kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রা

হিসাব মেলেনি রাজনীতির

এনাম আবেদীন   

১১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হিসাব মেলেনি রাজনীতির

রাজনীতির হিসাব না মিললে খালেদা জিয়া বিদেশে যেতে পারবেন না—এমন ধারণা বিশ্লেষকদের মধ্যে আগে থেকেই ছিল। পাশাপাশি তাঁদের ভাবনায় এটাও ছিল যে চিকিৎসার জন্য মানবিক কারণে সরকার হয়তো নমনীয় হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনীতিরই জয় হলো। লন্ডনে চিকিৎসার জন্য যেতে পারলেন না বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি এখন দেশেই চিকিৎসা নেবেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘খালেদা জিয়া বিদেশে যেতে পারলেন না পুরোই রাজনৈতিক কারণে। কেননা সরকার মনে করেছে উনি লন্ডনে গিয়ে আবার না জানি কী করেন।’ ‘কিন্তু উনার বয়স এবং যেসব রোগ রয়েছে তাতে সরকারের বিরুদ্ধে আর কিছু করা সম্ভব নয়। অথচ দেখা গেল সরকার তাঁকে এখনো ভয় পায়। মানবিক কারণে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত এ জন্যই কার্যকর হয়নি’, বলেন নাগরিক সংগঠন সুজনের এই সভাপতি।

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর দেন কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাঁর মন্তব্য, ‘এখানে বিদেশে যাওয়াটা বড় ব্যাপার নয়। বড় দুটি দল লুটেরা ধনিক শ্রেণির দুটি অংশ। এরা ভাগ হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এরা যে যখন ক্ষমতায় থাকে, পরস্পরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। এটি সেই ক্ষমতার সমীকরণ বা পাটিগণিত।’

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী  জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মতো রাজনীতিক চাঁদে গেলেও রাজনীতি করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর চিকিৎসার অধিকার বাধাগ্রস্ত করা সরকারের দুর্বলতারই পরিচায়ক। আর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা এবং তাঁকে সাজা দেওয়াসহ পুরো প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ 

করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়া। উন্নততর চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে তাঁর ভাই শামীম এস্কান্দার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন গত ৫ মে। কিন্তু ৯ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়ে দেয় যে আইন অনুযায়ী তাঁকে বিদেশে পাঠানোর সুযোগ নেই। আইন মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে নেতিবাচক মতামত দেয়। এ ঘটনায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এ ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেন।

তবে আলোচনা করলে মির্জা ফখরুলও জানান যে রাজনৈতিক কারণে খালেদা জিয়াকে বিদেশে যেতে দেওয়া হয়নি। গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই সরকার রাজনীতি করেছে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে। কারণ তারা (সরকার) খালেদা জিয়াকে ভয় পায়।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল ও শুভবুদ্ধির মানুষ সরকারের এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেনি। এতে আওয়ামী লীগের কী লাভ হলো জানি না।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অবশ্য এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে গতকাল বলেন, ‘বিএনপি নেতারা এখনো বেগম জিয়ার চিকিৎসার চেয়ে রাজনীতিকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর মুক্তি এবং চিকিৎসা নিয়ে বিএনপি নেতারা এর আগেও রাজনীতি করেছেন, এখনো করছেন।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে সরকারের রাজনীতি করার কিছু নেই। তবে বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য নয়, রাজনৈতিক কারণেই বিএনপি বিদেশে নিতে চেয়েছে বলে মনে হয়। তা না হলে ফখরুল সাহেব কেন বললেন যে খালেদা জিয়াকে সরকার রাজনীতির মাঠ থেকে দূরে রাখতে চাইছে?’

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা দল ও পরিবারের মধ্যে আগেও ছিল। খালেদা জিয়া করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর এ বিষয়ে তারা উদ্যোগ নেয়। তবে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ছাড়া খালেদা জিয়াকে সরকার বিদেশে, বিশেষ করে লন্ডনে যেতে দেবে এমনটি তারাও পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। কারণ প্রথমত, খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান লন্ডনে রয়েছেন। সেটি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনেক বিশ্লেষকই লন্ডনকে বিশ্বরাজনীতির সূতিকাগার বা গুরুত্বপূর্ণ শহর মনে করেন। তাঁদের মতে, বিশ্বের শক্তিধর ও গুরুত্বপূর্ণ বেশির ভাগ দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো লন্ডনে তৎপর। পাশাপাশি বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলোও লন্ডনে বেশ সক্রিয়। অতীতে আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশের গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা বা বৈঠক বিভিন্ন সময় লন্ডনেই হয়েছে—এমন উদাহরণ রয়েছে। ফলে শরীর সুস্থ থাকলে লন্ডনে বসে খালেদা জিয়া কী করবেন, সে নিয়ে আগাম চিন্তা করাটা সরকারের অমূলক নয়।

পাশাপাশি খালেদা জিয়া দেশে, নাকি বিদেশে থাকলে সরকারের লাভ সে বিষয়েও রাজনীতিতে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন রয়েছে। সাজা স্থগিত করে কারামুক্ত হলেও খালেদা জিয়া এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন বলে মনে করা হয়। তিনি রাজনীতি থেকেও দূরে আছেন। আবার এক-এগারোর সরকার ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেদিক থেকেও খালেদা জিয়ার দেশে থাকা তাৎপর্যপূর্ণ বলে কেউ কেউ মনে করেন।  

সূত্র মতে, এসব চিন্তা বিবেচনায় নিয়েই দলগতভাবে বিএনপির তুলনায় খালেদা জিয়ার পরিবার তাঁকে বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে বেশি উদ্যোগী হয়েছে। তৎপরতার সঙ্গে তারাই বেশি যুক্ত ছিল। এর আরেকটি কারণ হলো, পরিবারের আবেদনেই এর আগে সাজা স্থগিত করে খালেদা জিয়া কারামুক্ত হয়েছেন। ওই সময় সরকারের শীর্ষমহলের সঙ্গে খালেদা পরিবারের সদস্যদের বৈঠক হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে এবারও তাঁরাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে প্রাথমিক আলাপ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে প্রথম দিকে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও পরে সেই অবস্থান থেকে সরে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, “সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী মহলের সবুজ সংকেত নিয়েই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে হয়তো শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘না’ করা হয়েছে।” তাঁরা বলেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা সরকার মনিটর করেছে। করোনা নেগেটিভ হয়েছে, এটাও সত্য। তবে তাঁকে বিদেশে যেতে না দেওয়ার মূল কারণ রাজনৈতিক।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘অসুস্থ হলেও সরকার বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে ভয় পায়। এ জন্য নানা হিসাব-নিকাশ করে হয়তো তারা দেখেছে। তার পরও চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে যেতে দিলে সরকারের লাভ হতো। জনগণ মনে করত, শেখ হাসিনা সরকার অনেক মানবিক।’