kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

আজ বিশ্ব মা দিবস

করোনায় মায়েদের কঠিন লড়াই

ফাতিমা তুজ জোহরা   

৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় মায়েদের কঠিন লড়াই

অসীম ত্যাগ স্বীকার করে সন্তানকে পৃথিবীর আলো-বাতাসের মধ্যে নিয়ে আসেন মা। ফুটফুটে শিশুর দিকে তাকিয়ে ভুলে যান সব কষ্ট। শিশু পায় পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। মহামারি করোনা শিশুর কাছ থেকে সেই নিরাপদ আশ্রয়স্থলও কেড়ে নিচ্ছে। গত ১৬ এপ্রিল সকালে ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়ে বিকেলে মারা যান রিফাত আরা সুলতানা। সন্তানসম্ভাবনা অবস্থায় করোনার সঙ্গে ১০ দিন লড়াই করে সন্তানকে পৃথিবীর বুকে নামিয়ে নীরবে প্রস্থান করেন রিফাত।

করোনাকালে শুধুই যে প্রসবকেন্দ্রিক জটিলতায় মায়েদের মৃত্যু হয়েছে তা নয়, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর যাঁরা মারা যাচ্ছেন তাঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ থাকছেন মায়েরা। অর্থাৎ দুইভাবেই করোনার ছোবলে মা-হারার সংখ্যা দীর্ঘ হচ্ছে। করোনায় বিষাদের সুর নিয়ে বছর ঘুরে আবার এসেছে মা দিবস। মায়েদের লড়াই-সংগ্রামকে স্মরণ করার বিশেষ দিন।

জাতিসংঘ বলছে, করোনায় বাংলাদেশে মাতৃ, শিশু ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা ৫০ শতাংশ কমে গেছে। অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকলজিক্যাল সোসাইটি বাংলাদেশ (ওজিএসবি) বলছে, মহামারিতে মাতৃমৃত্যু বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ওজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী বলেন, করোনাকালে মাতৃমৃত্যু বেড়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ হলো একেবারে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসা। অনেকে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে হাসপাতালে আসছেন না। বাড়িতে ও হাসপাতালে দুই জায়গায়ই মাতৃমৃত্যু বেড়ে যাচ্ছে।

শিশুকে সবচেয়ে নিরাপদ রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন মায়েরা। একই সঙ্গে পরিবারে সবার স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করাটাও মায়ের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

করোনা মহামারির শুরুতেই মা হয়েছেন আলেয়া জামান আলিফ। সন্তানকে আগলে রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন গেল একটা বছর। এই এক বছরের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনার শুরুতে অনেক বেশি ভয় কাজ করত। সময়ের সঙ্গে এখন অনেক কমে গেছে। তার পরও বাচ্চাকে সারাক্ষণই চোখে চোখে রাখতে হয়। নিজেকেও সতর্ক থাকতে হয়। পরিবারের অন্য সদস্যরাও স্বাস্থ্যবিধি মানছে কি না সেটাও দেখতে হয়। অনেক সময় হাঁপিয়ে উঠি। এই একটা বছর বাবুকে বাইরে বের করি না ডাক্তার দেখানো ছাড়া। এমনকি ওর জন্য আমি নিজেও বের হই না। আত্মীয়-স্বজন সবার কাছে যেতে দেই না। মহামারি না হলে হয়তো বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে যেতে পারতাম। বাচ্চাদের বাইরে নিয়ে যাওয়াটা তো জরুরি। কিন্তু শুরু থেকেই আমরা ঘরবন্দি জীবন যাপন করছি।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ‘করোনায় মায়েদের কাজ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। সন্তান কভিড আক্রান্ত হলে মা কিন্তু নিজেই সেবা দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে মা নিজেও আক্রান্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি করোনায় হোম অফিস করতে হচ্ছে। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। অনেক সময় স্বামী কাজ হারাচ্ছেন। এসব দিক বিবেচনায় মা অর্থনৈতিক দিক, অন্যদের মানসিক দিক, বাচ্চাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা—এই সব কিছু সামাল দিচ্ছেন।’

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মা ও শিশু স্বাস্থ্য) ডা. মোহাম্মদ শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, সর্বশেষ হিসাব অনুসারে দেশে বছরে গর্ভবতী হন ৪৪-৪৫ লাখ নারী। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১১ লাখের বিভিন্ন কারণে গর্ভপাত হয় বা সন্তান জন্ম দিতে পারেন না, বাকি ৩৩-৩৪ লাখ নারী মা হন বা জীবিত সন্তান প্রসব করেন।

তিনি বলেন, সর্বশেষ হিসাব অনুসারে দেশে মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখ জীবিত জন্মে ১৬৫ জন। তবে করোনাকালে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব কমে যাওয়ায় এবং বাড়িতে প্রসব বেশি হওয়ায় মৃত্যু কিছুটা বেড়েছে। যদিও এই বৃদ্ধির এখনো কোনো চূড়ান্ত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতিবছর দেশে প্রায় আট হাজার মায়ের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে সর্বাধিক ২২ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হয় প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণের ফলে। এর পরই আরেক বড় কারণ হচ্ছে প্রি-একলাম্পশিয়া বা একলাম্পশিয়া। এ কারণে মৃত্যু ঘটে মোট মৃত্যুর ২০ শতাংশ, করোনাকালে যে সংখ্যা আরো বেড়েছে।

সচেতনতা ও অপেক্ষাকৃত উন্নত চিকিৎসা সুবিধার কারণে শহর এলাকায় প্রসবপরবর্তী রক্তক্ষরণ, প্রি-একলাম্পশিয়া বা একলাম্পশিয়া অনেকটা সহজে মোকাবেলা করা গেলেও গ্রামে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখনো গ্রাম পর্যায়ে ৬৪ শতাংশের বেশি ডেলিভারি হয় বাড়িতে, যেখানে দক্ষ প্রসবকর্মী বা চিকিৎসকের অবস্থান নিশ্চিত করা কঠিন। দক্ষ প্রসবকর্মীর তত্ত্বাবধান বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রসব না হওয়ার ফলে বেশির ভাগ মা-ই দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। করোনা লকডাউনে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীরা বাড়িতে গিয়ে সার্ভিস না দিতে পারায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণও বেড়ে গেছে। মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ।