রাজি হলেন না। বেশি টাকা দিতে চাওয়ার পরও চালক আব্দুল গফুর বলে দিলেন, ‘ব্যাগ নিলে ট্রাকে যান।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু বগুড়া শহরেই বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে তিন শতাধিক। এসব অ্যাম্বুল্যান্সের ৯০ শতাংশই এখন যাত্রী বহন করছে। জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগী বহনের জন্য শহরে অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়া যাচ্ছে না।

বগুড়া প্রাইভেট অ্যাম্বুল্যান্স মালিক সমিতির নেতা আসাদুল্লাহ প্রামাণিক বলেন, ‘আমরা এ রকম যাত্রী বহনের অভিযোগ প্রতিদিনই পাই। যাত্রী নেওয়ার কোনো বিধান নেই, এটাও মানি। কিন্তু করোনার কারণে ভাড়া কমে যাওয়ায় এখন কেউ সমিতির কথা শোনে না।’

শিমুলিয়া, বাংলাবাজার ও দৌলতদিয়া ঘাটে রাজধানীমুখী মানুষের স্রোত : লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাটে ঈদ ফেরত ঢাকামুখী যাত্রীর ঢল গতকালও অব্যাহত ছিল। ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, গতকাল ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ কিছুটা কমে এলেও গণপরিবহন বন্ধ থাকায় পথে পথে ভোগান্তি ও বাড়তি ভাড়া দিয়েই রাজধানীতে ফিরছে যাত্রীরা। যখনই বাংলাবাজার ঘাট থেকে কোনো ফেরি যাত্রী নিয়ে শিমুলিয়া ঘাটে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে তা আনলোড করে যাত্রী বা যানবাহনের অপেক্ষায় না থেকে খালি ফেরিই চলে যায় বাংলাবাজার ঘাটে। ফেরি দিয়ে পারাপারে তেমন বেগ পেতে না হলেও মহাসড়কে বাসসংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। নিরুপায় যাত্রীরা অটোরিকশা, ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, মোটরবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনে ভেঙে ভেঙে গন্তব্যে রওনা দেয়। এতে তাদের যানবাহনের ভাড়া কয়েক গুণ বেশি গুনতে হয়েছে।

এদিকে বাংলাবাজার ঘাট হয়ে ঢাকাসহ কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীর চাপে জরুরি অ্যাম্বুল্যান্সও ফেরিতে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য ও প্রশাসন মানুষের গাদাগাদি এড়াতে নজরদারি বাড়িয়েছে।

এদিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে গতকালও মানুষের ঢল নামে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বিভিন্ন ফেরিতে গাদাগাদি করে তাদের নৌপথ পাড়ি দিতে দেখা যায়। বিআইডাব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. ফিরোজ শেখ বলেন, ‘ঈদ শেষে এখনো কর্মস্থল ঢাকায় ফিরছে দক্ষিণাঞ্চলের কর্মজীবী হাজার হাজার মানুষ। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় সব যাত্রীর চাপ পড়েছে ফেরিতে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় এই নৌপথে ছোটবড় ১৬টি ফেরি সার্বক্ষণিক চলাচল করছে।’

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে আটকে দেওয়া হলো শতাধিক বাস : উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবোঝাই শতাধিক বাস গতকাল ভোরে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের সোনামুখীতে আটকে দিয়েছে পুলিশ। এতে কাজিপুর থেকে ধুনট হয়ে শেরপুর-বগুড়ার দিকে অন্য কোনো যানবাহন ঢুকতে পারছে না। কাজিপুর থানার ওসি পঞ্চানন্দ সরকার বলেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দূরপাল্লার কোনো বাস আমরা ঢাকার উদ্দেশে কাজিপুর হয়ে যেতে দেব না।’

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]