kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

ফাঁকা রাখার সিটে বসে পড়ছে অনেকে

‘স্যানিটাইজার দিতে চাইলেও লোকজন নেয় না’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফাঁকা রাখার সিটে বসে পড়ছে অনেকে

রাজধানীর মেরুল বাড্ডা থেকে ভিক্টর ক্লাসিক বাসে উঠেছেন সোহেল মোল্লা (৪০)। যাবেন কুড়িল বিশ্বরোড। মুখে মাস্ক নেই। কিছুক্ষণ পর পর দুই হাত মুখে চেপে হাঁচি দিচ্ছেন তিনি। তারপর সেই হাত মুছছেন বাসের সিটে। অন্য যাত্রীদের অভিযোগের পর বাসের হেলপার এসে মাস্ক পরতে বললেও কথা কানে নিলেন না সোহেল। এ নিয়ে কিছুক্ষণ চলল তর্কবিতর্ক।

এই বাসের যাত্রী লিনা রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজনের মাস্ক না পরা মানে তার পাশের সবাই অনিরাপদ। কার মধ্যে করোনার জীবাণু আছে, সেটা তো আমরা কেউই জানি না। তাই সবার উচিত, নিজ নিজ জায়গা থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।’

এদিকে গণপরিবহন খুলে দেওয়ার সময় প্রতিটি গাড়ির যাত্রীকে মাস্ক পরার পাশাপাশি হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হলেও সেটা মানা হচ্ছে না কোনো গণপরিবহনেই। গতকাল রাজধানীর পোস্তগোলা, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, খিলগাঁও, রামপুরা, মালিবাগ, মগবাজার, মহাখালী, বাড্ডা ও নতুনবাজার এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বেশির ভাগ গণপরিবহনের যাত্রীরাই মানতে চায় না স্বাস্থ্যবিধি।

অতিরিক্ত সিট ফাঁকা নেই জানালেও যাত্রীরা ঠেলে উঠে যাচ্ছে গণপরিবহনে। বাসে উঠে আবার কেউ অন্যের পাশে গিয়েও বসে পড়ছে অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখার নিয়ম অমান্য করে।

বাতেন আহমেদ নামের এক যাত্রী বলেন, ‘আমি অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ ভাড়া দিয়ে বাসে উঠেছি, কিন্তু এক ব্যক্তি উঠেই আমার পাশে বসে পড়ল। তাহলে আমার অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে লাভ কী হলো। আমার তো আমও গেল, ছালাও গেল।’

এ বিষয়ে তুরাগ বাসের চালক হানিফ মিয়া বলেন, ‘আমরা তো মানা করি যাত্রীদের। হ্যারা শোনে না, ঠেইল্লা উইঠ্যা পরে। আমরা কী কমু।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গণপরিবহনে যাত্রীরা স্বাস্থ্যবিধি না মানলে এটা ভবিষ্যতে দেশে বড় ধরনের করোনাঝুঁকি তৈরি করবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানুষ যেভাবে গণপরিবহনে যাতায়াত করছে তাতে দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে হয়তো আমরা একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছি। দেশে দু-একটি ভারতীয় ভেরিয়েন্টের করোনা রোগীও পাওয়া গেছে। তাই এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না, এটাও আমাদের মানতে হবে।’

যাত্রী বাসে উঠাতে গেলে একসময় স্প্রে ব্যবহার করতে দেখা গেলেও গতকাল সেই চিত্র চোখে পড়েনি। দুপুর ১টা দিকে পুরান ঢাকার জুরাইন রেলগেটের কাছে দেখা গেছে বাসের পাশাপাশি লেগুনা যাত্রী তুলে গুলিস্তান, বাড্ডা এলাকার দিকে যাচ্ছে। কোনো লেগুনাতেই যাত্রীদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করে বসাতে দেখা যায়নি। প্রশ্নের জবাবে লেগুনার চালক সেলিম মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাইনষে অহন আর করোনাটরোনা মানে না। স্যানিটাইজার দিতে চাইলেও লোকজন নেয় না।’ তিনি জানান, আগে জুরাইন থেকে ১২ জন করে যাত্রী তুলে যাত্রাবাড়ী যেতেন। প্রতিজনের ভাড়া ছিল ১০ টাকা। এখন আটজন করে যাত্রী নেন। ভাড়া নেন ১৫ টাকা করে।

দুপুর ২টার দিকে দোলাইরপাড় এলাকায় রাইদা নামের একটি বাসের কন্ডাক্টর যাত্রীদের ডেকে তুলছিলেন, কিন্তু তাঁর হাতে স্প্রে করার মতো কিছু দেখা যায়নি। তাঁর মুখেও ছিল না মাস্ক। বাসটির ভেতরে উঠে দেখা যায় চালকের মুখেও মাস্ক নেই। ১৫-২০ জন যাত্রীর মধ্যে চারজনের মুখে মাস্ক নেই। অন্যদের মুখে মাস্ক থাকলেও কেউ কেউ মাস্ক থুতনির নিচে ঝুলিয়ে রেখেছেন। কন্ডাক্টর আবদুর রশিদ জানান, আগে তাঁরা স্প্রে ব্যবহার করতেন, কিন্তু মানুষের আগ্রহ না থাকায় এখন আর করছেন না। তাঁর যুক্তি—এ পর্যন্ত কোনো ড্রাইভার-হেলপার করোনায় মারা গেছেন, এমন খবর তাঁদের জানা নেই। এই কারণে তাঁরা ভয়ও পাচ্ছেন না।

দুপুর আড়াইটার দিকে সায়েদাবাদ এলাকায় দেখা গেছে, যাত্রাবাড়ী থেকে গাবতলী, মতিঝিল, ফার্মগেটসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাস চলাচল করছে। এই বাসগুলোতেও যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি খুব একটা মানতে দেখা যায়নি। এর বেশির ভাগের মুখেই মাস্ক দেখা যায়নি। কমবেশি পুরুষদের মুখে কিছু মাস্ক দেখা গেলেও নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে একেবারেই কম দেখা গেছে।