kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

বিশেষ লেখা

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক   

৮ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আমাদের দেশের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে  আজ অবধি বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে এই উদ্যানের যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের ৭ই মার্চে ১০ লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটি ছিল এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। তখন অবশ্য জায়গাটি চিহ্নিত হতো রেসকোর্স হিসেবে। ঔপনিবেশিক আমলে প্রতি রবিবার এখানে ঘোড়দৌড়ের আয়োজন হতো। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ঘোড়দৌড় বন্ধ করে এটিকে উদ্যান হিসেবে গড়ে তোলেন। উদ্যানের নামকরণ করেন মহান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে। এই উদ্যানেই মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেছিল। পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু সরাসরি এই উদ্যানে এসে জনতার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। স্বপ্নের বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু কিভাবে গড়ে তুলবেন সে কথা তিনি জানিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু এখানে বহু সভা-সমাবেশ করেছেন। বঙ্গবন্ধু সব সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলিত হতে পছন্দ করতেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য যখনই সমাবেশের দরকার পড়েছে বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেই বেছে নিয়েছেন। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের প্রথম বর্ষপূর্তির দিনেও এখানে এসে বিশাল জনসভায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কথা। তিনি বলেছিলেন, আজ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ সংবিধানের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের মালিক হচ্ছে। স্বাধীনতার আগেও সমাবেশ করেছেন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন একাত্তরের ৩ জানুয়ারি এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর জীবনের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণই এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী স্বাধীন বাংলাদেশ সফরে এসে ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের যে অবদান তার স্বীকৃতি হিসেবে নৌকা আকৃতির ইন্দিরা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল সেখানে। তারও আগে মহান ভাষা আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই উদ্যানের ইতিহাস।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চরিত্র নষ্ট করার জন্য, অঙ্গহানি ঘটানোর জন্য এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে শিশু পার্ক নির্মাণ করেন। ওই সময় ঢাকা শহরে শিশু পার্ক করার মতো বহু জায়গা ছিল। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নষ্ট করার জন্যই যে শিশু পার্কটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

২০২১ সালে এসে আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি, তখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোকে রক্ষা করা, সংরক্ষণ করা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলোকে কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। কিন্তু তার বদলে আমরা যদি পত্র-পত্রিকায় দেখি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে; সেখানে ফুড কর্নার নির্মাণের জন্য পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে; তাহলে আমাদের মনে আঘাত লাগে। প্রাকৃতিক দৃশ্যের পরিবেশ নষ্ট করে ব্যাবসায়িক স্বার্থে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি আমরা সহজে মেনে নিতে পারি না।

আমরা জানি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণের জন্য উচ্চ আদালতেরও একটি নির্দেশনা রয়েছে। এরই মধ্যে এখানকার পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে ভূগর্ভে একটি জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কে সবুজের যে সমারোহ, বিভিন্ন প্রজাতির যে গাছ দীর্ঘ সময় থেকে সংরক্ষণ করা হচ্ছে; একবিংশ শতাব্দীতে এসে যেখানে সবুজ প্রকৃতির প্রতি আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেখানে গাছ কেটে ফেলে স্থাপনা নির্মাণ একটি অবিবেচনাপ্রসূত কাজ বলে মনে করি। বিশেষ করে করোনাভাইরাস সংকটকালে অক্সিজেন সংকটের কালে গাছ কেটে ফেলার ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্ক ঢাকা শহরে বসবাসকারী দুই কোটি মানুষের জন্য একটি দুর্লভ উন্মুক্ত জায়গা। শহরের ফুসফুসই বলা যায়। মানুষ মুক্ত পরিবেশে সকাল-সন্ধ্যায় একটু হাঁটাহাঁটি করবে, একটু মুক্ত পরিবেশে ঘুরে বেড়াবে, নিঃশ্বাস নেবে এমন জায়গা তো খুব বেশি নেই। এখানে নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি রয়েছে। সবুজ প্রকৃতির কারণেই পশু-পাখির অবাধ বিচরণ রয়েছে। মানব প্রজাতির সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যা অপরিহার্য। শহরের শিশুদের প্রাকৃতিক পরিবেশ চেনানোর জন্য, গাছ ও পাখির সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য মুক্ত পরিবেশ আর তো খুব একটা নেই। তাহলে এই পরিবেশটা বিনষ্ট করছি কেন। শহরের এই মুক্ত পরিবেশটি রক্ষা করা তো সরকারের দায়িত্ব। অবিলম্বে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করার আয়োজনটি বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছি।

কোনোভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা যাবে না। প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করা যাবে না। ঐতিহাসিক মর্যাদা রক্ষা করার জন্য, জনগণের নিরাপত্তা ও সুবিধার জন্য যদি কোনো কিছু করতেই হয়, তা প্রাকৃতিক পরিবেশ, নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে রক্ষা করেই, বৃক্ষরাজিকে রক্ষা করেই করতে হবে। স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, ব্যাবসায়িক স্বার্থে স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। অত্যাবশ্যক হলে অস্থায়ীভাবে কিছু করা যেতে পারে।

আমরা জানি স্থাপত্যকলা অনেক আধুনিক হয়েছে। স্থাপত্যকলায় প্রাকৃতিক পরিবেশকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশকে, গাছপালাকে রক্ষা করেই স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব। এ জন্য স্থপতি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

এই করোনা মহামারির সময়ে আমরা বুঝতে পারছি স্বাস্থ্য রক্ষা করাটা কতটা জরুরি। সব সময়ই স্বাস্থ্য রক্ষা, পরিবেশ রক্ষা করাটা অগ্রাধিকার। এ জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো মুক্ত পরিবেশ রক্ষাটাও জরুরি কর্তব্য। পরিবেশ নষ্ট করে সব কিছুই এখানে করতে হবে কেন?

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে ঘিরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সাংস্কৃতিক বলয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা আমরা জানি। এই সুযোগে সেই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্যও আমি সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য

অনুলিখন : আজিজুল পারভেজ



সাতদিনের সেরা