kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

হেফাজত নেতা সাবেক এমপি শাহীনুর পাশা গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি   

৮ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হেফাজত নেতা সাবেক এমপি শাহীনুর পাশা গ্রেপ্তার

হেফাজতে ইসলামের সদ্যোবিলুপ্ত কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে সিলেট নগরীর বনকলাপাড়ায় আব্বাসী জামে মসজিদ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির ঢাকার একটি দল। শাহীনুর পাশাকে সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এবং সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, নাশকতার তদন্তে নাম আসার পর শাহীনুর মসজিদে আত্মগোপনে ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও সুনামগঞ্জের শাল্লার নাশকতা এবং সিলেটে নাশকতা ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত। তাঁর উসকানিতে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বলে তথ্য মিলেছে।

এদিকে আলোচিত হেফাজত নেতা মাওলানা মামুনুল হকের পর এবার বিলুপ্ত কমিটির প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান ফয়েজীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করেছেন ভুক্তভোগী এক নারী। গতকাল শুক্রবার ভোররাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় এ মামলা দায়ের করা হয়। গত বুধবার নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ফয়েজীকে ধর্ষণ মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হবে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে অর্ধশত শীর্ষ পর্যায়ের হেফাজত নেতা গ্রেপ্তারের পর সংগঠনের দুটি পক্ষ সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় বৈঠকের পরও হেফাজতের পক্ষ থেকে ফের আলোচনার জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে। মামুনুল হকসহ ঢাকায় গ্রেপ্তার ৩৪ শীর্ষ নেতার বেশির ভাগই এখন পুলিশের রিমান্ডে আছেন।

সিআইডির এএসপি জিসানুল হক বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে হেফাজত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে তাণ্ডব চালিয়েছে এর সঙ্গে তাঁর (শাহীনুর পাশা) সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ ও সিলেটের নাশকতার সঙ্গেও তাঁর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’

সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের নাশকতার ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৫টিসহ ২৩টি মামলার তদন্তভার পেয়েছে সিআইডি। সে তদন্তের অংশ হিসেবে ঢাকা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি দল শাহীনুর পাশাকে নজরদারিতে রেখে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, হেফাজতের নাশকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। তাঁদের আইনি সহায়তাসহ বিভিন্নভাবে অপরাধীদের সহযোগিতা করারও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সিআইডি সূত্র জানায়, সমপ্রতি সারা দেশে ঘটে যাওয়া হেফাজতে ইসলামের সহিংস আন্দোলনে সরাসরি নির্দেশদাতাদের মধ্যে অন্যতম শাহীনুর পাশা। লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানসহ সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে দেশের অভ্যন্তরে অপতৎপরতা চালিয়েছেন তিনি। সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘু গ্রামে ঘটে যাওয়া হামলার ঘটনায় তাঁর মদদ ও উসকানির প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। তাঁকে আরো কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে বলে জানায় সূত্র।

হাটহাজারীতে ধর্ষণ মামলা : চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, এক নারী নিজে থানায় এসে গ্রেপ্তার নোমান ফয়েজীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। এই মামলাও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। গত বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে চট্টগ্রাম জেলা ডিবি পুলিশের একটি দল তাঁকে গ্রেপ্তার করে। বৃহস্পতিবার তাঁকে চট্টগ্রামের আদালতে তুলে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক জানান, ফয়েজীর একাধিক নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত শারীরিক ও প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। পুলিশ তাঁর কাছ থেকে একটি মোবাইল সেট উদ্ধার করেছে। সেখানে তাঁর একাধিক নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের প্রমাণ মিলেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফয়েজী নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

ধর্ষণ মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফেসবুকের মাধ্যমে বাদী ওই নারীর সঙ্গে জাকারিয়া নোমান ফয়েজীর পরিচয় হয়। মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে তিনি ওই নারীকে ফুঁসলাতে থাকেন। তাঁকে বিয়ে করার প্রলোভন দেন এবং হাটহাজারীতে আসতে বলেন। ওই নারী ফয়েজীর প্রলোভনে হাটহাজারী আসেন এবং তাঁকে ২০১৯ সালের নভেম্বরে কনক বিল্ডিংয়ের নিচতলায় বাসা ভাড়া করে দেন। তিনি দীর্ঘ এক বছর ফয়েজীর ভাড়া করা ওই বাসায় অবস্থানকালে বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে ফয়েজী তাঁকে ধর্ষণ করেন। এরপর হাটহাজারী থেকে চট্টগ্রাম শহরে খালার বাসায় চলে আসার পরও বিভিন্ন বাসা ও হোটেলে নিয়ে বিয়ের প্রলোভনে বিভিন্ন সময় তাঁকে ধর্ষণ করেন।

এদিকে সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জগন্নাথপুর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শাহীনুর পাশা চৌধুরীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন গত জাতীয় নির্বাচনের আগে মোহাম্মদ আলী নামে এক লন্ডনপ্রবাসীর কাছ থেকে আবাসন ব্যবসার কথা বলে ৩২ লাখ টাকা এনে ‘মাতৃভূমি হাউজিং  ডেভেলপমেন্ট কম্পানি’ গঠন করে তাঁকে পরিচালক রাখেন। এক পর্যায়ে তাঁকে না জানিয়ে আবাসন কম্পানিটি বিক্রি করে সব টাকা আত্মসাৎ করেন শাহীনুর পাশা। মোহাম্মদ আলী তাঁর টাকা ফেরত চাইলে উল্টো তাঁকে হুমকি দেন শাহীনুর পাশা। এ ঘটনায় ২০১৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর সিলেট সিএমএম আদালতে প্রতারণার অভিযোগে শাহীনুর পাশা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেন মোহাম্মদ আলী। এ ঘটনায় ১৮ ডিসেম্বর আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ১৯ ডিসেম্বর বাদীর অনুকূলে ১০ লাখ টাকার চেক আদালতে দাখিল করে জামিন প্রার্থনা করে অপরাধের দায় স্বীকার করেন তিনি। শুধু আবাসন খাতেই নয়, সিলেট শহরে একাধিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেও তিনি নানা অনিয়ম করেছেন। শিক্ষকদের বেতন না দিয়ে তিনি বেতনের টাকা নয়ছয় করেছেন বলেও অভিযোগ আছে।

এ ছাড়া শাহীনুর পাশার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের নামে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে টাকা এনে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় লেখালেখিও হয়েছে।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার গণিগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম বলেন, রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার নামে মোটা অঙ্কের টাকা লন্ডন থেকে এনে লংমার্চের নামে নাটক করে পুরো টাকা আত্মসাৎ করেছেন শাহীনুর পাশা। হেফাজতের নামে সারা দেশে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে তাতেও তিনি জড়িত।

 



সাতদিনের সেরা