kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

অনিশ্চিত যাত্রা তবু মানবস্রোত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অনিশ্চিত যাত্রা তবু মানবস্রোত

নিষেধাজ্ঞা না মেনে এখনো বাড়ি ফিরছে হাজারো মানুষ। ফেরিসহ সব নৌযান বন্ধ জেনেও ঘাটে অপেক্ষা। দুর্গম যাত্রায় অনেকের সঙ্গে শিশুও ছিল। গতকাল মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

চলছে না দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ। মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটের ফেরিও বন্ধ। ঘাটে মোতায়েন বিজিবি। পুলিশেরও সতর্ক চোখ। রাস্তায় রাস্তায় অনেক কড়াকড়ির খবর মুখে মুখে ফিরছে। এর পরও করোনাভীতি ভুলে কয়েক গুণ অর্থ খরচ করে ঈদে স্বজনের সান্নিধ্য পেতে গ্রামের পানে ছুটছে মানবস্রোত। অনেকেই মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা লোকাল বাসে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। কোনো বাধায়ই এই অনিশ্চিত যাত্রার লাগাম টানা যাচ্ছে না।

গাবতলী ও আমিনবাজার : গাবতলী ও আমিনবাজার থেকে পাটুরিয়া ঘাটের দিকে ছুটছে জনস্রোত। রাজধানীতে চলাচলকারী পরিবহনগুলো যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছে গাবতলীতে। সেখান থেকে হেঁটে সেতু পার হয়ে ওপারে আমিনবাজারে গিয়ে কেউ সাভারের বাসে উঠছে, কেউ ভাড়া নিচ্ছে প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস, কেউ কেউ যাচ্ছে মোটরসাইকেলে। আমিনবাজার থেকে পাটুরিয়া প্রাইভেট কারের ভাড়া ৫০০ টাকা, মাইক্রোবাসে ৩০০ টাকা আর বাসে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত জনপ্রতি ১০০ টাকা।

হেঁটে আমিনবাজার সেতু পার হওয়ার সময় কথা হয় খুলনার পাইকগাছার আরিফের সঙ্গে। বৃদ্ধা মাকে নিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন ঈদ করতে। স্ত্রী-সন্তান থাকে গ্রামে। এক মাস আগে মাকে ঢাকায় এনেছিলেন চিকিৎসার জন্য। আরিফ বললেন, ‘পাটুরিয়া ঘাটের অবস্থা সবই জানি, ফেরি চলছে না তা-ও জানি; তবে আল্লাহ ভরসা, যাত্রী বেশি হলে ফেরি না ছেড়ে যাবে কই, সে ভরসাতেই যাত্রা করেছি।’ আমিনবাজারে গিয়েও একই ধরনের বক্তব্য শোনা গেল অনেকের মুখে। আমিনবাজার থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত প্রাইভেট কারে যাত্রী বহন করছেন টিটন নামের এক চালক। জনপ্রতি ভাড়া নিচ্ছেন ৫০০ টাকা। টিটন জানালেন, গাড়িতে পাঁচজন করে যাত্রী বহন করছেন, সকাল ৬টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তিনবার যাওয়া-আসা করা গেছে।

আব্দুল্লাহপুর : রাজধানীতে চলাচলকারী পরিবহনে আব্দুল্লাহপুর নেমে যাত্রীরা হেঁটে টঙ্গী ব্রিজ পার হয়ে উঠছে বাসে। এর বেশির ভাগ যাত্রী যাবে কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহে। গাজীপুরের সীমানা পার হয়ে তারা আবার বাস পাল্টাবে। তবে এই সড়কে ছোট ছোট ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে যাত্রী বহন করতে দেখা যায়। একইভাবে আব্দুল্লাহপুর স্লুইস গেট থেকে অন্য বাসে উঠে অনেকেই যাচ্ছে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়।

সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী মোড় : ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর ২টার ঘরে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের ফুটপাতে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে সানজিদা খাতুন। সামনে রাখা চারটি ব্যাগ। ব্যাগগুলোর পাশেই তাঁর ছোট তিনটি ছেলে। টার্মিনাল থেকে কোনো বাস না ছাড়ায় তাঁর কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। সানজিদা জানালেন, তাঁর শাশুড়ি অসুস্থ, এ কারণে তাঁদের যেতে হবে ফেনীর গ্রামের বাড়ি। তাঁরা সকালে সাভার থেকে পিকআপ ভ্যানে করে সায়েদাবাদ টার্মিনালে এসেছেন। ভেবেছিলেন, ঈদ সামনে রেখে দু-একটি বাস হয়তো চলবে। কিন্তু এসে দেখেন কোনো বাসই চলছে না। ফলে তাঁরা বিকল্প কোনো ব্যবস্থায় ফেনী যেতে পারেন কি না সে অপেক্ষায় আছেন।

শুধু সানজিদাই নন তাঁর মতো শত শত মানুষকে দেখা গেছে সায়েদাবাদ টার্মিনাল ও যাত্রাবাড়ী মোড়ে বাড়ি ফেরার গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে। কিন্তু দূরপাল্লার গাড়ি না চলায় বিকল্প কোনো ব্যবস্থায়ও তারা যেতে পারছে না। এর আগে সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে মাইক্রোবাস যেতে দেখা গেলেও গতকাল রবিবার তা-ও চোখে পড়েনি। জানা গেছে, বাসচালক ও হেলপাররা সায়েদাবাদ টার্মিনালে কোনো মাইক্রোবাসকে থাকতে দিচ্ছেন না।

যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে সায়েদাবাদ টার্মিনাল পর্যন্ত অনেক নারী-পুরুষকে বড় বড় ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় বসে থাকতে দেখা যায়।

ভোলার বাসিন্দা বাচ্চু মিয়া কাজ করেন মালদ্বীপে। করোনা শুরুর পর দেশে ফিরে আসেন। মালদ্বীপ ফেরার অভিপ্রায় নিয়ে গত শনিবার ভোলা থেকে ভেঙে ভেঙে ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকায় এসে জানতে পারেন, মালদ্বীপের ফ্লাইট ফের বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁকে আবার ফিরতে হবে ভোলা। লঞ্চ বন্ধ থাকায় ভেঙে ভেঙে যাওয়ার জন্য সায়েদাবাদ এসেছিলেন। সেখানে কোনো গাড়ি না পেয়ে যাত্রাবাড়ী মোড়ে একটি বড় ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বললেন, ‘এমন বিপদে পড়ব ভাবতে পারিনি। ওই দিন বাড়ি থেকে ভেঙে ভেঙে আসতে পেরেছিলাম। আজ তো দেখি তা-ও নাই। এখন কিভাবে বাড়ি যাব, সে চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠছি।’

যাত্রাবাড়ী মোড়ে দেখা যায়, বেশ কিছু মোটরসাইকেলচালক যাত্রীদের ডাকছেন কুমিল্লা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী যাওয়ার জন্য। নোয়াখালী যাওয়ার জন্য এসেছিলেন মোহাম্মদ আলী। তিনি জানালেন, মোটরসাইকেলে ভাড়া চাওয়া হচ্ছে তিন হাজার টাকা। এ সময় পাশেই দেখা গেল এক মোটরসাইকেলচালক দুজন যাত্রী তুলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে ছুটছেন। যাত্রীরা জানাল, তারা ৬০০ টাকা করে উঠেছে।

সদরঘাট : লঞ্চ টার্মিনালের কোনো পন্টুনে নেই লঞ্চ, তবে নদীতে রয়েছে নৌকা আর ট্রলারের প্রতিযোগিতা। বেশির ভাগ যাত্রী নৌকায় নদী পারপার হলেও অনেকে খোঁজ নিচ্ছে, কিভাবে যাওয়া যাবে নিজের গন্তব্যে। তবে ট্রলারে পোস্তগোলা ব্রিজের নিচে অনেককেই কোস্ট গার্ডের জেরার মুখে পড়ছে। এর পরও অনেকেই পাগলা, নারায়ণগঞ্জ, কাঠপট্টি হয়ে চাঁদপুর যাচ্ছে।

ট্রলারচালক নূর আহমেদ চাঁদপুরে যাওয়ার তরিকা বাতলে দিলেন। তিনি বললেন, ‘এইহান থেইক্কা পাগলা যাইবেন। পাগলা থেইক্কা কাঠপট্টি। হেইহান থেইক্কা আবার ট্রলারে ডাইরেক্ট চাঁদপুর।’

শিমুলিয়া ঘাট : গতকাল বিকেল ৪টার দিকে একসঙ্গে ১৫টি অ্যাম্বুল্যান্স শিমুলিয়া ঘাটের হাসিনার মোড়ে এসে বিজিবি ও পুলিশের চেকপোস্টে আটকে গেল। বেশির ভাগ অ্যাম্বুল্যান্সেই ছিল লাশ। একটি অ্যাম্বুল্যান্সও ঘাটের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। ফেরি না চলায় অ্যাম্বুল্যান্সগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হলো।

গতকাল গাড়ি নিয়ে শিমুলিয়া ঘাট দিয়ে ফেরি পার হতে চাইলেও ঘাটের অদূরে ভাঙ্গা মোড়ে আটকে গেছে বিজিবি আর পুলিশের চেকপোস্টে। কড়া নিরাপত্তার কারণে তেমন কোনো গাড়িই ঢুকতে দেওয়া হয়নি শিমুলিয়া ঘাটের রাস্তায়। তবে সকালের দিকে দুটি ফেরি ছেড়ে যায়। সকাল ১০টার দিকে শাহ পরান নামের রো রো ফেরিটি শিমুলিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে গেছে তিনটি অ্যাম্বুল্যান্স ও দুটি পিকআপ ভ্যান নিয়ে। কয়েক হাজার মানুষ উঠে ফেরিটি ভরে যাওয়ায় এখানে আর কোনো গাড়ি ওঠার সুযোগ ছিল না।

গতকাল সকাল ১১টার দিকে কর্তৃপক্ষ ফেরি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এতে বিপাকে পড়ে আটকে পড়া যাত্রীরা। তবে গতকাল আগের দিনের মতো ততটা যাত্রীর চাপ ছিল না। চেকপোস্টেই যাত্রীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

দায়িত্বরত নারায়ণগঞ্জ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আল আমিন বলেন, ‘আমরা পুলিশকে সহযোগিতা করতে এখানে কাজ করছি। সাধারণ মানুষ ফেরিতে গাদাগাদি করে হলেও ঈদে বাড়ি যেতে চায়। তাই যাত্রীদের বুঝিয়ে হাসিনার মোড় থেকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।’

শিমুলিয়া ঘাটের বিআইডাব্লিউটিসির এজিএম মো. শফিকুল ইসলাম জানান, সকালে মাত্র দুটি ফেরি ছেড়ে গেছে। কিন্তু সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশের কারণে সকাল ১১টা থেকে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পাটুরিয়া ঘাট : গতকাল পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সকালে যাত্রীর চাপ কম থাকলেও দুপুরের দিকে মহাসড়ক ও ঘাট এলাকায় চাপ বাড়তে থাকে। জরুরি সার্ভিসের ফেরি ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার সময় অনেকেই ফেরিতে উঠে পড়ে। এদিকে যাত্রীর চাপ ঠেকাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানিকগঞ্জের প্রবেশপথ বারবাড়িয়া, শিবালয়ের টেপড়া, ও সিংগাইরের প্রবেশপথে বিজিবির চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এ ছাড়া ঘাট এলাকায়ও পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যরা টহল দেন। বিআইডাব্লিউটিসির পাটুরিয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক মহীউদ্দিন রাসেল জানান, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে গতকাল সকাল থেকেই ফেরি সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়। তবে জরুরি লাশ ও রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স পারাপারের জন্য দুটি ছোট ফেরি সচল রাখা হয়।

বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে পার হচ্ছে দূরপাল্লার বাস : নিষেধাজ্ঞা না মেনে দূরপাল্লার কিছু বাস বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে চলাচল করছে। গতকাল উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা বেশ কিছু দূরপাল্লার বাস সেতু পারাপারের সময় আটকে দেয় পুলিশ। এ সময় যানজট দেখা দিলে পুলিশ বাসগুলো ছেড়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু সেতু টোল প্লাজা সূত্র জানায়, শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৫ হাজার ৪০০ যানবাহন সেতু পারাপার হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ। শুক্রবারের চেয়ে শনি ও রবিবার যানবাহনের চাপ আরো বেড়েছে। শুক্রবার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত দূরপাল্লার তিন শতাধিক বাস সেতু পার হয়েছে। হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি মো. শাহজাহান আলী জানান, মহাসড়কে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে।

শাজাহানপুরে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ : ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস চলাচল করায় গতকাল সকালে শাজাহানপুরে দ্বিতীয় বাইপাস সড়কে অর্ধশত বাস আটকে দেয় পুলিশ। এ ঘটনার প্রতিবাদে বেতগাড়ী এলাকায় প্রায় এক ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ করেন পরিবহন শ্রমিকরা।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)



সাতদিনের সেরা