kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

ঈদ শেষে ঢাকায় ফেরা

‘এক মাসের বাজারের টাকা পথেই খরচা’

লায়েকুজ্জামান   

১৮ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘এক মাসের বাজারের টাকা পথেই খরচা’

১. রীতিমতো অ্যাডভেঞ্চার। এক ছেলে, তিন মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে দুই চাকার মোটরসাইকেলে যশোরের বেনাপোল থেকে ঢাকায়। দুঃসাহসিকতার গল্পটি চোখ বুজে একবার ভাবলে গা ছমছম করবেই। পুরো পরিবারের জীবন বাজি রেখে এমন ঈদ যাত্রার ‘নায়ক’ মুহাম্মদ কুদ্দুস সরদার। মাঝে মাঝে বিরতি, কখনো গাছতলায় বিশ্রাম। ব্যাগে রাখা মুড়ি, সঙ্গে গ্রামের নিজের বাগানের কলা। পথে পথে যাত্রাবিরতিতে খেতে খেতেই এলেন। ঈদের আগে বেনাপোলের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে এক মোটরসাইকেলেই সওয়ার হয়েছিল পুরো পরিবার। সিদ্ধিরগঞ্জের একটি লোহার কারখানার সহকারী পরিদর্শক তিনি। গতকাল সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে কুদ্দুস সরদারের পুরো পরিবারের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের দেখা রাজধানীর আমিনবাজার ট্রাকস্ট্যান্ডে। দাঁড়ানো একটি ট্রাকের ছায়ায় বসে পরিবার নিয়ে মুড়ি-কলা খাচ্ছিলেন। বড় ছেলের বয়স ১১, ছোট মেয়ের দেড় বছর, বাকি দুই মেয়ের একজনের বয়স পাঁচ, আরেকজনের তিন। কুদ্দুস সরদারের বাড়ি যশোরের শার্শার বেনাপোল বন্দরের কাছে। এভাবে মোটরসাইকেলে জীবন বাজি রেখে কেন যাতায়াত করছেন—প্রশ্ন রাখতেই বললেন, ‘এবার বাস নেই, ঈদের আগে একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করতে গিয়েছিলাম। ১৫ হাজার টাকা চাওয়ায় বাদ দিয়ে ঈদের দুই দিন আগে এভাবেই পরিবার নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি গিয়েছিলাম, আজ ফিরলাম। কোনো অসুবিধা হয়নি। ভোর ৫টায় বাড়ি থেকে যাত্রা করেছি, পথে বিশ্রাম নিতে নিতে চলে এলাম। ছোট মেয়েটা স্ত্রীর কোলে বসেছিল, ছেলেটা বসেছিল আমার পেছনে। অন্য দুই মেয়েকে আমার সামনে বসিয়েছিলাম। ওরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এখন ভাবছি, গাবতলী গিয়ে ওদের একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে দেব।’

২. কুদরতউল্লাহ মিয়াজী রাজধানীর একটি আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে। পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে ঈদে দুঃসাহসই দেখিয়েছেন বটে! নাড়ির টানে গিয়েছিলেন কুড়িগ্রামের উলিপুর সদরে। ঈদের আনন্দ চুকেছে। এবার অফিস থেকে এলো কুদরতউল্লাহর মোবাইল ফোনে কল। দ্রুত আসতে হবে ঢাকায়। দূরপাল্লার বাস চালুর ব্যাপারে কোনো আলোর ইশারা নেই। শেষমেশ গতকাল রাত ৪টার দিকে কুড়িগ্রামের উলিপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে ফের ঢাকার পথে কুদরতউল্লাহ মিয়াজীর পুরো পরিবার। কখনো  নছিমনে, কখনো করিমনে। ধুঁকতে ধুঁকতে সকালে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে। পলাশবাড়ী থেকে বাসে বগুড়া সদরে। বগুড়া থেকে ঢাকায় ফেরার জন্য ট্রাক পেলেও পরিবারের সদস্যরা ট্রাকে উঠতে নারাজ। শেষে ১১ হাজার টাকায় একটি মাইক্রোবাস ঠিক করে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকায় এসে পৌঁছেন। কুতরতউল্লাহ মিয়াজী বলেন, ‘দূরপাল্লার বাস চলাচল করলে সাতজনের ঢাকায় আসতে ভাড়া লাগত চার হাজার ২০০ টাকা, এখন খসে গেল সাড়ে ১৪ হাজার টাকা। এক মাসের বাজারের টাকা তো পথেই খরচ করে এলাম।’

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ। তাতেও ঈদের আগে গ্রামমুখী জনস্রোত ঠেকানো যায়নি। এখন ঢাকামুখী মানবস্রোতও কোনো বাধা মানছে না। মুহাম্মদ কুদ্দুস সরদার ও কুদরতউল্লাহ মিয়াজীর মতোই জীবনের মায়া তুচ্ছ করে মানুষের মিছিল এখন রাজধানীমুখী।

শুধু কি জীবনের ঝুঁকি, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি টাকা খরচ করে মানুষ ফিরছে কর্মস্থলে। কোথাও কোথাও বিকল্প যানবাহন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানও। ফেরিঘাটগুলোতেও ঢাকামুখী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে ঘাট কর্তৃপক্ষও একরকম নাস্তানাবুদ। এদিকে মোবাইল ফোন অপারেটরদের হিসাবে গত শনি ও রবিবার ঢাকায় ফিরেছে ১০ লাখ ৭৭ হাজার ৭৬ জন গ্রাহক।

শিমুলিয়ায় মানুষ আর মানুষ : বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌপথে গতকাল ঢাকামুখী যাত্রীদের ভিড় ছিল উপচে পড়া। উল্টো দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য ফেরিতে চড়ে মানুষকে পার হতেও দেখা যায়। ফেরির সংখ্যা বাড়ানোর পরও যাত্রী পারপারে ফেরি সার্ভিস কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথের শিমুলিয়া ঘাটে তিন দিন ধরেই কর্মস্থলে ফেরা মানুষের স্রোত বইছে। পথে পথে নানা ভোগান্তি সঙ্গী করেই রাজধানীতে ফিরছে মানুষ। গতকাল সকালে বাংলাবাজার থেকে ছেড়ে আসা ফেরিগুলোতে যানবাহনের চেয়ে যাত্রীর উপস্থিতি ছিল বেশি। সকালের দিকে শিমুলিয়া ঘাট থেকে রো  রো ফেরি ড. গোলাম মাওলাসহ বেশ কয়েকটি ফেরি শিমুলিয়া ঘাট থেকে শুধু যাত্রী নিয়েই বাংলাবাজার ঘাটের দিকে ছেড়ে যায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাবাজার ঘাটে যাত্রীর ভিড় বাড়তে থাকে। ভেঙে ভেঙে আসা যাত্রীরা শিমুলিয়া ঘাটে এসে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারে করে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেস হয়ে রাজধানীতে ফিরেছে।

বিআইডাব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের উপমহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, অন্য নৌযান বন্ধ থাকায় ফেরিগুলোতে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীর ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। আবার কিছু মানুষ, যারা ঈদের আগে বাড়িতে যেতে পারেনি, তারাও এখন গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে। বহরে থাকা রো রো, কে-টাইপ, ড্রাম, মিডিয়াম ও ছোটসহ মোট ১৮টি ফেরি বিরামহীনভাবে চলাচল করছে।

মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের টিআই হিলাল উদ্দিন বলেন, পর্যাপ্ত ফেরি থাকায় কোনো যানবাহন কিংবা যাত্রীদের শিমুলিয়া প্রান্তে ঘাটে এসে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে না।

দৌলতদিয়া ঘাটে বাড়তি চাপ : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ বেড়েছে। দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ থাকায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে দৌলতদিয়া ঘাটে আসছে বহু মানুষ। সরকারি নির্দেশনায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। তবে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক থাকায় দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঢাকামুখী কর্মজীবী মানুষের চাপ ধীরে ধীরে বাড়ছে। দৌলতদিয়া ঘাট ঘুরে দেখা যায়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কর্মজীবী মানুষ সরাসরি ফেরিতে গিয়ে উঠছে। অন্যদিকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসা প্রতিটি ফেরিতে ঘরমুখো মানুষের ভিড়। মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেও লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান, রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্সসহ বিভিন্ন গাড়ির সঙ্গে অনেকটা গাদাগাদি করে ফেরি পার হয়ে তারা নিজ গন্তব্যে ছুটছে।

বিআইডাব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. ফিরোজ শেখ বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ফেরি সার্ভিস পুরোপুরি চালু রাখা হয়েছে। বর্তমানে ছোট-বড় ১৫টি ফেরি সার্বক্ষণিক চলাচল করছে।’

এদিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার  গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে জানান, গত শনি  ও রবিবার  ঢাকায় ফিরেছেন ১০ লাখ ৭৭ হাজার ৭৬ জন মোবাইল ফোন গ্রাহক। এর মধ্যে শনিবার ফিরেছেন চার লাখ ১২ হাজার ৭৬৩ জন এবং রবিবার ফিরেছেন ছয় লাখ ৬৪ হাজার ৩১৩ জন। মন্ত্রী  বলেন, ‘মোবাইল ফোনের গ্রাহকরা ১৮ বছরের বেশি বয়সের। ১৮ বছরের নিচের বয়সের কাউকে সিম দেওয়া হয় না। তাদের এনআইডিও নেই। ১৮ বছরের নিচে কতজন এবারের ঈদে অভিভাবকের সঙ্গে ঢাকার বাইরে গেছে, সেই হিসাব মোবাইল ফোনের গ্রাহকসংখ্যার মাধ্যমে পাওয়া  যাবে না। আবার একজন গ্রাহক একাধিক সিমও ব্যবহার করে থাকেন। সে ক্ষেত্রেও আমরা বলতে পারব না যে এক কোটির  বেশি লোক এবারের ঈদে ঢাকার বাইরে গেছে।’

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা]

 



সাতদিনের সেরা