kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

ঢাকার দুই মেয়রের বর্ষপূর্তি

প্রতিশ্রুতি অনেক বাস্তবায়ন সামান্য

শম্পা বিশ্বাস   

১৮ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রতিশ্রুতি অনেক বাস্তবায়ন সামান্য

নির্বাচনী ইশতেহারে ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা ও উন্নত ঢাকা—এই পাঁচটি রূপরেখা দিয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। অন্যদিকে সচল, সুস্থ ও মানবিক ঢাকা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ৩৮ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম এক বছরে সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর সামান্যই তাঁরা পূরণ করতে পেরেছেন। করোনার মধ্যে বেশির ভাগ উন্নয়নকাজ থেমে আছে প্রাথমিক পরিকল্পনাতেই।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, দক্ষ জনবলের অভাবেই এক বছরে দুই সিটির সফলতা আশানুরূপ হয়নি। তবে মেয়র ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এরই মধ্যে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। উন্নয়নকাজে কিছুটা বাধা হয়েছে করোনা। তবে যে ধরনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে দুই সিটি এগোচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে সুফল পাবে নগরবাসী।

গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর ১৬ মে দক্ষিণের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেখ ফজলে নূর তাপস। দায়িত্ব নিয়েই তিনি অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ ডিসেম্বর থেকে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২-এ নকশাবহির্ভূতভাবে গড়ে ওঠা ৯১১টি দোকান উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ডিএসসিসি। পাশাপাশি ১৭ ডিসেম্বর থেকে সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেটেও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৭৫৩টি দোকান উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে, যদিও মাস ঘুরতে না ঘুরতেই সেই অভিযান ফিকে হয়ে যায়। আবারও দখল হয়ে গেছে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মার্কেটে তো আর নিয়মিত দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। তবে আমরা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তা ছাড়া এরই মধ্যে দুইবার আমরা সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়েছি।’

এদিকে ইশতেহারে ঐতিহ্যের ঢাকার মধ্যে জাদুঘর নির্মাণ এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা নির্মাণ ও সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে নগর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন স্থাপনা খাতে ঢাকা দক্ষিণের ছিল না কোনো বরাদ্দ। সুন্দর ঢাকার মধ্যে বায়ু ও শব্দ দূষণ রোধে ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব স্থাপনা বৃদ্ধি, আধুনিক কমিউনিটি সেন্টার এবং খেলার মাঠ উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি ছিল। কয়েকটি খেলার মাঠের জায়গা উদ্ধার করলেও এখনো বায়ু ও শব্দ দূষণ রোধে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। শহরের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কিছু বৃক্ষরোপণের কাজ হলেও ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ নামের সেই প্রকল্প মেয়র তাপসের দায়িত্ব গ্রহণের আগেই শুরু হয়েছিল। উন্নত ঢাকার জন্য ৯৫৫৬০১৪ নম্বরের হেল্পলাইন চালু হলেও এখনো নাগরিক সেবা ও সমস্যা সমাধানের জন্য চালু হয়নি নগর অ্যাপ। এডিস নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কিউলেক্স মশা নিধনে ডিএসসিসির উদাসীনতা ছিল। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে মশার ঘনত্ব বেড়ে গিয়েছিল প্রায় চার গুণ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত ১১টি খাল থেকে মোট সাত লাখ টন বর্জ্য ও পলিমাটি অপসারণ করেছে ডিএসসিসি। তবে এখনো সব ওয়ার্ডে তৈরি হয়নি এসটিএস।

মেয়র তাপসের ইশতেহারের আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা। ঢাকাকে সচল করতে বাস রুট রেশনালাইজেশনের অধীনে এপ্রিল থেকে পাইলটিং হিসেবে মতিঝিল টু কাঁচপুর পর্যন্ত বাস চালুর কথা থাকলেও সেটি শুরু হয়নি। গত এক বছরের সফলতা, ব্যর্থতা নিয়ে মেয়র তাপস আগামীকাল বুধবার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানা গেছে। 

অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিরসন, মশক নিধন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য ফুটপাত নির্মাণ, রাস্তায় পুশ বাটন স্থাপন, সুন্দর এবং সচল ঢাকা গড়াসহ মোট ৩৮টি প্রতিশ্রুতি ছিল ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের নির্বাচনী ইশতেহারে। গত বছরের ১৩ মে দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২১ জানুয়ারি মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার ৩ নম্বর এভিনিউয়ের ৪ নম্বর সড়কে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন। এই অভিযানে পাঁচ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল ডিএনসিসি। তবে সরেজমিনে গতকাল ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বিহারিরা আবার দখল করে নিয়েছে সেই জায়গা। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ থেকে খালের দায়িত্ব বুঝে পেয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। এ পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি ১৭টি খাল থেকে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করেছে। তবে নিয়মিত তদারকির অভাবে সাংবাদিক কলোনি খাল, কল্যাণপুর-আগারগাঁও অংশের খালসহ কয়েকটি খাল আবারও বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি এখনো শুরু হয়নি খালের পারে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। তবে নাগরিক সেবা দান ও সমস্যা সমাধানের জন্য চালু সবার ঢাকা অ্যাপে বেশ সফলতার সঙ্গেই চলছে কার্যক্রম। মেয়র আতিকুলের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল মশক নিধন। তবে এ ক্ষেত্রে এক বছরে সফলতার পরিচয় দিতে পারেনি ডিএনসিসি। যানজট নিরসনে গত এক বছরে তেজগাঁও থেকে উত্তরা হাউস বিল্ডিং পর্যন্ত ১১টি ইউ টার্ন চালু করেছে ঢাকা উত্তর। তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণ জানায়, এসব ইউ টার্ন যানজট কমানোর চেয়ে বরং বাড়িয়ে দিয়েছে।

মহাখালীর বাসিন্দা রাসেল আহমেদ বলেন, ইউ টার্নগুলোর কারণে রাস্তা সরু হয়ে গেছে। ফলে আরো যানজট বাড়ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখন পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়েছে মাত্র তিনটি মাঠ।

গত এক বছরের নানা অর্জন, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা নিয়ে মেয়র আতিকুল ইসলাম কথা বলেছেন কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার দায়িত্ব গ্রহণের পরে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মহাখালীতে ডিএনসিসি কভিড হাসপাতাল করা। এই দুঃসময়ে হাসপাতালের চেয়ে প্রয়োজনীয় আর কিছু হতে পারে না। এর বাইরে আমাদের আরেকটা বড় উদ্যোগ ছিল খালগুলোকে দখলমুক্ত করা। সেটার প্রথম ধাপের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার কাজ আমরা শেষ করেছি।’

এক বছরে নির্বাচনী ইশতেহারের কতটুকু প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে—এমন প্রশ্নে মেয়র বলেন, ‘এটা আমি জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে চাই। তারা বিচার করবে আমি মেয়র হিসেবে কতটা কাজ করেছি। আমি তাদের নগরপিতা নই, তাদের সেবক।’

এক বছরে নগরের উন্নয়নকাজ কেন গতি পায়নি—এমন প্রশ্নে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দুই সিটিতে দক্ষ জনবলের ভীষণ অভাব আছে। এতে তাদের পরিকল্পনায় কিছু ঘাটতি থেকে যায়। পাশাপাশি যে পরিমাণ উন্নয়নকাজ তাদের করতে হয়, সেই তুলনায় তাদের দক্ষ প্রকৌশলী এবং নগর পরিকল্পনাবিদ নেই। এটি কাজের ক্ষেত্রে একটি বাধা।

কিভাবে উন্নয়নকাজের গতি বাড়ানো যায়—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শুধু মেয়র নন, কাউন্সিলরদেরও দৃশ্যমান হতে হবে কাজকর্মে। দুই সিটিকে ওয়ার্ডভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প নিতে হবে। আমার মনে হয়েছে, উন্নয়নকাজগুলো অভিজাত এলাকাকে ঘিরে হচ্ছে। তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের এলাকার দিকে নজর কম। বায়ুদূষণ বাড়ছে সেটার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি আবর্জনা ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করতে হবে।’



সাতদিনের সেরা